ওই পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ডের ভয়েই আমি ইয়োর বুকস-এর চাকরিটা ছেড়ে দিলাম।
চোর ধরল ঝামেলা
কোনও রোবটের পুজোর জামা কেনা যে কীরকম ঝকমারি সেটা এবার হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিল ছোটকা। তার ওপর যদি সেই রোবট বাচ্চা খোকা হয়, আর তার নাম হয় ঝামেলা, তা হলে তো কথাই নেই।
যমজ দুই ভাইপো, চন্দ্রকান্ত আর ইন্দ্রকান্তকে পুজোর জামা-প্যান্ট কিনে দেবে বলে ছোটকা ওদের নিয়ে রওনা হচ্ছিল। কিন্তু কোথা থেকে হেলে দুলে হাঁটতে-হাঁটতে সামনে এসে হাজির হল তিনফুট মাপের বাচ্চা রোবট ঝামেলা। রিনরিনে মেয়েলি গলায় বলল, টুইন দুই ব্রাদারের সহিত আমিও পূজার জামা কিনিতে যাব…কিনিতে যাব..কিনিতে যাব…।
ঝামেলার কিনিতে যাব… ব্যাপারটা আর থামছিল না বলে ছোটকা ওর ন্যাড়া ধাতব মাথায় মারল এক চাটি। তারপর বলল, ওর ভেতরের সার্কিটে বোধহয় কোনও গণ্ডগোল হয়েছে। পরে দেখে দেব, বুঝলি, ঝালাপালা।
শেষ কথাগুলো ছোটকা বলেছে চন্দ্রকান্ত আর ইন্দ্রকান্তকে লক্ষ করে। ছোটবেলায় এই যমজ জুটি কান্নাকাটি, চিৎকার, চেঁচামেচি করে বাড়িসুদ্ধ সবার কান ঝালাপালা করে দিত। তাই ছোটকা ওদের নাম রেখেছিল ঝালাপালা। তবে এ-নামে আর কেউ ওদের ডাকলে দু-ভাই ভীষণ খেপে যায়।
ঝামেলার ঝকঝকে মাথাটা পাঁচ নম্বর ফুটবলের মতো প্রকাণ্ড। হাত-পাগুলো কাঠির মতো সরু লিকলিকে। তবে আঙুলগুলো খুব নিখুঁতভাবে তৈরি। সবসময় ও জামা-প্যান্ট পরে থাকে। ছুটতে পারে না, হেলে দুলে হাঁটতে পারে। ইচ্ছেমতো কথা বলতে পারে, কিন্তু গলার স্বরটা মিহি মেয়েলি।
সব মিলিয়ে ঠিক যেন একটা কথা-বলা পুতুল।
পঞ্চাশ কেজি ওজনের এই বাচ্চা রোবটটা ছোটকাই তৈরি করে দু-ভাইকে উপহার দিয়েছে।
ছোটকার চঁটি খেয়ে ঝামেলা চুপ করে গিয়েছিল–তবে সে মাত্র মিনিট দুয়েকের জন্য।
ঝালাপালা যখন পুজোর জামা কিনতে যাওয়ার আনন্দে হইহুল্লোড় শুরু করে দিয়েছে তখন ঝামেলা গম্ভীরভাবে বলে উঠেছে, এত লম্ফঝম্পপূর্ণ উল্লাসের কী হইয়াছে? সেই কোন আদিম যুগে পড়ে আছ। বিবর্তন হয়ে আমার জায়গায় পৌঁছেলে বুঝতে সভ্যতার আর এক নাম সংযম। আমাকেই অবলোকন করো না। আনন্দ কি আমারও হইতেছে না? কিন্তু আমি কি শাখামৃগের ন্যায় জাম্প দিচ্ছি?
ঝামেলার এই একটাই গোলমাল। এখনও শুদ্ধ বাংলা বলতে শেখেনি। সাধু-চলিত আর ইংরেজির জগাখিচুড়ি তৈরি করে যা প্রাণ চায় বলে বেড়ায়। যদিও অবশ্য ওর প্রাণ বলতে ঘাড়ের কাছে লুকিয়ে রাখা ব্যাটারি।
ছোটকা বলে, ঝালাপালার কাছে ঝামেলার এখন ট্রেনিং পিরিয়ড চলছে।
চন্দ্রকান্ত ঝামেলাকে লক্ষ করে বলল, ঝামেলা, স্টপ!
ওর নির্দেশে ঝামেলা নীরব স্ট্যাচু হয়ে গেল।
ছোটকা হেসে বলল, ঝামেলা তোদের পোষা রোবট, না গার্জেন!
ঝালা-পালা কোনও কথা না বলে ছুটল মায়ের কাছে। মাকে খুশির খবরটা বলে ঝটপট তৈরি হয়ে নিতে হবে।
ছোটকা সেই ফাঁকে ঝামেলার নানান পার্টস চেক করে নিতে লাগল।
ঝালাপালা তৈরি হয়ে আসতেই ওরা চারজন রওনা হয়ে পড়ল।
ইন্দ্ৰকান্ত বলল, ঝামেলা, স্টার্ট।
সঙ্গে-সঙ্গে ঝামেলার কপালে লাগানো লাল-নীল-হলদে-সবুজ রঙের ছোট ছোট বাতিগুলো জ্বলে উঠল। তারপর দপদপ করে জ্বলতে আর নিভতে লাগল। ঝামেলা খুশি হলে বা উত্তেজিত হলে এই বাতিগুলো এইরকম জ্বলে-নেভে।
ঝামেলা চেঁচিয়ে বলে উঠল, তাই-তাই-তাই, পুজোর জামা চাই।
ছোটকা একটা ট্যাক্সি ডাকতেই সবাই তাতে উঠে পড়ল। ট্যাক্সি ছুটে চলল ধর্মতলার দিকে।
রাস্তায় অনেক লোকজন, যানবাহন। চারপাশে ছড়িয়ে আছে শরতের রোদ্দুর। মাথার ওপরে ঝকঝকে নীল আকাশ।
এপাশ-ওপাশ মাথা ঘুরিয়ে সবকিছু দেখতে-দেখতে ঝামেলা মন্তব্য করল, বাতাসে কেমন একটা পূজা-পূজা স্মেল। তোমরা টের পাইতেছ?
ছোটকা হেসে বলল, হ্যাঁ পাইতেছি। কিন্তু তুমি দয়া করে একটু চুপ করবে? নইলে তোমার পুজোর জামা কিনে দেব না।
ব্যস, সঙ্গে-সঙ্গে ঝামেলা চুপ।
কিন্তু ঝামেলাকে নিয়ে ঝামেলা শুরু হল রেডিমেড জামাকাপড়ের বিশাল মাপের দোকানটায় ঢুকতেই।
না, ঝামেলা রোবট বলে নয়। কারণ আজকাল অনেকেই নানা মাপের নানা ঢঙের রোবট সঙ্গে নিয়ে রাস্তায় বেরোয়। বহু কোম্পানি রোবট তৈরি করে, টিভিতে তারা ইনস্টলমেন্টে রোবট বিক্রির বিজ্ঞাপনও দেয়।
দোকানে ঢুকে জামাকাপড় পছন্দ করার সময় ঝামেলা হঠাৎ ছোটকার কাছে এসে চাপা গলায় বলল, আমি একজন তস্করকে দেখিতে পেয়েছি।
ছোটকা এবং ঝালাপালা তিনজনেই অবাক হয়ে ঝামেলার দিকে তাকাল। কারণ, ঝামেলার দেখা ও শোনার ব্যাপারটা যে মোটেই সাধারণ নয় সেটা ওরা জানে। ঝামেলার টেনিসবল সাইজের কাচের গুলির মতো চোখ দুটো পুঞ্জাক্ষি অনেকগুলো লেন্স মিলিয়ে তৈরি। এই চোখ দিয়ে ঝামেলা একমাইল দূর পর্যন্ত স্পষ্ট দেখতে পায়–ঠিক টেলিস্কোপের মতো। আর ওর কানের জায়গায় রয়েছে স্রেফ দুটো ফুটো। কিন্তু তার ভেতরে এমন সব কলকবজা আছে যে, ও আলট্রাসনিক মানে, শব্দোত্তর তরঙ্গ–পর্যন্ত শুনতে পায়।
চন্দ্রকান্ত ঝামেলার কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে জিগ্যেস করল, কী দেখতে পেয়েছ?
তস্কর, তস্কর। সাদা বাংলায় থিফ মানে, চোর।
কথা বলার সময় ঝামেলার কপালের বাতিগুলো দপদপ করে জ্বলে উঠতে লাগল। ঝালা পালা বুঝল ঝামেলা উত্তেজিত হয়ে পড়েছে।
