দণ্ডের কেন প্রয়োজন? (১) ভয়ংকর দণ্ডের উপস্থিতিতে শৃঙ্খলা ভাঙার প্রতিরোধক হিসাবে কাজ করে এবং (২) দণ্ড হবে এমন ভয় যদি প্রতিরোধক হিসাবে কাজে না-দেয়, তখন অপরাধের তারতম্য অনুসারে দণ্ড প্রয়োগ করতে হবে। মনু দণ্ডের চারটি পর্যায় নির্ণয় করেছেন। সেগুলির মধ্যে চরমতম হল মৃত্যুদণ্ড। মৃত্যুদণ্ডের আবার দুটি মানদণ্ড। অব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে একরকম, ব্রাহ্মণদের ক্ষেত্রে অন্যরকম। অর্থাৎ একই ধরনের অপরাধে শূদ্রের যেখানে মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত, সেখানে ব্রাহ্মণ হলে মৃত্যুদণ্ড হবে না। ব্রাহ্মণ যদি সত্যিই তেমন অপরাধ করে ফেলেন, তখন তাঁকে মস্তকমুণ্ডন করে দেওয়া বা নির্বাসনে পাঠাতে পারেন রাজা। কিন্তু কখনোই কোনো অপরাধেই ব্রাহ্মণকে হত্যা করা যাবে না। হত্যা করা তো দূরের কথা, ব্রাহ্মণকে হত্যা করব এমন ভাবাটাও রাজা বা দণ্ডদাতার জন্য পাপ। অবশ্য বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থা অনুযায়ী একই অপরাধের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড হতে পারে ব্রাহ্মণ থেকে শূদ্র সকলেরই। রায়দানকালে কে ব্রাহ্মণ কে শূদ্র দেখার নিয়ম নেই।
কৌটিল্যের যুগে চার ধরনের অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান ছিল– (১) রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গুপ্তচর বৃত্তি, (২) রাষ্ট্রের সম্পত্তি, রাজার ব্যক্তিগত ধন চুরি, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, (৩) নৃশংস কোনো অপরাধ এবং (৪) অপহরণ ও ধর্ষণ, ব্রাহ্মণ নারীর সঙ্গে শূদ্রের যৌনসম্পর্ক এবং তীর্থস্থানে চুরি, ডাকাতি ইত্যাদি।
শুধু প্রাচীন যুগেই নয়, মধ্যযুগেও মৃত্যুদণ্ড বহাল ছিল। ভারতের মধ্যযুগে, অর্থাৎ সুলতান ও মোগল যুগে অনেকক্ষেত্রেই লিখিত কোনো আইন ছিল না। সেসময় সুলতান বা শাসকের ইচ্ছাই চূড়ান্ত। কারণ তিনিই দণ্ডমুণ্ডের কর্তা। মূলত ইসলামী আইন তথা আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত বিধান অনুসারেই শাস্তি প্রদান করা হত। “আইন-ই-আকবরী গ্রন্থ থেকে জানা যায়, বাংলার গৌড় দুর্গের উত্তরে কয়েক মাইল দূরে বিশাল বাড়ি জলাধার ছিল। আর সেই জল ছিল বিষাক্ত। মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধীদের সেখানে বন্দি অবস্থায় রাখা হত। তৃষ্ণার্ত বন্দিরা সেই বিষাক্ত জলাশয়ের জল পান করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। আকবর অবশ্য এই ধরনের মৃত্যুদণ্ড বাতিল করেছিলেন। বাতিল করেছিলেন আরও এক ধরনের নিষ্ঠুর মৃত্যুদণ্ড, যেক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডাজ্ঞাপ্রাপ্ত অপরাধীকে জীবন্ত অবস্থায় গায়ের চামড়া ছাড়িয়ে নেওয়া হত। সম্রাট জাহাঙ্গিরের আত্মজীবনী ‘তুজুক-ই-জাহাঙ্গির’ থেকে জানা যায়, তিনি ৭০০ জন বিশ্বাসঘাতককে জীবন্ত অবস্থায় শূলে চড়িয়ে হত্যা করেছিলেন। এই ব্যবস্থায় অপরাধীরা তিল তিল করে মরত। প্রতিপালকের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলে কেমন হতে পারে, তার ভয় দেখানো। এছাড়া প্রকাশ্য দিবালোকে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের সামনে অপরাধীদের নৃশংস মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হত, যাতে মৃত্যুর আতঙ্ক সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সপ্তদশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে Manrique নামে এক পর্যটক এসে প্রত্যক্ষ করেছিলেন, যেসব গাছে ফল ফলত না, সেইসব গাছে চোর-ডাকাতের ঝুলন্ত মৃতদেহ।
ভারতে কোম্পানি যুগে এবং ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ধরনের অপরাধ অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ড বহাল ছিল। ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের আগে পর্যন্ত ভারতের বিদ্যমান ফৌজদারি আইনগুলিকে লর্ড ম্যকলে অ্যাংলো-মুসলমান নির্মাণ বলে চিহ্নিত করেছেন। তবে ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী কোম্পানির প্রণীত ফৌজদারি আইন কোনো ব্যক্তির জীবন কেড়ে নেওয়ার বৈধতা দিল ঔপনিবেশিক রাষ্ট্রকে। যদিও আরও আগে, ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দে ওয়ারেন হেস্টিংস আদেশ দিয়েছিলেন ডাকাতদের প্রকাশ্যে নিজেদের গ্রামে ঝুলিয়ে ফাঁসি দেওয়া হবে। আজও গ্রামে ‘ফাঁসিতলা’ নামে জায়গার বা অঞ্চলের নাম পাওয়া যায়। ১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে ‘কোর্ট অব ডিরেক্টরস’ প্রাণ কেড়ে নেওয়ার পর মৃতদেহ প্রকাশ্যে ঝুলিয়ে রাখা নিষিদ্ধ করে দেয়। ম্যাকলে ছিলেন মৃত্যুদণ্ডের ঘোরতর সপক্ষে। ভারতেও ম্যাকলে, মিলেট ও ম্যাকলিয়ড এই তিনজন মিলে চার বছর ধরে কঠোর পরিশ্রম করে ভারতীয় দণ্ডবিধির খসড়া প্রস্তুত করেন। ১৮০৮ সালে ইংল্যান্ডে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে কি থাকবে না তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক হয়। ছোটোখাটো অপরাধেও মৃত্যুদণ্ড হত। আক্ষরিক অর্থেই লঘুপাপে গুরুদণ্ড আর কি। মুরগি চুরি করলেও চোরের ফাঁসি হত। সেই আইন বাতিল করার লক্ষ্যে ‘রোমিলি বিল’ পেশ করা হয়। অবশেষে ১৮২০ খ্রিস্টাব্দে ‘রোমিলি বিল’ পাশ হলে চুরির দায়ে চোরের ফাঁসি বাতিল হয়।
১৮৬০ খ্রিস্টাব্দের পর ভারতে ম্যাকলে প্রণীত ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) প্রয়োগ শুরু হল। যদিও ভারতীয় এই দণ্ডবিধি চালু হওয়ার কথা ছিল ১৮৬১ খ্রিস্টাব্দের ১ মে, কিন্তু চালু হল ১৮৬২ খ্রিস্টাব্দের ১ জানুয়ারি। ম্যাকলে প্রণীত ইন্ডিয়ান পেনাল কোডে সাতটি প্রধান অপরাধের ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ড বিধান রেখেছিলেন। তবে বিকল্পে যাবজ্জীবনের ব্যবস্থাও রেখেছিলেন। আমরা এবার দেখে নেব সেই সাতটি প্রধান অপরাধ কেমন। (১) রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা, বিদ্রোহে মদত। (২) কারোকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া। (৩) হত্যা। (৪) যাবজ্জীবন কয়েদি দ্বারা হত্যা (৩০২ ধারা)। (৫) অপ্রাপ্তবয়স্ক বা উন্মাদকে প্ররোচনা অথবা মদত দেওয়া। (৬) ডাকাতি ও হত্যা। (৭) যাবজ্জীবন কয়েদি দ্বারা হত্যা (৩০৭ ধারা)। ম্যাকলের এই কোডের অনুশাসনে কত যে লক্ষ লক্ষ সামাজিক অপরাধী তথা সশস্ত্র বিপ্লবীদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল তার একটা সম্পূর্ণ তালিকা আজও করে ওঠা সম্ভব হয়নি। অষ্টাদশ, উনবিংশ, বিংশ শতাব্দীর ভারতের মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাসকে মনে করিয়ে দেয় আন্দামান সেলুলার জেল এবং তার ফাঁসির মঞ্চ। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সিপাহি বিদ্রোহের পর ব্রিটিশরা ভারতীয় বিদ্রোহীদের কামানের মুখে বেঁধে উড়িয়ে দিত। কিন্তু কামানের গোলা কতজনকে ওড়ানো সম্ভব! তাছাড়া কামানের গোলা-বারুদের খরচও বিস্তর। এদিকে টেলিগ্রাফ পোস্টে বিদ্রোহীদের ফাঁসি দিয়ে টাঙিয়ে রাখতে রাখতে ব্রিটিশরা ক্লান্ত। প্রকাশ্যেই সেসব ফাঁসি দেওয়া হত। পাছে এসব দেখে মানুষ যদি ক্ষেপে যায়, সেই কারণে জনসাধারণের চোখের আড়ালে নিভৃতে হত্যা করাই কাম্য। অতএব বাকি বিদ্রোহীদের আন্দামানে পাচার। এখানে সারা বিশ্বের চোখের আড়ালে কয়েদি তথা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উপর নির্মম অত্যাচার করা ছিল সহজ। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিলে ২৩৮ জন করাবন্দি জেল থেকে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে যায়। তাঁদের মধ্যে ৮৭ জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। ফাঁসি হয় রস আইল্যান্ডের গভীর অরণ্যে। বাকিদের পরিণতি আলাদা করে বলার কিছু নেই। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে বড়োলাট লর্ড মেয়ো আন্দামান পরিদর্শনে এসেছিলেন। সুযোগ বুঝে শের আলি লর্ড মেয়েকে হত্যা করেন। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দের ৮ ফেব্রুয়ারি শের আলির ফাঁসির গলায় পরে শহিদ হন। পোর্ট ব্লেয়ারের পাশে ভাইপার দ্বীপের জেলে এই ফাঁসি কার্যকর করা হয়। মাত্র ৩ বছর সময়ের মধ্যেই সেই কুখ্যাত সেলুলার জেলটি নির্মিত হয়েছিল ৬০০ কয়েদির রক্ত-ঘাম ঝরিয়ে দিন-রাত অক্লান্ত পরিশ্রমে। শের আলিই প্রথম কয়েদি, যিনি আন্দামানের প্রথম শহিদ। মনে রাখতে হবে যে, সেলুলার জেলে শুধু রানৈতিক বন্দিদেরই রাখা হত না, রাখা হত অন্যান্য বন্দিদেরও। মৃত্যুদণ্ডাদেশ প্রাপ্ত সেইসব বন্দিদের সেলুলার জেলের ফাঁসিঘরে ফাঁসি দেওয়া হলেও কোনো রাজনৈতিক বন্দিদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছে বলে কোনো নথি পাওয়া যায় না।
