(২০) ক্যাথেরিনের চাকা : ক্যাথেরিনের চাকা বা Catherin wheel বা Breaking wheel পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদান করা। এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে একটি চাকার সঙ্গে শক্ত করে বাঁধা দেওয়া হত। এরপর চাকাটি খুব জোরে ঘুরিয়ে দেওয়া হত। এ সময় জল্লাদ ঘুরতে থাকা মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে শরীরে চাবুক বা লাঠি দিয়ে সজোরে উপযুপরি আঘাত করা হত। এরপর জল্লাদ মোটা লোহা দিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে হাতে আর পায়ে পেরেক পুঁতে দিত। পুনরায় চাবুক আর লাঠি দিয়ে আঘাত করত জল্লাদ। এরপর পেরেক পোঁতা অবস্থায় ব্যক্তিকে শহরের মাঝে জনসমক্ষে ঝুলিয়ে রাখা হত, যাতে সকলে এই নির্মমতা দেখতে পারে।
(২১) বাঁশ : এশিয়ার দেশগুলিতে একসময় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে বাঁশের ব্যবহার হত। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার এক অভিনব এবং খুবই কষ্টদায়ক পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে বাঁশের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধে রাখা হত। যেহেতু বাঁশ গাছ অনেক তাড়াতাড়ি বৃদ্ধি পায় (দৈনিক সর্বোচ্চ এক ফুটের মতো), তাই ধীরে ধীরে ছোটো বাঁশ ব্যক্তির দেহ ফুটো করে বের হয়ে যেত। এটি বেশ ধীরে হত বলে ব্যক্তিটি অমানবিক যন্ত্রণা পেত এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হত।
(২২) সুড়সুড়ি : স্প্যানিসদের সুড়সুড়ি যন্ত্র বা Spanish Tickler বা বিড়ালের থাবা বা Cat’s Paw পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড পদ্ধতির উৎপত্তি স্প্যানিসে। এঁদের দ্বারাই ব্যবহৃত হওয়ার কারণে ‘স্প্যানিসদের সুড়সুড়ি যন্ত্র’ নামেই বেশি পরিচিত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে শক্ত করে বেঁধে রাখা হত শহরের জনবহুল এলাকায়। তারপর জল্লাদ এই সুড়সুড়ি দেওয়ার যন্ত্র’ পরে যথেচ্ছভাবে ব্যক্তিটির শরীরে আঁচড় দিত। এই আঁচড় যে সে আঁচড় নয়, এক্কেবারে শরীর থেকে চামড়া আলাদা হয়ে যেত। কিন্তু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু হত না এত সহজে। দীর্ঘক্ষণ মৃত্যুযন্ত্রণা ভোগ করতে হত। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মৃত্যু হত মূলত রক্তক্ষরণের কারণে। ইনফেকশনের কারণেও মৃত্যু হত।
(২৩) জীবিত কবর : প্রেমের অপরাধে আনারকলিকে জীবিত অবস্থায় কবর দেওয়া হচ্ছে, মুঘল-ই-আজম’-এর এ দৃশ্যটি নিশ্চয় কেউ ভুলে যাননি। এমনই জীবিত কবর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতিটি মধ্যযুগের ইতিহাসে অনেক রাষ্ট্র গ্রহণ করেছিলেন। এহেন জীবিত অবস্থার কবর ঠিক আনারকলির মতো নয়। সাধারণত বিদ্রোহীদের বা একাধিক হত্যাকারী বা ধর্ষণকারীদের এইভাবে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হত। সর্বশেষ এরকম কবর দেয় জাপানিরা, যখন তাঁরা চিনে হামলা করেছিল তখন অনেক চাইনিজদের উপর এইভাবে মৃত্যদণ্ড পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।
(২৪) বেঁধে পোড়ানো : খুঁটির সঙ্গে বেঁধে পোড়ানো বা Burning at the Steak পদ্ধতিটি মৃত্যুদণ্ড হিসাবে জনপ্রিয়(!) ছিল। মৃত্যদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের একা অথবা একই সঙ্গে অনেককে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হত। ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে জিওনার্দো ব্রুনো (১৫৪৮-১৬০০) নামে এক জ্যোতির্বিজ্ঞানীকে রোমে কোপার্নিকাসের সূর্যকেন্দ্রিক মতবাদকে সমর্থন করার অপরাধে’ জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয়। ব্রুনোকে আগুনে পোড়ানোর আগে পর্যন্ত চার্চ থেকে প্রচণ্ড চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছিল যেন তিনি কোপার্নিকাসের ভুল মতবাদ পরিত্যাগ করে বাইবেলের বিশ্বাসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ টলেমির ‘পৃথিবী কেন্দ্রিক মতবাদকে সত্য বলে মেনে নেন। বৈজ্ঞানিক সত্যের প্রতি অবিচল ব্রুনো ঘৃণাভরে সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বরং বিচারকদের দিকে তাকিয়ে অবিচলভাবে ব্রুনো উচ্চারণ করেছিলেন –“Perhaps you, my judges, pronounce this sentence against me with greater fear than I recieve it.” বোঝাই যাচ্ছে, ব্রুনোর নশ্বর দেহ যখন আগুনের লালচে উত্তাপে জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছিল, “ধর্ম বেঁচে গেল” ভেবে ধর্ম-ব্যবসায়ীরা কী উল্লাসই-না প্রকাশ করেছিল সেদিন। তারপরেও ঈশ্বর এবং তাঁর সন্তানেরা সূর্যের চারদিকে পৃথিবীর ঘূর্ণন শেষপর্যন্ত কি থামাতে পেরেছিলেন?
(২৫) নির্লজ্জ ষাঁড় : নির্লজ্জ ষাঁড় বা Brazen Bull পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা আর-একটি অমানবিক পদ্ধতি। সিসিলির স্বৈরশাসক Akgragas এই পদ্ধতি প্রথম চালু করেছিলেন। পরামর্শদাতা ছিলেন তৎকালীন সময়ের ধাতু কারুকার্যকর প্রিলিয়স (Prilios)। ধাতু দ্বারা নির্মিত এই ষাঁড়কে এতটা বড়ো করে বানানো হত যেন এর পেটের মধ্যে একজন মানুষকে ঢোকানো সম্ভব হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ওই ষাঁড়ের পেটের মধ্যে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে পেটের দিকে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়া হত। এর ফলে ষাঁড়ের ভিতরে থাকা মানুষটি ধীরে ধীরে সরাসরি আগুনে না ঝলসে আগুনের গনগনে তাপে মারা যেত। ষাঁড়টিকে এমনভাবে নির্মাণ করা হত যাতে ভিতরে পুড়তে থাকা ব্যক্তিটির চিৎকার শুনে মনে হত যেন ষাঁড় চিৎকার করছে। পুড়তে থাকা ব্যক্তিটির ধোঁয়া ষাঁড়ের নাক দিয়ে বেরিয়ে আসত।
(২৬) লিং চি : লিং চি বা Ling Chi মৃত্যুদণ্ড পদ্ধতিটি চিনে চালু ছিল। এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে লোকালয়ে এনে বেঁধে ফেলত। এরপর একজন জল্লাদ বিশেষ ছুরি দিয়ে ব্যক্তির বিভিন্ন অঙ্গ তার দেহ থেকে ধীরে ধীরে আলাদা করে দিত। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি যাতে দীর্ঘক্ষণ ধরে সর্বাধিক যন্ত্রণা ভোগ করে সে ব্যাপারে নিশ্চিত করা ছিল জল্লাদের প্রধান উদ্দেশ্য। এ পদ্ধতি এখন আর কার্যকর করা হয় না। চিনেই ২০ সহস্রাব্দের শুরুতে এই পদ্ধতি নিষিদ্ধ হয়ে গেছে।
