চুনি কোটালের সত্যিকারের সমস্যা শুরু হয় যখন তিনি স্থানীয় বিদ্যাসাগর মাস্টার্স কোর্সে (এমএসসি) যোগ দেন। এখানে তিনি ধারাবাহিকভাবে তাঁর উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ অধ্যাপক ফাল্গুনী ও অন্যান্যরা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসকদের দ্বারা বৈষম্যমূলক আচরণ এবং প্রতিনিয়ত অপমানিত হতে থাকেন, যাঁরা তাঁকে প্রয়োজনীয় পাস গ্রেড দিতে অস্বীকৃতি জানায়। যদিও চুনি কোটাল তাঁর সকল ধরনের মানদণ্ড পূর্ণ করেছিলেন। অপমানিত ও হতাশ চুনি ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট মাত্র ২৭ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন। শুভব্রত সুর ‘হার মানা হার’ উপন্যাসে চুনি কোটাল আজও বেঁচে আছে। তার বাইরে সবাই ভুলে গেছে। তবে মহাশ্বেতা দেবীর ‘বিয়াধথান্দা’ (১৮৮৪) ও ‘দি বুক অব দি হান্টার’ গ্রন্থে চুনি কোটালের আত্মহত্যার বিষয়টি আলোকপাত করেছেন।
অনেক নামই উল্লেখ করা যায়। কিন্তু এত জায়গা কোথা থেকে দেব? পায়েলের কথা বলি। ২০১৯ খ্রিস্টাব্দে হাসপাতাল ক্যাম্পাসের মধ্যেই আত্মহত্যা করেন মুসলমান উপজাতি সম্প্রদায় থেকে পড়তে আসা বিওয়াইএল নায়ার হাসপাতালের রেসিডেন্ট চিকিৎসক পায়েল তদভি। নিজের হাসপাতালেই জাতিবিদ্বেষমূলক অপমান ও হেনস্থার শিকার হতে হয় ডাক্তার পায়েল তদভিকে। মাসের পর মাস হেনস্থা চালাতে থাকে তিন হিন্দু উচ্চবর্ণ সিনিয়র চিকিৎসক হেমা আহুজা, ভক্তি মেহর ও অঙ্কিতা খাণ্ডেলওয়াল। এই তিন সহকর্মীর দ্বারা একদিকে যেমন কর্মক্ষেত্রে ক্রমাগত অত্যাচারের শিকার হন পায়েল, অন্যদিকে হস্টেলেও তাঁকে নানাভাবে হেনস্থা করতে থাকে এই তিনজন। জাতিবিদ্বেষমূলক মন্তব্য, উপজাতি পরিচয় নিয়ে হেনস্থা ও হস্টেলের ভিতর রেগিং হয়ে ওঠে নিত্যদিনের ঘটনা। পাশাপাশি চলে সামাজিক মাধ্যমে নীতিপুলিশি। কর্মক্ষেত্রে রোগীদের সামনেই পায়েলকে নানাভাবে হেনস্থা করতে থাকে এই সিনিয়র চিকিৎসকরা। অপারেশন করতে বাধা দেওয়া হয় পায়েলকে, ঢোকা বন্ধ করে দেওয়া হয় অপারেশন থিয়েটারে। ডিন ও বিভাগীয় প্রধানের কাছে তাঁর নামে অভিযোগ করা হবে বলে শাসানো হতে থাকে পায়েলকে। অত্যাচারী এই ডাক্তারদের মধ্যে দুজনের সঙ্গে এক ঘরে থাকতে বাধ্য করা হয় তাঁকে, সেখানেও সমান ভাবে চলতে থাকে অত্যাচার ও হেনস্থা। হস্টেলের ঘরের মেঝেতে তোষক পেতে শুতে বাধ্য করা হয় পায়েলকে। বাথরুম পায়খানা থেকে এসে পায়েলের সেই তোষককে পাপোস হিসেবে ব্যবহার করত হেমা ও ভক্তি। হেনস্থা চলে হোয়্যাটস্অ্যাপ গ্রুপেও, তাঁর উপজাতি পরিচয় নিয়ে সেখানেও ক্রমাগত আক্রমণ চালাতে থাকে ওই তিন উচ্চবর্ণের চিকিৎসক। এরপর হস্টেল ছেড়ে হাসপাতালে রাত্রি কাটাতে বাধ্য হন পায়েল। সিনিয়র চিকিৎসকদের থেকে শুনতে হয়, “আমরা ওদের পড়াশোনা করতে দেব না। ওদের সঙ্গে এভাবেই ব্যবহার করা হবে। এরা নীচুজাতের লোক, এদের সঙ্গে এইভাবেই ব্যবহার করা উচিত।”
পায়েলের আত্মহত্যার পর তাঁর মায়ের অভিযোগের ভিত্তিতে ও বিভিন্ন দলিত ও আদিবাসী সংগঠনের চাপে বিশেষ কমিটি গঠন করতে বাধ্য হয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কমিটির রিপোর্টে উঠে আসে পায়েলের উপর দিনের পর দিন চলা অত্যাচারের কথা। অভিযুক্ত তিন ডাক্তারকে গ্রেফতার করে পুলিস। হেমা আহুজা, ভক্তি মেহর ও অঙ্কিতা খাণ্ডেলওয়ালের বিরুদ্ধে আত্মহত্যায় প্ররোচনা, জাতিবিদ্বেষ বিরোধী আইন, অ্যান্টি রেগিং অ্যাক্ট, আইটি অ্যাক্ট-এ অভিযোগ দায়ের হয়েছে।
পায়েলের মৃত্যুকে শুধুমাত্র আত্মহত্যা বা ব্যক্তির সিদ্ধান্ত হিসাবে দেখা একটি অপরাধ। পায়েলের মৃত্যুর জন্য দায়ী আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রাতিষ্ঠানিক জাতিবিদ্বেষ। ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি, হায়দ্রাবাদ কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আম্বেদকারাইট ছাত্র রোহিত ভেমুলার প্রাতিষ্ঠানিক হত্যা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রগুলিতে কীভাবে বিদ্বেষমূলক আচরণের শিকার হতে হয় সমাজের নিম্নবর্ণ থেকে পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের। কীভাবে সুচারু পদ্ধতিতে জাতির ভিত্তিতে আলাদা করে রাখা হয় তাঁদের, নেমে আসে। শাস্তির খাঁড়া, ক্রমাগত তৈরি করা হয় বিচ্ছিন্নতা, ক্রমশই আরও প্রান্তে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা চলে প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই।
২০০৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত সুখদেও থারোট কমিটি রিপোর্টে দেখা যায়, ভারতের অন্যতম অগ্রণী শিক্ষাক্ষেত্র অল ইন্ডিয়া ইনস্টিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্স (এইমস)-এ দলিত ও উপজাতি সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীরা কীভাবে ক্রমাগত উচ্চবর্ণের শিক্ষকদের বিদ্বেষের মুখে পড়েন। এই বিদ্বেষের প্রভাব পড়ে ক্লাসের শিক্ষণে, প্র্যাকটিক্যাল পরীক্ষায় ও পরীক্ষার নম্বরে। হস্টেলে ঘেটো বানিয়ে থাকতে বাধ্য হন এই দলিত ও উপজাতি সম্প্রদায়ের ছাত্রছাত্রীরা। তাঁদের ঠেলে দেওয়া হয় সেই সব হস্টেলে যেখানে শুধুমাত্র নিম্নবর্ণের ছাত্রছাত্রীদের বাস। কখনও তা হয় কর্তৃপক্ষের আদেশে, আবার কখনও উচ্চবর্ণের ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা দিনের পর দিন অত্যাচারিত হয়ে তাঁরা সেখানে চলে যেতে বাধ্য হন। ব্যক্তিগত পরিসরে অন্তরঙ্গতার অভাব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতা নিয়ে বার বার অভিযোগ জানিয়েছেন নিম্নবর্ণের ছাত্রছাত্রীরা। হস্টেলের খাবার ও রান্নাতেও আধিপত্য চলে উচ্চবর্ণের, সেই খাবারগুলোই সেখানে রান্না হয় যা উচ্চবর্ণের খাদ্য। আমাদের আরও মনে রাখা দরকার, আমাদের কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যে রেগিং চলে তা শুধুমাত্র নতুন পড়তে আসা ছাত্রছাত্রীদের হেনস্থার একটি উপায়ই নয়, এই রেগিংয়ের মধ্যে দিয়েই চিহ্নিত করে নেওয়া হয় সেই সব ছাত্রছাত্রীদের যারা সমাজের প্রান্তিক অবস্থান থেকে পড়তে এসেছেন, দাগিয়ে দেওয়া হয় নিম্নবর্ণের ও নিম্নবর্গের ছাত্রছাত্রীদের।
