(২৭) কলম্বিয়ার নেকটাই : এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয় শুধুমাত্র মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির গলা কাটা হয়, সেই কাটা অংশ থেকে ব্যক্তির জিভ বের করে রাখা হত। প্রকাশ্যে প্রদর্শনীর জন্যেও রাখা হত। যাতে অন্যান্য মাদক ব্যবসায়ীদের মধ্যে ভয়ের সৃষ্টি হয়। কলম্বিয়ার নেকটাই বা Colombian Necktie পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি এখনও কলম্বিয়া সহ লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে প্রচলিত আছে।
(২৮) সেপপুকু : সেপপুকু বা Seppuku মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি আসলে আত্মহত্যার সামিল। জাপানের সামুরাইদের মধ্যে বেশি প্রচলিত। এই পদ্ধতিতে মৃত্যুবরণ করা অনেকটা সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করার পর্যায়ে পরে। সামুরাই নিজের তলোয়ার দিয়ে নিজের পেটে আঘাত করে নিজের পেটের ভিতর দিয়ে নাড়িভুঁড়ি বাইরে বের করে নিয়ে আসে। সে সময় তাঁর কাছের কোনো বন্ধু তলোয়ার দিয়ে এক কোপে আত্মহত্যাকারীর মাথা শরীর থেকে পৃথকটা করে ফেলত। এহেন মৃত্যুবরণ করা অমানবিক মনে হলেও মৃত্যুবরণকারী সামুরাইয়ের কাছে এটি অনেক সম্মানের সঙ্গে মৃত্যুবরণ করা এবং তাঁর বন্ধুর কাছে বন্ধুর প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানানো।
(২৯) ক্রুশকাঠে বিদ্ধ করা : ক্রুশকাঠে বিদ্ধ করে হত্যা বা Crucifixion যদিও ধর্মীয়ভাবে খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের কাছে অনেক পবিত্র। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সমস্ত ব্যক্তিকে এভাবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হত। এটি ছিল রোমানদের সব থেকে জনপ্রিয় পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার আগে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে অনেক অত্যাচার করা হয়। তারপর তাঁকে বাধ্য করা হত তাঁকে যে ক্রুশকাঠে ঝোলানো হবে সেই ক্রুশকাঠটিকে নিজের কাঁধে করে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জায়গায় নিয়ে যাওয়ার জন্য। এরপর তাঁকে ক্রুশকাঠের উপর শুইয়ে তাঁর দু-হাতের তালু বরাবর লোহার পেরেক পুঁতে দেওয়া হত। এছাড়াও তাঁর দু-পা এক জায়গায় এনে লোহার পেরেক পুঁতে দেওয়া হত খুঁটির সঙ্গে। এভাবেই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি ঝুলে থাকত মৃত্যু না-হওয়া পর্যন্ত। সাধারণত সপ্তাখানেক সময় লাগত মৃত্যু হতে। মৃত্যু সম্পন্ন হত শ্বাস বন্ধ হয়ে। জিশুখ্রিস্ট এভাবেই ক্রুশবিদ্ধ হয়ে মারা যান। এই ধারণা থেকেই খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের কাছে ক্রুশ একটি পবিত্র চিহ্ন বা প্রতীক। কিন্তু খ্রিস্টজন্মের বহু আগে থেকেই রোমান সভ্যতায় খুঁজে পাওয়া যায় ইংরেজি ‘T’ অক্ষর সদৃশ তিনবাহু বিশিষ্ট মানুষ হত্যা করার বিশেষ অস্ত্র বিশেষ। উল্লেখ্য, ‘T’ থেকেই ক্রুশচিহ্ন এর সৃষ্টি হয়েছে এমন দাবি কারও পক্ষেই জোর করে করা সম্ভব নয়। তবে দুটি প্রতাঁকের কাজের মিল এবং গাঠনিক মিল বেশ স্পষ্টভাবেই দৃশ্যমান। অনেকেই মনে করে থাকেন। জিশুখ্রিস্টর ক্রুসিফিকেশন ইতিহাসের প্রথম নির্মম হত্যাকাণ্ড। কিন্তু তাঁদের এই ধারণা সম্পূর্ণই ভুল। আসিয়রিয়ান, গ্রিক এবং পারসিয়ান সভ্যতায় ভুরি ভুরি উদাহারণ খুঁজে পাওয়া যায় কুসিফিকেশন করে দেশদ্রোহী এবং ক্রীতদাসদের হত্যা করার জন্য।
(৩০) বিষাক্ত ইনজেকশন : মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে প্রথমে স্নান করিয়ে তাঁকে শেষ খাবার দেওয়া হয় এবং তাঁর নিজ ধর্ম অনুযায়ী প্রার্থনা করানো হয়। পরে তাঁকে একটা ছোটো চেম্বারে নিয়ে একটা বিছানার সঙ্গে বাঁধা হয়। তাঁর শরীরে দুটো নল ঢুকানো হয় ইনজেকশনের মাধ্যমে। তাঁর শরীরে প্রথমে সোডিয়াম থিওপেনটাল ৫০০০ মিলিগ্রাম দেওয়া হত, যা এনেসথেসিয়ার কাজ করে। তারপরে পানকুরিয়াম ব্রোমাইড দেওয়া হত ফুসফুস অবশ করার জন্য। এর পরে দেওয়া হত পটাশিয়াম ক্লোরাইড, হৃৎপিণ্ড বন্ধ হওয়ার জন্য।
(৩১) পাথর নিক্ষেপ : এ পদ্ধতিতে পুরুষের ক্ষেত্রে কোমর পর্যন্ত এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে বুক পর্যন্ত মাটিতে পোঁতা হয়। কাছ থেকে মাঝারি সাইজের পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হত। পাথর যেন খুব বড়ো না হয়, যাতে হঠাৎ করেই ওই ব্যক্তি মারা না যায়। তবে নিয়ম আছে যে, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি যদি পাথর নিক্ষেপের সময় গর্ত থেকে উঠে আসতে পারে, তবে তাঁর মৃত্যুদণ্ড মকুব হয়ে যাবে।
(৩২) বিষপান : বিষ পান করিয়েও অনেক দেশে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হত। এ বিষয়ে আমরা দার্শনিক সক্রেটিসের কথা মনে করতে পারি। গ্রিসের এথেন্সে তখনকার দিনের অন্যতম রাজনীতিবিদ আনুতুস তাঁর বিরুদ্ধে মুখ্য অভিযোগ আনেন যে, তিনি রাষ্ট্রের তরুণ সম্প্রদায়ের মনে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্র এবং সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে সন্দেহ, অবিশ্বাস ও অশ্রদ্ধার ভাব সৃষ্টি করে চলেছেন। এসব অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে তিনি বিচারকদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। বিচারকদের বিচারে দোষী প্রমাণিত হলে তাঁর মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। এথেন্সের কেন্দ্রবিন্দুতে বসেছে এই আদালত। আদালতের বিচারকের সংখ্যা ৫০০। বিচারকরা আসীন কাঠের বেঞ্চিতে। বিচারকদের চারপাশ ঘিরে উৎসুক জনতার ভিড়। সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগকারী তিন এথেনীয় নাগরিকও সেখানে হাজির। তিন অভিযোগকারীকে তাঁদের অভিযোগ উত্থাপন করে বক্তব্য রাখার জন্য তিন ঘণ্টা সময় দেওয়া হয়। এরপর সক্রেটিসকে সময় দেওয়া হবে তিন ঘণ্টা, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ খণ্ডনের জন্য। বিচারকরা অভিযোগের সত্য-মিথ্যা নির্ধারণে ভোটের মাধ্যমে তাঁদের রায় জানাবেন। বিচারকদের সামনে দুটি গোলাকার কলসি। একটিতে লেখা ‘guilty’, আর অপরটিতে ‘not guilty’। বিচারকরা তাঁদের ইচ্ছেমতো যে-কোনো একটি কলসিতে তাঁদের নিজ নিজ চাকতি ফেলে সক্রেটিসের বিচারের রায় সমাধা করবেন। এভাবে ভোটভিত্তিক আদালতের রায়ে সক্রেটিসের পক্ষে ২২০ বিচারক ও বিপক্ষে ২৮০ বিচারকের ভোট পড়ে। অতএব বিচারে সক্রেটিস দোষী সাব্যস্ত হন। এরপর এল সক্রেটিসের শাস্তি নির্ধারণের পালা। অভিযোগকারীরা সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড দাবি করে। সক্রেটিসকে সুযোগ দেওয়া হয়, তাঁর বিরুদ্ধে কী ধরনের শাস্তি হতে পারে, সে ব্যাপারে পরামর্শ রাখার জন্য। অনেকে ধরে নিয়েছিলেন সক্রেটিস হয়তো বলবেন তাঁকে মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে নির্বাসনে দেওয়া হোক। তা না-করে সক্রেটিস বরং সেদিন বলেছিলেন, তিনি ভণ্ড জ্ঞানীদের মুখোশ খুলে দিচ্ছেন। সক্রেটিসের নিজের ভাষায় : “রাষ্ট্ররূপ মন্থরগতি অশ্বের জন্য আমি হচ্ছি বিধিদত্ত এক ডাঁশ পোকা।” অতএব তাঁকে পুরস্কৃত করাই উচিত। এমনি পরিস্থিতিতে তাঁর উপর চাপ আসে বাস্তবভিত্তিক কোনো শাস্তির পরামর্শ দিতে। তখন তিনি চাপের মুখে বলেন, তাঁকে মোটা দাগে জরিমানা করা যেতে পারে। বিচারকরা শেষপর্যন্ত তাঁর মৃত্যুদণ্ডই ঘোষণা করেন। নিজ হাতে বিষ পান করে তাঁকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। রায় ঘোষণার পর তাঁকে কাছাকাছি একটি কারাগারে নেওয়া হয়। এথেনীয় আইন অনুযায়ী তাঁর মৃত্যুদণ্ড সেখানেই কার্যকর করা হয়। আর সক্রেটিস নিজ হাতে হেমলক বিষপান করে তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেন। মৃত্যুর আগে তিনি বিষপাত্র হাতে নিয়ে বলেছিলেন : “I to die, you to live, but only God knows who is correct.”
