একা মেয়ে। এই শীতের রাতে কুয়াশার মধ্যে হঠাৎ করে কোথা থেকে এল ও? আর ঠারেঠোরে যা বলতে চাইছে তাতে একটা মারাত্মক কাণ্ড করে এসে এইরকম নির্লিপ্ত আর উদাসী থাকছে কেমন করে?
আমার ভীষণ অবাক লাগল। মনের ভেতরের কাঁটাটা খচখচ করতে লাগল।
আপনি থাকেন কোথায়? ওকে জিগ্যেস করলাম।
প্রশ্নটা অনেকটা পুলিশের মতো শোনাচ্ছে।
আগেই তো বলেছি আমি পুলিশ নই।
আমার দিকে পূর্ণ চোখে তাকাল। তাকিয়ে কী খুঁজল জানি না। তারপর: যেখানে আপনার গাড়িতে প্রায় চাপা পড়ছিলাম, সেখান থেকে বড়জোর দু-আড়াই কিলোমিটার। সেখানে আমাদের সাজানো দোতলা বাড়ি। পুরোটা ছবির মতন। শুধু ওই লোকটাই ছিল কলঙ্ক। একটু চুপ করে রইল। ওড়নার কাপড়ে হিজিবিজি কাটল। তারপরঃ ওই বাড়িতে আমি আর থাকতে পারব না…।
আমি হঠাৎই রেডিয়োটা অন করে দিলাম।
শুরু হয়ে গেল গান আর কথার কচকচি। তৃতীয় কারও গলা আমাকে যেন ভরসা দিল।
এবারে আপনার গল্পটা শুনতে পারি? সোনাল জিগ্যেস করল।
আমি চুপ করে রইলাম। চোখ রাস্তার দিকে।
বৃষ্টি এখন আর নেই–তবে রাস্তায় ভিজে দাগ রয়েছে। ভিজে দাগ থাক বা না থাক, এখন রাস্তাই আমার জীবন।
কী, বলবেন না? আমারটা তো হাঁ করে শুনলেন—
আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। পুরোনো স্মৃতি ঝিলিক মেরে গেল মাথার ভেতরে।
সেই চেনা গল্প। ওর দিকে না থাকিয়েই বললাম, বড়লোক বউ। স্বামী গরিব, তবে সৎ পরিশ্রমী মানুষ। দিন-রাত শুধু অভিযোগ আর অভিযোগ। আমি নাকি অপদার্থ। শিক্ষিত হলেও গণ্ডমূর্খ। ফুটোপয়সার মুরোদ নেই।
একদিন রাতে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিল আমাকে। ওর বাবার দেওয়া বাড়ি–তাই আমাকে গেট আউট বলার অধিকারও ছিল। আমারও যে কী হল! দুঃখে অভিমানে বোকার মতো বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লাম। এই গাড়িটা নিয়ে–ওর বাবার দেওয়া গাড়ি। আক্ষেপে স্টিয়ারিং-এ চাপড় মারলাম : আমার লাইফটা একেবারে ইউজলেস ছিল…আর একইসঙ্গে হোপলেস…।
হঠাৎই হেসে উঠল সোনাল।
হাসছেন কেন?
না, একটা কথা মনে হল–তাই।
কী কথা?
মানে…দুজন হোপলেস একজায়গায় হলে একটু-আধটু হোপ তৈরি হতে পারে কি না…।
বেশ বলেছেন। এরকম কথা শুনলে ভালো লাগে নতুন করে আবার বেঁচে উঠতে ইচ্ছে করে। জীবনের জন্যে মায়া জাগে।
সোনাল মাথা নীচু করল। আস্তে আস্তে বলল, আপনি হয়তো ভাবছেন, আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। একটা সিরিয়াস ক্রাইম করে এসে এত কুলি কী করে কথা বলছি। একটু চুপ করে থেকে বলল, আসলে আমার হাজব্যান্ড আমার চোখে বহুদিন আগেই নেই হয়ে গিয়েছিল। ওর থাকা না থাকায় আমার লাইফের কোনও ডিফারেন্স নেই। তা ছাড়া আমার এখনকার লাইফটাও তো ঠান্ডা বরফ আর পাথরের মতো। মানে, মৃত্যু যেমন হয়…।
দূরে একটা রোড সাইন চোখে পড়ল : কার্ভ অ্যাহেড। তারপরই রাস্তাটা ডানদিকে বেঁকে গেছে।
এসে গেছি। আর কয়েকসেকেন্ড।
সোনালকে বললাম, গাড়ি সাইড করছি। আপনি এখানটায় নেমে পড়ুন।
কেন? কপালে ভাঁজ ফেলে আমার দিকে তাকাল ও।
গাড়ির গতি কমালাম ও এরপর আমার সঙ্গে গেলে আপনার বিপদ হবে–গাড়ি আর থামানো যাবে না–তাই।
কীসের বিপদ?
প্লিজ, আমার কথা শুনুন…নেমে পড়ুন।
না। জেদি গলায় বলল মেয়েটা, আগে বলুনকীসের বিপদ।
আমি এপাশ-ওপাশ মাথা নেড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম : সোনাল, বছরদুয়েক আগে…সেই যে আমি রাগ করে গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম…সেই রাতটা ছিল অমাবস্যার রাত। আজও তাই…।
খেয়াল করলাম, স্টিয়ারিং-এর ওপরে আমার বাঁ-হাতের পাতাটা অদৃশ্য হয়ে গেছে। ডান হাঁটু আর উরু দেখা যাচ্ছে না।
সোনাল আমার মুখের দিকে তাকিয়ে। এফ. এম. রেডিয়োতে ঝিম্ফাক মিউজিকের সঙ্গে গান বাজছে।
…সেই শীতের রাতে এই রাস্তায় আমার একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়। ওই যে রোড সাইনটা দেখা যাচ্ছে–ওটা পেরিয়ে ডানদিকে টার্ন নিয়ে…তারপর…।
আমার বাঁ-দিকের অনেকটা অংশ আচমকা অদৃশ্য হয়ে যেতেই ব্যাপারটা সোনালের চোখে পড়ল। না পড়ে উপায়ও ছিল না।
ও চোখ বড় বড় করে ফেলল। ভয়ংকর এক চিৎকার করে উঠল।
কিন্তু এখন তো আর কিছু করার নেই। গাড়ি আর থামানো যাবে না।
একটা লোডেড ট্রাকের সঙ্গে আমার গাড়ির মুখোমুখি ধাক্কা লাগে। সঙ্গে-সঙ্গে সব শেষ। তারপর থেকে…।
সোনাল এখনও চিৎকার করে চলেছে। এফ. এম. রেডিয়ো বাজছে। রোড সাইনটা কাছে এসে গেছে।
তারপর থেকে প্রত্যেক অমাবস্যার রাতে আমি এ-রাস্তা ধরে গাড়ি চালিয়ে যাই। ঝড়, বৃষ্টি, কুয়াশা, শীত পরোয়া না করে ছুটে যাই ওই অ্যাক্সিডেন্টের জায়গায়। মারা যাওয়ার পর থেকে এটাই আমার জীবন, সোনাল…।
কী মনে হওয়ায় গাড়ির রিয়ার ভিউ মিরারটা আমার দিকে ঘোরালাম।
যা ভেবেছি তাই। আমার মুখের বাঁ-দিক, গলা–সব মিলিয়ে গেছে। শুধু ডানদিকের গাল, দুটো চোখ, কপাল আর চুল সাপের ফণার মতো শূন্যে ভেসে আছে।
সোনাল ছুটন্ত গাড়ির দরজা খোলার চেষ্টা করছে, আর পাগলের মতো চিৎকার করছে।
ডানদিকে বাঁক নিয়ে এগোতেই ছুটে আসা ট্রাকের ঘোলাটে হেডলাইট চোখে পড়ল আমার।
সোনাল তখন হিস্টিরিয়ার রুগির মতো বাঁচাও! বাঁচাও! বলে চিৎকার করছে। গাড়ির উইন্ডশিল্ডের কাঁচে হিংস্রভাবে ঘুসি মারছে।
আশ্চর্য! এই মেয়েটাই না একটু আগে বলছিল, আমি আর বেঁচে নেই। প্রেতাত্মার মতো বাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি…।
