২০০৭ সালে সুখদেও থোরাট রিপোর্ট প্রকাশের পর থেকে গত ১২ বছরে, দেশের অগ্রণী শিক্ষাক্ষেত্রগুলিতে আত্মহত্যা করেছেন মোট ২৩ জন দলিত ছাত্রছাত্রী। আধুনিক এই শিক্ষাক্ষেত্রগুলিতে দলিত ছাত্রছাত্রীদের এই অভিজ্ঞতার কারণ হিসাবে অনেকেই সংরক্ষণ পদ্ধতিকে দায়ী করে থাকেন। একথা ঠিক যে সংরক্ষণের ফলে আজ শিক্ষাক্ষেত্রগুলিতে ছাত্রছাত্রী ও শিক্ষকদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি সংখ্যক দলিত ও বহুজন ছাত্রছাত্রীকে দেখতে পাওয়া যায়, তবে উচ্চবর্ণরা আসলে ভয় পাচ্ছেন দলিত-বহুজন ছাত্রছাত্রীদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে সংগঠিত হওয়াকে। দলিত ও বহুজন ছাত্রছাত্রীরা নিজেদের অধিকার বুঝে নিতে সংহত হচ্ছেন। আর তাতেই শিক্ষা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর উচ্চবর্ণদের একচ্ছত্র আধিপত্য প্রশ্নের মুখে দাঁড়াচ্ছে। ঐতিহাসিক কাল জুড়ে পেয়ে আসা এই একচ্ছত্র অধিকার হারানোর ভয় হিংস্র হয়ে উঠছে তাঁদের প্রতিক্রিয়া। হিন্দুত্বকরণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ক্যাম্পাস গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে লাগাতার সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলেছেন তাঁরা। আন্দোলন গড়ে তুলেছেন ধর্মীয় ও আঞ্চলিক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নেমে আসা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে। ওসমানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে দলিত খাদ্য রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা করতে বিফ ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করে রেডিক্যাল বামপন্থী ও আম্বেদকারাইট অ্যাসোসিয়েশনের ছাত্রছাত্রীরা। এই অপরাধে পুলিসি হেনস্থার মুখে পড়তে হয় তাঁদের। এই ধরনের সংগঠনগুলোর উপর নেমে আসে রাষ্ট্রীয় খাঁড়া। তা আম্বেদকর স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনই হোক, বা দিল্লির দলিত আদিবাসী বহুজন মাইনরিটি স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অথবা দেশের বিভিন্ন আইআইটিগুলোতে গড়ে ওঠা আম্বেদকর ফুলে স্টাডি সার্কেল। ছাত্র রাজনীতিকে চরমপন্থী করে তোলা, দেশদ্রোহিতা, প্রতিষ্ঠানবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ তুলে তাঁদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চালায় রাষ্ট্র।
২০১৮ খ্রিস্টাব্দের ২০ মার্চ, দেশের শীর্ষ আদালত একটি গাইডলাইন প্রকাশ করে। তফসিলি জাতি ও তফসিলি উপজাতি (নিপীড়ন বিরোধী) আইনের আওতায় সরকারি কর্মচারি বা অন্য কোনো ব্যক্তিকে ‘বিধিবহির্ভূতভাবে ও অবিলম্বে গ্রেফতারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এই নির্দেশনামা। ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু ফ্যাসিস্ট মতাদর্শকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে এমন সবকিছুকেই বাতিল করে দিতে উদ্যত আজকের ভারত রাষ্ট্র। ইউজিসি ও মানবসম্পদ উন্নয়ন মন্ত্রক সহ রাষ্ট্রের প্রতিটি হাতিয়ারকে আজ তাঁরা এই উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করছে। একই উদ্দেশ্যে, নতুন ও পুরোনো দুই ক্ষেত্রেই ‘অপ্রয়োনীয়’ পিএইচডি গবেষণার বিষয়কে খতিয়ে দেখার নিদান দিতে চলেছে। রাষ্ট্র।
প্রান্তিক মানুষদের জন্য সাম্য ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে তৈরি সাংবিধানিক অধিকারগুলোকে খর্ব করে, আমাদের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনকে দ্রুতই ব্রাহ্মণ্যবাদী এক পরিসরের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে রাষ্ট্র। ঐতিহাসিককাল ধরে শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর উচ্চবর্ণের একচ্ছত্র শক্তি প্রতিষ্ঠার যে সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রীতি চলে আসছে তারই পরিণতি আমরা দেখতে পাই পায়েল তদভি (২০১৯), রোহিত ভেমুলা (২০১৬), বালমুকুন্দ ভারতী (২০১০), এম ভেঙ্কটেশ (২০১৩), সেন্থিল কুমার (২০০৮), রেজানি এস আনন্দদের (২০০৪) মৃত্যুতে। পায়েল তদভীর মৃত্যু তাই কোনো একক ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নয়। এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা। এই মৃত্যুর কারণ, হিন্দু সমাজ জীবনে গভীরভাবে গেঁথে থাকা বর্ণবৈষম্যমূলক মানসিকতা ও জাতিবিদ্বেষ। এই হেমা আহুজা, ভক্তি মেহর ও অঙ্কিতা খাণ্ডেলওয়াল আসলে মূলধারার হিন্দু নারীবাদের প্রতিনিধি, নিম্নবর্ণের পুরুষ ও নারীকে নিপীড়ন করেই প্রতিষ্ঠিত হয় যে নারীবাদ। স্মৃতি ইরানি, কঙ্গনা রানাউত, প্রজ্ঞা ঠাকুরের গৈরিকি নারীবাদ, যা ধর্মের নামে হত্যা করে, দমন চালায় প্রান্তিকের উপর, আমাদের রুখে দাঁড়াতে হবে সেই নারীবাদের বিরুদ্ধে। (সূত্র : বাস্তার সলিডারিটি নেটওয়ার্ক)
ভারতে প্রতি ১৫ মিনিটে দলিত নাগরিকের উপরে একটি অপরাধ সংঘটিত হয়, প্রতিদিন ৬ জন দলিত নারী ধর্ষিত হয় এবং প্রতি বছর বস্তিতে বসবাসকারী ৫৬,০০০ শিশু অপুষ্টির দরুন মারা যায়। করোনার অতিমারির মধ্যেও উত্তরপ্রদেশের হাথরাসে ধর্ষণ, হত্যা ও মাঝরাতে দলিত ধর্ষিতার শবদেহ পুড়িয়ে দেওয়া হয়। উত্তরপ্রদেশ ও নৈনিতালের উচ্চবর্ণের করোনা রোগীরা আইসোলেশন কেন্দ্রে দলিত রাঁধুনির রান্না খেতে অস্বীকার করে। লকডাউনের জন্য চেন্নাই থেকে গ্রামে ফিরে এম সুধাকর তাঁর ছয় মাসের বিবাহিত স্ত্রীর সঙ্গে দেখা স্ত্রীর বাবা তাঁকে খুন করে। কারণ এম সুধাকর ছিলেন দলিত এবং তাঁর স্ত্রী ছিলেন উচ্চবর্ণের মেয়ে। ২০২০ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে ৬ তারিখে ১৭ বছরের দলিত তরুণ বিকাশ কুমার জাটভকে কেবল উত্তরপ্রদেশের আমবোহাতে মন্দিরে ঢোকার অপরাধে ৪ জন যুবক গুলি করে হত্যা করে। ২০২০ খ্রিস্টাব্দে মধ্যপ্রদেশে উঁচু জাতের জন্য রাখা খাবার স্পর্শ করার অভিযোগে বছর পঁচিশের যুবক দেবরাজ অনুরাগীকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। পুলিশ জানায় হত্যাকারী দুই যুবকের নাম যথাক্রমে সন্তোষ পাল ও ভুরা সোনি। ২০২১ খ্রিস্টাব্দে দিল্লিতে ধর্ষণ করে খুন করা হল একটি ৯ বছরের কিশোরীকে। কিশোরীর বাড়ির পাশেই শ্মশান। সেখানে কুলার থেকে ঠান্ডা জল আনতে গিয়েছিল ৯ বছরের দলিত কিশোরী। শ্মশানেই তাঁকে ধর্ষণ ও হত্যা করে কয়েকজন দুষ্কৃতি। তারপর তড়িঘড়ি পরিবারের বিনা অনুমতিতে মৃত কিশোরীকে চিতায় তুলে দেয়। পুলিশ পুরোহিত সহ চারজনকে গ্রেফতার করেছে।
