এখন মৃত্যুদণ্ড পদ্ধতি নিয়ে নীচে যে আলোচনা করব যেগুলি বর্তমানে প্রচলিত না থাকলেও প্রাচীন যুগে ছিল।
(৬) মুণ্ডচ্ছেদ বা শিকর্তন : মুণ্ডচ্ছেদ বা শিল্পকর্তন (Guillotine) পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি মূলত চালু করা হয় মানবিক দিক বিবেচনা করে। ১৭০০ শতকে এই পদ্ধতি চালু করা হয়, কেননা তৎকালীন আমলে বিশেষজ্ঞদের মতে এই পদ্ধতিতে আসামীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলে তাঁর কষ্ট কম হয়! তাই তৎকালীন সময়ে অনেক দেশ এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে থাকে। কোনো মানুষ দোষী সাব্যস্ত হলে তাঁর মুণ্ডচ্ছেদ করাই ছিল এই গিলোটিনের কাজ। ডা. জোশেফ ইগনেস গিলোটিন ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে প্রথম এই মারণযন্ত্রের প্রবর্তন করেন। ফরাসি বিপ্লব চলাকালীন মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত দোষীকে শাস্তি দেওয়ার জন্য তিনি এই অভিনব যন্ত্রটির সুপারিশ করেন। আজ থেকে প্রায় ২৩০ বছর আগে অর্থাৎ ১৭৮৯ খ্রিস্টাব্দে ১৪ জুলাই বাস্তিল দুর্গে বন্দুকের আওয়াজের মধ্যে ফরাসি বিপ্লবের নতুন অধ্যায়ের সূচনা। তার ২ বছর পর ১৭৯১ খ্রিস্টাব্দে সে দেশের রাজা ষোড়শ লুই ছদ্মবেশে ভার্নেতে পালাতে গিয়ে ধরা পড়েন জুন মাসের ২০ তারিখে। তার ঠিক এক বছর সাত মাসের মাথায় ২১ জানুয়ারি রাজাকে ধরে গিলোটিনে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে রাজার মুণ্ড। এভাবে কত যে মানুষের মুণ্ডচ্ছেদ হয়েছে তার শেষ নেই। এজন্যই ফরাসি বিপ্লবের কাহিনি থেকে গিলোটিনকে কিছুতেই আলাদা করা যায় না। ১৭৯২ খ্রিস্টাব্দে ২৫ এপ্রিল ডি গ্রিভ শহরের উন্মুক্ত প্রান্তরে এটিকে স্থাপন করা হয় এবং সর্বপ্রথম একজন হাইওয়ে ম্যান’-এর মুণ্ডচ্ছেদ করা হয়। এরপর ওই বছরই পেরিসের ডি লা কনকর্ডে প্রায় ৪০০০ মানুষের শিরচ্ছেদ হয় একইভাবে। উল্লেখযোগ্যতার মধ্যে ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারিতে রাজা ষোড়শ লুইয়ের পর ১৬ অক্টোবর রানি মারি আঁতোয়ানে, ৩১ অক্টোবর জিরাদের, ৮ নভেম্বর মাদাম রোঁলা, ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দে ৩০ মার্চ থেকে ৫ এপ্রিলের মধ্যে জর্জ দাঁত ও তাঁর অনুগামীদের গিলোটিনে হত্যা করা হয়। চাকা কীভাবে ঘোরে! দাঁতে ও তাঁর পন্থীদের গিলোটিনে পাঠানোর মূল হোতা যে বিপ্লবী নায়ক ব্যারিস্টার মেক্সিমলিয়ন মারি ইশিদর দ্য রোবসপিয়েরকেও সেই নিমর্ম গিলোটিনে মাথা দিতে হয়। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্ধ হয়ে যায়। ফ্রান্সে গিলোটিনে শেষ মৃত্যুটি হয় ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে। ১৯৬০ থেকে ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যেই গিলোটিনে মৃত্যুর হার কমে আসে। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে ফ্রান্সে মৃত্যুদণ্ড নিষিদ্ধ হয় ও সেইসঙ্গে মুণ্ডচ্ছেদও বন্ধ হয়ে যায়। ডা. গিলোটিনও খুব অল্পের জন্য গিলোটিন যন্ত্রে মৃত্যু থেকে বেঁচে যান।
(৭) হাতির পায়ে পিষ্ট করে মৃত্যুদণ্ড : মৃত্যদণ্ড কার্যকর করার এই পদ্ধতি কিন্তু সুদুর কোনো দেশের প্রচলিত পদ্ধতি না, বরং আমাদের এই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উদ্ভাবিত এবং একসময়ের বহুল ব্যবহৃত পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে বিশাল আকৃতির হাতি তার পা দিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মাথা থেঁতলে দিত। এক্ষেত্রে হাতিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হত, যাতে সে ধীরে ধীরে পায়ের চাপ বাড়ায়, যাতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি সর্বোচ্চ শাস্তি পায় মৃত্যুর সময়। এই পদ্ধতি মূলত ব্যবহৃত হত রাজা বাদশাহদের আমলে।
(৮) শরীরের চামড়া ছাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড : মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির চামড়া ছাড়ানো (Flaying Skin) ছিল এক বীভৎস মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জীবিত অবস্থায় একটা লম্বা টেবিলের উপর বেঁধে তাঁর চামড়া ছাড়ানো হয়। এই ছাড়ানো চামড়া জনবহুল এলাকায় প্রকাশ্যে টানিয়ে রাখা হত, যাতে সবাই দেখতে পারে এবং শাসককে ভয় পায়।
(৯) স্কাফিজম : অতীতে পার্সিয়ানদের মধ্যে প্রচলিত মৃত্যদণ্ড কার্যকর করার পদ্ধতিই হল স্কাফিজম (Scaphism)। এ পদ্ধতির মাধ্যমে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ নগ্ন করে একটি ডোবার কাছে আনা হত। এরপর ডোবার সব থেকে কাছের গাছের সঙ্গে বেঁধে রাখা হত। এরপর সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে প্রচুর পরিমাণে দুধ এবং মধু খাওয়ানো হত, যতক্ষণ পর্যন্ত না তাঁর ডাইরিয়া শুরু হত। ডাইরিয়া শুরু হলে তাঁর সারা শরীরে মধু মাখিয়ে দেওয়া হত। এই মধু মেখে দেওয়ার ফলে আশেপাশের অনেক বিষাক্ত কীটপতঙ্গরা আকৃষ্ট হত এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির গায়ের চামড়া ভেদ করে বাসা বানাত। এই পদ্ধতিতে আসামীর মৃত্যু হতে সময় লাগত ২ সপ্তাহের মতো। সাজাপ্রাপ্ত ব্যক্তিটির ডাইরিয়া, গ্যাংগ্রিন এবং অনাহারে মৃত্যু হত।
(১০) তক্তার উপর : এই উপায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করত সাধারণত জলদস্যুরা, যাঁরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাহাজ আক্রমণ করে জাহাজের সব কিছু লুট করে নিত। আর যাঁরা তাঁদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলত তাঁদের এইভাবে শাস্তি দেওয়া হত। এক্ষেত্রে ব্যক্তিকে শুধুমাত্র তক্তার উপর দিয়ে হাঁটিয়ে জলে ফেলে দেওয়া হত। কিন্তু তাঁর হাত-পা কিছুই বাঁধা থাকত না বলে জলে ভেসে থাকতে পারত। কিন্তু জলে ভাসমান এইসব জাহাজের চারিপাশে সবসময় কিছু হাঙ্গর ঘুরে বেড়াত, আর জলে ফেলার সঙ্গে সঙ্গেই হাঙ্গরের বলি হত এবং মৃত্যু কার্যকর হত।
