আত্মরক্ষার ভঙ্গিতে দু-হাত সামনে বাড়ানো। বড়-বড় আয়ত চোখে নিছক ভয়।
কী করে যেন শেষ মুহূর্তে ব্রেক কষতে পারলাম।
বিশ্রী শব্দ হল। ভেজা রাস্তায় গাড়ির চাকা পিছলে গেল। কপাল ভালো যে, আমার পেছনে কোনও গাড়ি ছিল না। থাকলে সে নির্ঘাত আমার গাড়িতে ধাক্কা মেরে বসত।
মেয়েটি টাল সামলাতে গিয়ে গাড়ির বনেটের ওপরে ঝুঁকে পড়েছিল। হেডলাইটের আলো ওর কোমরের কাছটা ভাসিয়ে দিচ্ছিল। থুতনির নীচে আর গালে আলো পড়ে চোখের কোটর দুটো অন্ধকার গর্তের মতো লাগছিল।
হঠাৎ করেই যেন একটা ঠান্ডা শিরশিরে ভাব আমাকে ছুঁয়ে গেল।
মেয়েটা আশ্চর্যভাবে নিজেকে সামলে নিল। প্রায় ছুটে চলে এল গাড়ির জানলার কাছে। কাচের ওপর শব্দ করে টোকা দিল কয়েকবার।
একমুহূর্ত কী ভেবে আমি ঝুঁকে পড়ে জানলার কাচ সামান্য নামালাম।
মেয়েটি হাত দিয়ে বৃষ্টি আড়াল করার চেষ্টা করতে করতে বলল, দরজাটা একটু খুলুন। না–প্লিজ…।
ওর মুখের একপাশে হেডলাইটের আলোর ঠিকরে আসা আভা। বাকিটা ছায়া-ছায়া, অন্ধকার। তারই মধ্যে কয়েকটা জলের ফোঁটা চিকচিক করছে।
কী ভেবে দরজাটা খুলে দিলাম। আমার দিকে জানলার কাচ নামিয়ে হাতের সিগারেটটা ফেলে দিলাম।
ও চট করে উঠে বসল আমার পাশে। দরজা বন্ধ করে ওড়না দিয়ে মুখটা মুছে নিল। তারপর জানলার কাচটা তুলে দিল।
লক্ষ করলাম, মেয়েটা হাঁপাচ্ছে। মনে হচ্ছে যেন অনেকটা পথ ছুটে এসেছে। ওড়নার আঁচল দিয়ে নাকের কাছে বাতাস করল। বোধহয় সিগারেটের গন্ধে অস্বস্তি হচ্ছে।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
আড়চোখে মেয়েটাকে দেখলাম।
হলদে আর লাল চুড়িদার। সেইরকমই একটা ওড়না। জামার ওপরে কালচে রঙের একটা স্লিভলেস সোয়েটার। বয়েস আটাশ কি তিরিশ। বেশ সুন্দর দেখতে। প্রসাধন তেমন না থাকলেও শরীর থেকে একটা হালকা গন্ধ বেরোচ্ছে।
হঠাৎই মনে হল, আমি যেন সিনেমার ভেতরে ঢুকে পড়েছি। কারণ, সিনেমা-টিনেমায় এরকম হয়।
চুপচাপ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর জিগ্যেস করলাম, এই রাতে হঠাৎ এভাবে কোথা থেকে এলেন?
মাথা ঝাঁকিয়ে ঘুরে তাকাল আমার দিকে কেন? জিগ্যেস করছেন কেন?
ওর কথার সুরে একটা চাপা ভয় টের পেলাম। সেইসঙ্গে চোখের নজরে দু-চারফেঁটা সন্দেহ।
আমি হাসলাম ও ভয় নেই–আমি পুলিশের লোক নই। যেভাবে এই রাতে কুয়াশা আর বৃষ্টির মধ্যে আপনি হঠাৎ করে আমার গাড়ির সামনে এসে পড়লেন–তাতে প্রশ্নটা করে খুব একটা অন্যায় করেছি বলে তো মনে হয় না।
কয়েক মুহূর্ত ঠোঁট টিপে বসে রইল। তাকিয়ে আছে রাস্তার দিকে। এখনও বড়-বড় শ্বাস পড়ছে। বুক ওঠা-নামা করছে।
আমি আবার কথা বললাম, খুব পার্সোনাল কিছু হলে বলার দরকার নেই। রাস্তার বাঁকে ঝোঁপের গোড়ায় একটা কুকুর চোখে পড়ল। হেডলাইটের আলোয় জন্তুটার সবুজ চোখ ঝিকিয়ে উঠল। আমি মুখ ফেরালাম মেয়েটার দিকে : যাকগে, আমার নাম রনিত। আপনি কোন দিকে যাবেন?
আপনি যেদিকে যাচ্ছেন। আমি আসলে এখান থেকে পালাতে চাই–যতদূরে পারা যায়। আমার নাম সোনাল।
বাঃ, বেশ অদ্ভুত নাম তো! তারিফ করে বললাম, তা কার কাছ থেকে পালাতে চান? হাজব্যান্ডের কাছ থেকে?
আবার চমকে উঠে আমার দিকে ফিরে তাকাল : কী করে বুঝলেন?
কেতার হাসি হাসলাম, বললাম, আমি অনেক কিছুই বুঝতে পারি। বছর দুয়েক হল এই গুণটা গজিয়ে উঠেছে। তবে কীভাবে হল সেটা এগজ্যাকুলি বলতে পারব না।
আমার হাজব্যান্ডটা একটা জানোয়ার– কথাটা বলার সময় ঠোঁটটা অদ্ভুতভাবে বেঁকাল সোনাল। ওর চোয়াল শক্ত হল ও পারে না এমন কোনও কাজ নেই। মানে, পারত না এমন কোনও কাজ নেই। আপনি অচেনা মানুষ–তাও বলছি। দিন-রাত নেশা করত, হাত তুলত, যাচ্ছেতাই গালিগালাজ করত…।
সোনালের দিকে তাকালাম।
এরকম ফুটফুটে কোমলতা মাখা মেয়ের গায়ে কী করে কেউ হাত তোলে।
..দিন আর রাতগুলো এত বিশ্রীভাবে কাটত যে, মনে হত আমি আর বেঁচে নেই। প্রেতাত্মার মতো বাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছি…।
আর এখন? কথার পিঠে কথা বলার ছলে প্রশ্নটা করলাম।
এখন তো মুক্ত। মানে টোটাল ফ্রিডম। এখন আমি যা খুশি তাই করতে পারি–।
তাই? জানতে চাইলেন না তো আমি কোথায় যাচ্ছি।
জেনে কী হবে? নতুন জীবন শুরু করার সময় এসব ফালতু প্রশ্নের কোনও দাম নেই…।
আমি অবাক হয়ে সোনালকে দেখলাম। একটু আগে ও ভয়, সন্দেহ, উৎকণ্ঠায় ভাসছিল। আর এখন বেপরোয়া, নির্লিপ্ত, নিশ্চিন্ত। ও সত্যি, না মায়া? নাকি আমাকে ঘিরে ওর অন্য মতলব আছে? থাকলে থাক। কারণ, এখন আমার ভয়-ডর বলে আর কিছু নেই।
কিন্তু যেভাবে ও আমার গাড়ির সামনে এসে পড়েছে তাতে মনে হয় না ব্যাপারটা সাজানো। তা ছাড়া এ-রাস্তা ধরে আমি প্রায়ই রাতের দিকে গাড়ি চালিয়ে যাই। আগে কখনও তো ওকে দেখিনি!
আপনার হাজব্যান্ড এখন কোথায়?
নেই।
নেই মানে?
শেষ। দ্য এন্ড।
মেয়েটা কি ওর স্বামীকে খুন করেছে নাকি?
আমার কোঁচকানো ভুরু দেখে কী যেন ভাবল সোনাল। হেসে বলল, আমি নিজেই জানতাম আমার মধ্যে এত শক্তি আছে। কী করে যে পারলাম কে জানে! বোধহয় আমি নয়–আমার ভেতরের আত্মা কিংবা প্রেতাত্মা আমাকে দিয়ে কাজটা করিয়ে নিয়েছে।
কী কাজ?
বুঝে নিন। এর বেশি বলব না।
আমার হঠাৎ কেমন সন্দেহ হল। আড়চোখে সোনালকে বেশ ভালো করে খুঁটিয়ে দেখলাম। ওর কথার মধ্যে কতকগুলো শব্দ আমার কানে বাজছিল।
