শুধু আইন নয়, সারা বিশ্বের কাছে ভারত সরকার ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে ১০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের দফা মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষর করে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে, সেই সনদের ৫ ধারা (“No one shall be subjected to torture or to cruel, inhuman or degrading treatment or punishment.”) অনুসারে ভারতে কোনো বন্দিকে কোনো ধরনের নির্যাতন করা সম্পূর্ণভাবে বেআইনি ও মানবাধিকার লঙ্ঘন। মনে রাখা প্রয়োজন, নির্দিষ্ট বিধি মেনে পুলিশ কোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা মানেই সে ‘দোষী’ বা ‘অপরাধী’ নয়। যতদিন-না পর্যন্ত আদালতে ধৃত ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ পুলিশ প্রমাণ করতে পারছে, ততদিন পর্যন্ত ধৃত ব্যক্তি নিরপরাধ এবং সেই নিরপরাধকে অত্যাচার করা সর্বাধিক ১৫ দিনের পুলিশ হাজতে শুধু বেআইনি নয়, তাঁর ব্যক্তিসত্তার উপর চরমতম আঘাত। কারণ পুলিশ সাজা দেওয়ার অধিকারী নয়। সাজা দেওয়ার একমাত্র অধিকার আছে আদালতের।
কলকাতার টালিগঞ্জে ‘রিট্রিট’ নামে একটি অত্যাচার গৃহ আছে। খোদ লালবাজার সহ ভারতের সর্বত্র থানা লক আপে পুলিশ কর্তৃক ধৃতদের উপর বীভৎস অত্যাচার চলে। নানা কায়দায় নির্যাতন করে বহু ধৃত ব্যক্তিকে। অমানুষিক অত্যাচারের ফলে ধৃতব্যক্তি মৃত্যুমুখে ঢলে পড়ে। কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা ট্রেনিং স্কুলে পুলিশ প্রশিক্ষণের সময় থার্ড ডিগ্রি’ কায়দায় অত্যাচারের যে ফিরিস্তি পেশ করা হয়েছে, তা জানলে শিউরে উঠতে হয়। এলোপাথারি মারধোর করা, শরীরে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া, খাবার ও জল না দেওয়া এবং ঘুমোতে না দেওয়া, পেচ্ছাব খেতে বাধ্য করা, ইলেকট্রিক শক দেওয়া, উলঙ্গ করিয়ে ভিড় রাস্তা দিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া, বাঁশকল করে মাথা নিচু করে ঝুলিয়ে আগাপাশতলা ডাণ্ডা দিয়ে পেটানো, দু-পায়ে দড়ি বেঁধে মাথা নিচের দিক করে দীর্ঘক্ষণ ঝুলিয়ে রাখা, গরম জলের বোতল দিয়ে ছ্যাঁকা দেওয়া, হাত-পা বেঁধে পাজামার ভিতর আরশোলা বা ইঁদুর ঢুকিয়ে দেওয়া, দু-পায়ে দড়ি বেঁধে মাথা নিচের দিক করে দীর্ঘক্ষণ ঝুলিয়ে রাখা অবস্থায় মাথা বস্তা বেঁধে দেওয়া হয় এবং বস্তার ভিতর জ্যান্ত ইঁদুর বা আরশোলা ছেড়ে দেওয়া হয়, মলদ্বারের ভিতর কাঠি বা বিদ্যুত্বহী তার ঢুকিয়ে দেওয়া, দাড়ি বা চুল উপড়ে ফেলা, এক পায়ে এক হাত তুলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রাখা, ইংরেজি Z-এর মতো ত্রিভঙ্গ অবস্থায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা হামাগুড়ি দেওয়ানো, ধৃত বন্দির শরীরে পেট্রোল অথবা কেরোসিন অথবা অ্যাসিড সিরিঞ্জ দিয়ে পুশ করা ইত্যাদি। এইরকম অমানুষিক অকথ্য অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অনেক ধৃত ব্যক্তি মারা যান। ধৃত ছেড়ে দেওয়ার বাহানা করে মাঝরাতে লকআপ থেকে বের করে নির্জন জায়গায় নিয়ে গিয়ে গুলি মেরে ফেলার অভিযোগও পুলিশের বিরুদ্ধে আছে।
এলাহাবাদ হাইকোর্টের প্রাক্তন বিচারপতি এ এন মোল্লা ১৯৬৪ খ্রিস্টাব্দে জনৈক পুলিশ অফিসার নঈমের বিরুদ্ধে জনৈক ভারতীয় নাগরিকের মামলার রায়ে বলেছিলেন : “সমস্ত দায়িত্ব নিয়েই আমি একথা বলতে পারি যে, সারা দেশে এমন কোনো গোষ্ঠী নেই যাঁদের অপরাধের খতিয়ান ধারে কাছেও যেতে পারে সেই সংগঠিত গুণ্ডাবাহিনীর, যার নাম কিনা ভারতীয় পুলিশ বাহিনী।”
পুলিশ মানুষ হত্যা করে। অসহায় ধৃতদের নির্বিবাদে হত্যা করে। বিচারে ধৃতের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণ হওয়ার আগেই হত্যা করে। বস্তুত ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীর কাছে ক্ষমতা বুঝে নেওয়ার পরে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ‘লৌহমানব’ বল্লভভাই প্যাটেল উচ্চকিত কণ্ঠে বলেছিলেন– “এতদিন আমরা যে পুলিশ বাহিনীর সমালোচনা করেছিলাম, সে অন্য পুলিশ। আর এখনকার পুলিশ হল স্বেচ্ছাসেবক…”। তারপর অনেক জল গড়িয়ে গেছে গঙ্গা-যমুনা কৃষ্ণা-গোদাবরী দিয়ে। ভারতের অন্য রাজ্যের কথা কথা তো বাদই দিলাম। শুধু পশ্চিমবঙ্গেই খুনি পুলিশবাহিনীদের ট্র্যাক রেকর্ড দেখলে চমকে যেতে হয়।
যত দিন যাচ্ছে ‘স্বাধীন’ রাষ্ট্রের পুলিশের নিশানা ততই অব্যর্থ হয়ে উঠছে। মাথা, বুক, পেট ভেদ করে তপ্ত সিসা অনেকদিন আগেই জানিয়ে দিয়েছে– প্রতিবাদ করলেই মৃত্যু, অধিকারের কথা বললেই বিচ্ছিন্নতাবাদী, মুখ খুললেই দেশদ্রোহিতা। অতএব চুপ করে থাকো সবাই। কথা বললেই গুম। বিরোধিতা করলেই বিনাশ। অনুগত হও। অনুগত হও। অনুগত হও। বেগড়বাই করলেই রাষ্ট্রের অঙ্গুলি হেলনে অন্তরীণ। গণতন্ত্রে মানুষের কথাই শেষ কথা, মানুষের হৃদয়ের ভাষাই রাষ্ট্রের ভাষা– এই পরম সত্যটিকে বিদ্রূপ করতেই যেন পুলিশের কথাই শেষ কথা। পুলিশ-হাজতে বা তত্ত্বাবধানে ধৃত ব্যক্তিদের মৃত্যুর সংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে, তা মানবসভ্যতার অপমৃত্যুকেই ডেকে আনছে।
১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১০ নভেম্বর। স্বাধীন রাষ্ট্রের বয়স তখন মাত্র তিন মাস। আমরা সেদিন প্রথম বুঝলাম শাসক বিদেশি না স্বদেশি সেটা কোনো বিষয় নয়– শাসক শাসকই হয়। বিদেশিই হোক অথবা স্বদেশি– আসল বিষয় ছলে-বলে-কৌশলে ক্ষমতার হস্তান্তর। ব্রিটিশদেরই তৈরি ‘স্পেশাল পাওয়ার বিল’ (এ বিল মানুষকে অবাধে খুন করার বিল বা ছাড়পত্র প্রত্যাহারের দাবিতে মিছিল বের করেছিল একদল ভারতীয় নাগরিক ভারতের মাটিতেই। সম্পূর্ণ নিরীহ ওই মিছিলের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল স্বাধীন ভারতের স্বদেশি পুলিশের গুলি। অকুস্থলে লুটিয়ে পড়ল আরডব্লিউএসির স্বেচ্ছাসেবক জনৈক শিশির মণ্ডল। স্বাধীন দেশের স্বদেশি পুলিশের বন্দুকবাজির প্রথম শিকার। ১৯৫৯ এবং ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতবাসী দু-দফায় খাদ্য আন্দোলনে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের ভংয়কর দানবীয় রূপ প্রত্যক্ষ করেছিল। এ বছরেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের সামনে দশ হাজারের বেশি ছাত্রছাত্রীর এক বিশাল মিছিলের উপর পুলিশের গুলি চালায়। নির্বিচারে এই গুলি বর্ষণে মৃত্যু হয় ১১ জনের। ৩ সেপ্টেম্বর আবার গুলি চলল কলকাতা, হাওড়া ও ২৪ পরগনায়– মৃত্যু হল ১৫ জনের। পরের দিন আবার গুলিবর্ষণ। মৃত্যু হল ১০ জনের। সব মিলিয়ে এক সপ্তাহে পুলিশ হত্যা করেছিল প্রায় ৮০ জনকে।
