প্রাক্তন বিচারপতি ও মানবাধিকার আন্দোলনের অগ্রণী ব্যক্তিত্ব রাজেন্দ্র সাচার মনে করেন– বিরলতম ঘটনায় মৃত্যুদণ্ডের কথা সুপ্রিম কোর্ট বললেও যেহেতু কোনো মানদণ্ড নেই, সেহেতু বিচারপতিরা নিজেদের ভাবাদর্শ ও মূল্যবোধ অনুসারে বিরলতম নির্ধারণ করছেন ও যথেচ্ছাচারভাবে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দিচ্ছেন। মাননীয় সাচার একটি পরিসংখ্যান পেশ করে বলেছেন– ১৯৭০ থেকে ১৯৮০ এই দশ বছরে সুপ্রিম কোর্ট ৩৭.৭ শতাংশ মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করেছিল। ১৯৯০ দশক জুড়ে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশ। হাইকোর্টের ক্ষেত্রে ১৯৮০ দশকে শতকরা ৫৯ ভাগের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হত। ১৯৯০ দশকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫ শতাংশ।
মানবসমাজে অপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তি Capital Punishment হিসাবে বহুকাল আগে থেকেই প্রচলিত মৃত্যুদণ্ড। সর্বোচ্চ শাস্তি হিসাবে মৃত্যুদণ্ড প্রথম কার্যকর করা হয় মিশরে খ্রিস্টপূর্ব ষোলো শতকে। তখন কুঠার দিয়ে মুণ্ডচ্ছেদ করা হত। ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেনে সাধারণ অপরাধের জন্যও মৃত্যুদণ্ড দেওয়া। হত। খ্রিস্টপূর্ব ৪৫০ খ্রিস্টাব্দে কাদার মধ্যে পুঁতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করত ব্রিটিশরা। ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটেনে নতুন আইনে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় জীবন্ত সিদ্ধ করে। ব্রিটিশ আমেরিকান কলোনীতে ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে প্রথম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় ভার্জিনিয়ার জর্জ কেল্ডাবালাকে। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে টেক্সাসে প্রথম বিষাক্ত ইনজেকশন পুশ করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এখন দেখি কোন্ দেশে কী ধরনের মৃত্যুদণ্ডের প্রচলন আছে।
(১) শিরচ্ছেদ– সৌদি আরব, কাতার। (২) ইলেকট্রিক চেয়ার– আমেরিকা, ফিলিপাইন। (৩) ধাক্কা মেরে পাহাড় থেকে ফেলে দেওয়া– ইরান, চিলি। (৪) গ্যাস চেম্বার– আমেরিকা। (৫) ফাঁসি– আমেরিকা, আফগানিস্তান, ইরান, ইরাক, মঙ্গোলিয়া, জাপান, পাকিস্তান, ভারত, মিশর, ফিলিপনস, সিঙ্গাপুর, লাইবেরিয়া, কোরিয়া, বাংলাদেশ সহ অনেক দেশে। (৬) ইনজেকশন– আমেরিকা, ফিলিপিনস, গুয়েতমালা, থাইল্যান্ড, চিন, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম। (৭) ফায়ারিং স্কোয়াড– আমেরিকা, চিন, ভিয়েতনাম, রাশিয়া, লেবানন সহ অনেক দেশে। (৮) ছুরিকাঘাত— সোমালিয়া ইত্যাদি।
শুধু সেই রাষ্ট্রের বিচার-ব্যবস্থাই নরহত্যায় সামিল হয় তা নয়, রাষ্ট্রের যন্ত্র তথা পুলিশ মায় প্রতিরক্ষা বাহিনীর সমস্ত শাখাই নরহত্যা করে থাকে নির্বিচারে। পুলিশী হেফাজতে কত অভিযুক্তকে বিচারের আগে মেরে ফেলা হচ্ছে, তার হিসাব কে রেখেছে! সেনাবাহিনীর কর্মীরাও বহু ক্ষেত্রেই বিনা প্ররোচনায় মানুষ হত্যা করে থাকে। সেইরকমই এক হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে আজও দীর্ঘপ্রায় ১২ বছর ধরে শর্মিলা চানু অনশন চালিয়েছিল।
থানা, অর্থাৎ পুলিশ স্টেশনের কাছাকাছি যাঁদের বাড়ি তাঁদের প্রত্যেরই নিশ্চয় পুলিসের হেফাজতে থাকা ধৃত ব্যক্তির আর্তনাদ শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছে। তারপর পরের দিন সকালে খবরের কাগজে পুলিশের বয়ানে আষাঢ়ে গল্পও পড়েছেন। আষাঢ়ে গল্প এক : ধৃত ব্যক্তি আত্মহত্যা করেছে। আষাঢ়ে গল্প দুই : এনকাউন্টারে মৃত্যু। সবাই যে এ ঢপের গপ্পো বিশ্বাস করে তা নয়। ফলে তাঁরা ঘেরাও করে, ওসির শাস্তির দাবি করে। দু-চারদিন সেই প্রতিবাদের থাকে। তারপর সব শান্ত, যেন কিছুই হয়নি। অজানা থেকে যায় অত্যাচারী খুনী পুলিশের শাস্তি হল কি না। সকলের কাছে এটাই স্বাভাবিক বলে মনে হয় যে, পুলিশ ধৃত ব্যক্তিকে মারধোর করবেই এবং তা অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করার স্বার্থে। তাই বলে মেরে ফেলবে ধৃত ব্যক্তিকে, তাও বিনা বিচারে? পুলিশ মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে? পুলিশের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার অধিকার আছে? প্রশ্ন অনেক হলেও উত্তর একটাই : না। কারণ আইনের রক্ষক পুলিশ বাহিনীও আইনের অধীন। মূলত দুটি আইনের সাহায্যে পুলিশ ‘শান্তি-শৃঙ্খলা’ বজায় রাখে। (১) ভারতীয় দণ্ডবিধি বা ইন্ডিয়ান পেনাল কোড ও (২) সংশোধিত ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৯৭৩ বা ক্রিমিন্যাল প্রসিডিওর কোড। এই আইনে ধৃত ব্যক্তির উপর নির্যাতনের কোনো অধিকার দেওয়া হয়নি পুলিশকে, কোনো অবস্থাতেই নয়। তা সত্ত্বেও পুলিশ ধৃত ব্যক্তিকে যথেষ্ট বলপ্রয়োগ ও মারধোর করে। ভারতীয় দণ্ডবিধি ৩৩০, ৩৩১ ধারায় ও ফৌজদারি কার্যবিধি ১৯৭ ধারায় পুলিশের বিরুদ্ধে শাস্তির বন্দোবস্ত করা আছে। অপরাধ স্বীকৃতি আদায়ের জন্য শারীরিক আঘাত বা ক্ষত সৃষ্টি করা পুলিশের অপরাধ। সেক্ষেত্রে পুলিশের সাত বছর কারাদণ্ড হতে পারে। ধৃত ব্যক্তি যদি গুরুতর আহত হন তাহলে সেক্ষেত্রে দশ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। আবার শারীরিক নির্যাতন না করেও যদি নির্যাতনের ভয় দেখানো হয়, তাহলে সেটাও নির্যাতন করার অপরাধ হিসাবে গণ্য হবে। ১৯৮৯ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসের ২০ তারিখে রাষ্ট্রপুঞ্জের পৃষ্ঠপোষকতায় জেনেভায় অনুষ্ঠিত মানবাধিকার কমিশনের ৪৫ তম অধিবেশনে ভারত সরকারের প্রতিনিধি ও সংসদ সদস্য এস এস আলুওয়ালিয়া তাঁর ভাষণে বলেন –”নিপীড়ন হচ্ছে সবচেয়ে জঘন্যতম মানবাধিকার লঙ্ঘন। আমরা এও মনে করি যে, নিপীড়নের বিভিন্ন পদ্ধতি আছে। বিরোধী কণ্ঠস্বরকে স্তব্ধ করার জন্য এই ধরনের পদ্ধতি গ্রহণ করা হয়, যা সাংবিধানিক সমানাধিকারকে লঙ্ঘন করে। জঘন্যতম অত্যাচারগুলি সংঘটিত হয় টর্চার সেলে বা জেলখানায় … ব্যক্তিগত স্বাধীনতা অথবা বাঁচার অধিকার ভারতীয় সংবিধানে সকল নাগরিককে অর্পণ করেছে … ভারতের আইনবিধিতে পুলিশ কর্তৃক ধৃত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটানোর ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। পলায়নরত অথবা বাধাদানকারী ধৃত ব্যক্তিকেও পুলিশ হত্যা করতে পারে না। … জেরার সময় বন্দি ধৃতের উপর পুলিশ অফিসার থার্ড ডিগ্রি’ পদ্ধতি গ্রহণ না করে তার জন্য বিভিন্ন সময়ে ভারত সরকার নির্দেশ দিয়েছে।”
