যেভাবেই হোক অবশেষে ভারত ব্রিটিশমুক্ত হল। ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট। কিন্তু তথাকথিত এই স্বাধীন ভারতবর্ষে ঔপনিবেশিক যুগের রাষ্ট্র পরিচালনার পদ্ধতিগুলো সরাসরিভাবে উত্তর-ঔপনিবেশিক যুগে স্থায়ী রূপ নিল। অপরিবর্তিতই থেকে গেল আমলাতন্ত্র, পুলিশী ব্যবস্থা ও মিলিটারি কাঠামো। ফৌজদারি, দেওয়ানি আইনের বিশেষ কোনো পরিবর্তনই হল না। বহাল থাকল মৃত্যুদণ্ডও। পরিবর্তন যে কিছু হয়নি, তা অবশ্য বলা যায় না। যেমন ধরুন, ১৮৯৮ সালের যে কার্যবিধি অনুসারে হত্যার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড দেওয়াটাই ছিল বাধ্যতামূলক, আর ব্যতিক্রম ছিল যাবজ্জীবন কারাদণ্ড– সেই কার্যবিধি ১৯৫৫ সালে আইন সংশোধন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হল নিয়ম, মৃত্যুদণ্ড হল ব্যতিক্রম। ১৯৮৩ সালের ৭ এপ্রিল থেকে ম্যাকলের ৩০৩ ধারা বাতিল হয়ে যায়। কারণ এই ধারায় মৃত্যুদণ্ড ছিল বাধ্যতামূলক।
ভারতে মৃত্যুদণ্ডের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি পি এন ভাগবতী স্পষ্টভাবে বললেন– মৃত্যুদণ্ড ভারতীয় সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদের (জীবনের অধিকার) পরিপন্থী। মৃত্যুদণ্ড তাই সংবিধান বিরোধী। মাননীয় বিচারপতির যুক্তি– (১) সংবিধানে সবিস্তারে বলা নেই যে, মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ। কিন্তু জীবনের অধিকারের ধারণা, রাষ্ট্রপতি বা রাজ্যপালের ক্ষমা প্রদর্শনের ক্ষমতা একটি ধারণাই প্রতীয়মান করে যে, মৃত্যুদণ্ড বিরোধী প্রবণতার দিকেই পাল্লা ভারী। তাঁর ভাষায়– “The legislative amendments, has shifted the punitive centre of gravity from life to life sentence.” (২) মৃত্যুদণ্ড সম্পূর্ণভাবে অ-পরিবর্তনযোগ্য (irrevocable/irreversible)। যতদিন মৃত্যুদণ্ড প্রথা থাকবে, ততদিন আদালতের পূর্ণ সম্ভাবনা থাকবে নির্দোষ ব্যক্তির প্রাণ নিয়ে নেওয়ার। (৩) বিগত ১৫০ বছরের ইতিহাসে দেখাতে পারেনি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের তুলনায় মৃত্যুদণ্ড অনেক বেশি প্রতিরোধক হিসাবে কার্যকর। (৪) এই প্রথা স্বেচ্ছাচারমূলক ও অযৌক্তিক এবং তাই ভারতীয় সংবিধানের ১৪ এবং ২১ অনুচ্ছেদ লঙ্ঘনকারী। (৫) মৃত্যুদণ্ডের প্রশ্নে বিচারপতির ‘discretion’ থাকার অর্থ বিচারপতির ভাবাদর্শ, মূল্যবোধের উপর একজনের যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ড নির্ভর করবে। (৬) প্রাণদণ্ডের শ্রেণিচরিত্র আছে। গরিব ও অবহেলিত মানুষরাই এর শিকার হয়।
এ প্রসঙ্গে বিচারপতি কৃষ্ণ আয়ার বচন সিং মামলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতকে ‘rarest of rare cases’ বা Judicial gamble’ বা বিচারবিভাগীয় জুয়াখেলা আখ্যা দিয়েছেন। হেতাল পারেখ মামলায় ধনঞ্জয়ের মৃত্যুদণ্ড এমনই এক জুয়াখেলার শিকার বলে মনে করেন বিদগ্ধজনেরা। এই রায় দিতে গিয়ে আদালত বলেছিল— ‘rarest of rare cases’। সেই বিচার, সেই মৃত্যুদণ্ডের রায় যে ভুল ছিল তার ব্যাখ্যা দিয়ে দেবাশিস সেনগুপ্ত, প্রবাল চৌধুরী পরমেশ গোস্বামী রচিত “আদালত, মিডিয়া, সমাজ এবং ধনঞ্জয়ের ফাঁসি’ শিরোনামে একটি তথ্যসমৃদ্ধ বই প্রকাশিত করে। এমনকি এই বিতর্কিত মৃত্যুদণ্ড নিয়ে পরিচালক অরিন্দম শীল ‘ধনঞ্জয়’ নামে একটি সিনেমাও করলেন। ১৯৯০ সালে এক কিশোরীকে ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ ওঠে ধনঞ্জয়ের বিরুদ্ধে। ১০ বছর কারাবাসের পর ২০০৪ সালে তাঁর ফাঁসি হয়। তখন থেকেই উঠেছে প্রশ্ন। অনেকেই বলেন, ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায় যে মামলায় অভিযুক্ত প্রমাণিত হয়েছেন, তার বহু কিছুই পোয়াঁশায় ভরা, বহু ‘প্রমাণ’ মূলত গোঁজামিল। এমনকি সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ জড়ো করে এগোলে ধনঞ্জয় চট্টোপাধ্যায়ের ঘটানো ‘অপরাধ’ আদৌ প্রমাণ করা যায় কি না, এ নিয়েই সন্দেহ তৈরি হয়। এমনকি ওই সাক্ষ্যপ্রমাণ থেকে ভিন্নতর সিদ্ধান্তে পৌঁছনোও সম্ভব ছিল বলে দাবি ওঠে। বিচারে বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদলে, সেই কান্না শুনবে কে?
ধনঞ্জয়ের ফাঁসি ভুল ছিল কি ঠিক ছিল, সেই বিচার করা আজ আর কোনো মানে রাখে না। যদি ভুল হয়, তাহলে তাঁকে তো আর পুনর্জীবন দেওয়া সম্ভব নয়! মানুষ কেবল হত্যা করতে পারে, কিন্তু প্রাণ ফিরিয়ে দিতে অক্ষম। হেগেল তাঁর উপযোগবাদের শাস্তির তত্ত্বে বলেছেন, “শান্তি মানে ভুলের বাতিল (annulment of wrong)”। অর্থাৎ যা ঘটে গেছে, যাকে হত্যা করা হয়েছে তাঁকে কী ফিরিয়ে আনা যাবে? হেগেলের মতে, শাস্তি মানে যন্ত্রণা ভোগ করার জন্য দৈহিক নির্যাতন। তাই যদি হয় এবং নির্যাতিত বা অপরাধের পক্ষে যদি ন্যায় বিচার দিতে হয় তাহলে তা হত্যার বদলে হত্যা। এই ধরনের হত্যাকে বলা হয় রাষ্ট্র কর্তৃক একটি হোমিসাইড। রাষ্ট্র বারবার সেই ধরনের হত্যাকেই সবচেয়ে ভয়ংকর বলেছে যা পূর্বপরিকল্পিত, যাকে বলা হয় ঠান্ডা মাথায় খুন এবং একটি প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতির মাধ্যমে তার সমপরিমাণে যোগ্য শাস্তি হল আর-একটি হত্যা। তাই নয়কি? যে নৈতিকতার মানাঙ্কে একজন অপরাধী ব্যক্তিকে রাষ্ট্র মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে, সে নিজেও সেই নৈতিকতার মানাঙ্কে ঠান্ডা মাথায় পূর্বপরিকল্পিতভাবে দিনক্ষণ পদ্ধতি নির্দিষ্ট করে হত্যা করছে। ক্যামুর ভাষায়– “The death penalty … usurps as exorbitant privilege by claiming to punish an always relative culpability by a definitive and irrepairable punishment.”
