(২) গ্যাস চেম্বার : একটি চেম্বারে ছোটো একটা এয়ার-টাইট চেয়ার রাখা হয়। যাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হবে তাঁকে এই চেয়ারে বসিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়। চেয়ারের নীচে একটা পাত্রে পটাশিয়াম সায়ানাইড ক্যাপসুল রেখে বাইরে থেকে চেম্বার বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর একটা নলের সাহায্যে বাইরে থেকেই চেয়ারের নীচে রাখা আর-একটি পাত্রে সালফিউরিক অ্যাসিড ঢেলে দেওয়া হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি তখন তাঁর শেষ কথা বলে বা ইচ্ছা প্রকাশ করে। এরপরই মেসিনের সাহায্যে সায়ানাইড ক্যাপসুল এবং অ্যাসিড একসঙ্গে মেশানো হয়। এর ফলে চেম্বার পটাশিয়াম সায়ানাইড গ্যাসে ভরে যায়। যাতে মৃত্যু ত্বরান্বিত হয় সেইজন্য মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে ঘনঘন শ্বাস নিতে বলা হয়। ঘনঘন শ্বাস নেওয়ার ফলে শরীরে তাড়াতাড়ি গ্যাস প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। তবে অনেকক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি মৃত্যুভয়ে শ্বাস আটকে রাখে বলে মৃত্যু বিলম্বিত হয়ে যায়।
(৩) ফায়ারিং স্কোয়াড : মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির চোখ এবং হাত বেঁধে একটা খুঁটির সঙ্গে বাঁধা হয়। এরপর তাঁর বুকে গোল একটা টার্গেট পেপার ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। কিছুটা দূরে পাঁচ-পাঁচজন শুটার দাঁড়িয়ে থাকে। এদের প্রত্যেককে একটা করে গুলি দেওয়া হয়। পাঁচজনের মধ্যে চারজনের কাছে আসল গুলি থাকে না, থাকে ব্ল্যাংক গুলি। কিন্ত কোন্ চারজনের কাছে ব্ল্যাংক গুলি আছে সেটা পাঁচজন শুটারের একজনও জানতে পারবে না। কারণ ওদের কেউই বুঝতে পারবে না ঠিক কার গুলিতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে। ‘ফায়ার’— হুকুম বা নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গে পাঁচজন শ্যটারই একসঙ্গে গুলি করে এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মৃত্যু হয়। তবে কোনো শ্যটার যদি গুলি না-করে তাহলে তাঁর জন্য থাকে শাস্তির ব্যবস্থা।
(৪) ফাঁসি : আইনানুগ সকল ফর্মালিটি শেষে ফাঁসির মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে যেখানে নিয়ে আসা হয় সেটাকে বলে কনডেম সেল’। সেখানে শুধু ফাঁসির আসামীদেরই রাখা হয়। বিভীষিকাময় সেই সেল অনেকটা ওয়েটিং রুমের মতো হলেও আসামীকে একাই দিন গুজরান করতে হয়। যতদিন ফাঁসি কার্যকর না হয়, ততদিন নরক-যন্ত্রণা। না মরেও মৃত্যু-যন্ত্রণা। যে কদিনের জন্য তাঁকে রাখা হয়, তাঁর সঙ্গে যথাসম্ভব ভালো ব্যবহার করা হয়।
ফাঁসির জন্য বিদেশ থেকে আনা হয় দড়ি। সাধারণত জার্মানি থেকে বিশেষ এই দড়ি আনা হয়। নিয়ম করে কয়েকবার এতে মাখানো হয় সবরি কলা আর মাখন। জল্লাদ নির্বাচন করা হয় কয়েদিদের মধ্য থেকেই অথবা পেশাদার জল্লাদ। কোনো কোনো দেশে সাজাপ্রাপ্ত কয়েদিদের দিয়ে ফাঁসি কার্যকর করালে প্রতিটি ফাঁসি কার্যকরের জন্য ওই কয়েদির ২ মাস করে সাজা কমে যায়। আসামীর সম-ওজনের বালির বস্তা দিয়ে কয়েকদিন আগে থেকেই ফাঁসি দেওয়া প্র্যাকটিস করে নিতে হয়। কনডেম সেলে আসামীর আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে দেখা করানো হয়। তবে অনেকক্ষেত্রেই কবে ফাঁসি কার্যকর হবে তা আসামী এবং আত্মীয়স্বজন কাউকেই বুঝতে দেওয়া হয় না। কিন্তু ফাঁসির দিন কয়েদি বুঝতে পারেন যে আজই তাঁর জীবনের শেষ রাত। দণ্ডপ্রাপ্তের কালো কাপড় মাথা ঢেকে দেওয়া হয় এবং গলায় দড়ি পরিয়ে দেওয়া হয়। জেল সুপার হাতে রুমাল নিয়ে ফাঁসির মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন। দাঁড়িয়ে থাকেন চিকিৎসকসহ আরও কয়েকজন। জল্লাদের চোখ তখন রুমালের দিকে। ওই মুহূর্তে এই রুমালই একজন মানুষকে এ-পার থেকে ও-পারে পাঠিয়ে দেওয়ার ভূমিকা পালন করে। রুমালের হেলনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পায়ের নিচ থেকে পাটাতন সরে যায়। গলায় আটকে যায় মোটা দড়ি। ১০ মিনিট ঝুলিয়ে রাখার পর একজন ডাক্তার এসে ঘাড়ের চামড়া কেটে মৃত্যু নিশ্চিত করেন। পড়ে থাকে নিথর দেহ। ফাঁসির দৃশ্য সাধারণত ভিডিও করা হয় না। তবে ১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান ও জাপানি যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসি ভিডিওতে ধারণ করেছিল। জার্মানির নুরেমবার্গ ট্রায়ালের সেই ভিডিওটি ইউটিউব ঘাঁটলেই দেখতে পাবেন। প্রায় ৬৫ বছর আগের ভিডিও, যেটা ২৮ মে ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে কার্যকর করা হয়েছিল ল্যান্ডসবার্গ জেলে। সংক্ষিপ্ত সময়ের ট্রাইবুন্যালের রায়ের কোনো আপিল করার সুযোগ দেওয়া হয়নি।
(৫) অন্য ফাঁসি, জলে ডুবানো এবং খণ্ডকরণ : মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে একটি কাঠের সঙ্গে বেঁধে ঘোড়া দিয়ে টানতে টানতে নিয়ে যাওয়া হত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জায়গায়, অর্থাৎ বধ্যভূমিতে। এরপরে সেই ব্যক্তিকে ঝুলিয়ে দেওয়া হত ফাঁসির দড়িতে। মৃত্যু হওয়ার আগেই সেই ব্যক্তির গলা থেকে ফাঁসির দড়ি থেকে খুলে দেওয়া হত। এ অবস্থায় তাঁকে জলে ডুবানো হত। এরপরও মৃত্যু না হলে আধমরা ব্যক্তিকে হাত-পা বেঁধে তাঁর পেট কেটে পেটের মধ্য থেকে ভুড়ি বের করে আনা হত। এসময় বিশেষভাবে খেয়াল রাখা হত যেন কোনোভাবেই তাঁর মূল রক্ত পরিবাহীতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত না হয়। ফলে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মৃত্যু হত না। এরপর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত অর্ধমৃত ব্যক্তির নাড়িভূঁড়িতে আগুন লাগিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হত। এরপর ধারালো কুড়োল দিয়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে জীবন্ত অবস্থায় কেটে চার টুকরো করা হত। সবশেষে তাঁর মাথা কেটে ফেলা হত। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মাথা কাটার আগে পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিটি বেঁচে থাকত। এখানেই শেষ নয়, এরপরে তাঁর দেহের বিভিন্ন অংশ ইংল্যান্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠিয়ে দেওয়া হত, জনগণকে দেখানোর উদ্দেশ্যে। বীভৎস এই নরহত্যা হত রাষ্ট্রের নির্দেশে, শাসনের নামে। ফাঁসি, জলে ডুবানো, খণ্ডকরণ পদ্ধতিতে একসঙ্গে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা ইতিহাসে সব থেকে অমানবিক পন্থা বলে বিবেচিত। বর্তমানে এই পদ্ধতিটি আর কার্যকর হয় না।
