(৩৩) শূলে চড়ানো : শূলে চড়ানো’ বা ‘শূলবিদ্ধ করা একটি প্রাচীন শাস্তি বা মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পদ্ধতি। নিঃসন্দেহে এটি ছিল ভয়াবহ ও বর্বরোচিত শাস্তি। প্রথম শূলে চড়ানোর ইতিহাস পাওয়া যায় প্রাচীন নিকট প্রাচ্যে। সে সময় রাজদ্রোহীদের শূলে চড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত। তৎকালীন পারস্যের রাজা প্রথম দারায়ুস ব্যাবিলন জয় করার পর প্রায় ৩ হাজার ব্যাবিলনবাসীকে শূলে চড়িয়েছিলেন। একটি সুচালো দণ্ড বা খুঁটিকে দেহের ছিদ্রপথে বিশেষ করে পায়ুপথে প্রবেশ করানো হত। তারপর খুঁটিটিকে মাটিতে গেঁড়ে দেওয়া হত। একসময় সুচালো অংশটি অপরাধীর শরীর ভেদ করে বুক অথবা ঘাড় দিয়ে বের হয়ে যেত। অপরাধী ব্যক্তিটি এভাবে একসময় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ত। অনেক সময় খুঁটিটির মাথা সুচালো না-করে ভোঁতা রাখা হত, যাতে হৃৎপিণ্ড বা অন্যান্য প্রধান অঙ্গ বিদ্ধ হয়ে তাড়াতাড়ি মারা না যায়। এতে অপরাধী বেশি কষ্ট পেত। কেননা মারা যেতে কয়েক ঘণ্টা এমনকি একদিন সময়ও লাগত। শূলে চড়ানোর মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি কুখ্যাত ছিল প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যের ওয়ালেশিয়া রাজ্যের যুবরাজ তৃতীয় স্লাদ, যাকে বলা হত ড্রাকুলা। তৎকালীন তুরস্কেও এ পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। তুর্কিদের হাতে একবার আটক হওয়ার সময় তৃতীয় স্লাদ মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার এ পদ্ধতিটি শিখে নেয়। ড্রাকুলা যুদ্ধবন্দি ও রাজদ্রোহীদের শূলে চড়াত সাধারণ প্রজাদের সামনেই, যাতে তাঁরা ড্রাকুলাকে ভয় পায়। তাঁর শত্রুদের জন্যও এটা ছিল তাঁর প্রতি ভয়াবহতার ইঙ্গিত। তবে ড্রাকুলার শূলে চড়ানোর পদ্ধতি ছিল ভিন্নতর। পেট অথবা পিঠের মধ্য দিয়ে সুচালো কোনো দণ্ড ঢুকিয়ে দিয়ে তা মাটিতে গেঁড়ে দেওয়া হত। এভাবে একসঙ্গে অনেক মানুষকে শূলে চড়িয়েছেন ড্রাকুলা। আফ্রিকান উপজাতি জুলুদের মধ্যে শূলে চড়ানো প্রচলিত ছিল। জাপান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়ায়ও একসময় এ পদ্ধতি প্রচলিত ছিল। পাক-ভারত উপমহাদেশের ভারতের তামিলনাড় ও কেরল প্রদেশে নিকট অতীতে শূলে চড়ানোর মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত।
(৩৪) চূর্ণ বা পিষ্টকরণ : চূর্ণকরণ বা Crushing কোনো কিছু চাপা দিয়ে পিষ্ট করার ব্যাপারটা ইউরোপ, আমেরিকায় বেশি প্রচলন ছিল। সাধারণত জোরপূর্বক কিছু আদায় করার ক্ষেত্রে তাঁরা এই শাস্তিটি ব্যবহার করত। এই পদ্ধতিতে বন্দিকে মাটির সঙ্গে শুইয়ে তাঁর শরীরের উপর কাঠের তক্তা রাখা হত এবং কাঠের তক্তার উপর ভারী ভারী পাথর রাখা হত। ততক্ষণ পর্যন্ত এই শাস্তি চলতে থাকত যতক্ষণ-না বন্দি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হত।
(৩৫) বিশাল পাথর বেঁধে জলে নিক্ষেপ করে মৃত্যুদণ্ড : প্রাচীনকালে অপরাধ করলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সমুদ্র বা নদীর জলে ডুবিয়ে মারা হত। যাতে জলের উপর ভেসে উঠতে না পারে এবং সাঁতরে পালিয়ে যেতে না পারে সেই কারণে ব্যক্তির শরীরের সঙ্গে বিশাল পাথরের চাঁই দড়ি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হত। সেই পাথরের ভারে ব্যক্তির দেহ জলের অতলে তলিয়ে যেত। ভাগবতপুরাণে বর্ণিত হিরণ্যকশিপু-কায়াদু পুত্র প্রহ্লাদকে বিষ্ণুভক্ত হওয়ার অপরাধে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেয় পিতা হিরণ্যকশিপু স্বয়ং। কিন্তু যতবারই তিনি বালক প্রহ্লাদকে বধ করতে যান, ততবারই বিষ্ণুর মায়াবলে প্রহ্লাদের প্রাণ রক্ষা পায়। তারই মধ্যে প্রহ্লাদকে শরীরে পাথর বেঁধে জলে নিক্ষেপ করা ছিল একটি উপায়। যদিও সব উপায়ই ব্যর্থ হয়েছিল গল্পের খাতিরে। বাস্তবে কিন্তু। বাঁচার কোনো উপায় নেই।
(৩৬) ঘোড়ার পিছনে বেঁধে : মধ্যযুগে রাজা সম্রাটরা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধীর দুই পায়ে শক্ত দড়ি বেঁধে দুটি ঘোড়ার সঙ্গে বেঁধে দেওয়া হত। এরপর ঘোড়া দুটিকে ছুটিয়ে দেওয়া হত। দুটি ঘোড়া দু-দিকে তীব্র বেগে ছুটে যাওয়ার সময় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পা ছিঁড়ে শরীর দু-ভাগ হয়ে মারা যেত।
লোমহর্ষক বটে! যেসব গ্রন্থগুলিকে আমরা ধর্মশাস্ত্র বা কিতাব বলি, সেগুলি আসলে আইন– অনুশাসন গ্রন্থ। বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় যেটাকে আমরা আইনগ্রন্থ বা সংবিধান বলি। বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থার অনুশাসনগুলি ঈশ্বর বা আল্লার নামে প্রয়োগ করা হলেও, বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থায় অনুশাসন চলে রাষ্ট্রের নামে। তথাকথিত ধর্মানুশাসন যেমন বিভিন্ন সময়ে প্রয়োজন অনুসারে পরিবর্তন/সংযোজন/বর্জন করা হত, ঠিক তেমনি বর্তমান রাষ্ট্রব্যবস্থাতেও অনুশাসন বা আইনের ধারাগুলি পরিবর্তন/সংযোজন/বর্জন করা হয় প্রয়োজন অনুসারে। পার্থক্য হল ধর্মীয় অনুশাসনগুলি যতটা শ্রদ্ধার সঙ্গে মান্য করে চলে মানুষ, রাষ্ট্রব্যবস্থায় অনুশাসন বা আইনগুলি ততটা মান্য করে না। বরং অমান্য করতেই মানুষ উদগ্রীব। অ-মান্য করে ধরা পরলে তা থেকে রেহাই পাওয়ারও নানারকম ফন্দিফিকির বের করা হয়।
মনুসংহিতায় বলা হয়েছে– “তস্মাদ্ধর্মং যমিষ্টেষু স ব্যবসেন্নরাধিপঃ”। অর্থাৎ শিষ্টের পালন এবং দুষ্টের দমনের জন্য ধর্মের যে ব্যবস্থা করা আছে, রাজা যেন সেই ধর্মের ব্যবস্থা করেন এবং তা থেকে বিচ্যুত না হন। প্রাচীনকালে যিনিই রাজা, তিনিই দণ্ডদাতা। ধর্মশাস্ত্রজ্ঞ (আইন বিশেষজ্ঞও বটে) মেধাতিথি বলেছেন – পূর্বতন শাস্ত্র ও সামাজিক আচারের অবিরুদ্ধ যে নিয়মকানুন, রাজা সেগুলোর ব্যবস্থা করবেন– “কার্যব্যবস্থাং শাস্ত্রাচারবিরুদ্ধা”। দণ্ড কেমন দেখতে? মনু তারও বর্ণনা দিয়েছেন– এক ঘোর কৃষ্ণবর্ণ পুরুষ। তাঁর চোখ দুটি ক্রোধে রক্তিম।
