ভারতীয় সংবিধানে জাতিভেদ কেন্দ্রিক অস্পৃশ্যতাকে নিষিদ্ধ করেছে, বলা হয়েছে— “Untouchability is abolished and its practice in any form is forbidden….. ‘untouchability’ shall be an offence punishable in accordance with law”. (The Constitution of India, Part III, Fundamental Rights) এই সংবিধান মোতাবেক ভারতের সমস্ত অঞ্চলের পুণ্যতীর্থ, দেবমন্দির, উচ্চ-নীচ নির্বিশেষে সকল জাতের মানুষের কাছে সমানভাবে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। অস্পৃশ্য ও দলিত শ্রেণির মানুষ ভারতের বিভিন্ন পুণ্যতীর্থে, দেবমন্দিরে প্রবেশ করতে পারবে, শহর-নগরের পুষ্করিণী বা কূপের জল পান করতে পারবে, উচ্চবর্ণ মানুষের সঙ্গে একই বিদ্যালয়ে পাশাপাশি বসে শিক্ষালাভ করতে পারবে, একই কর্মক্ষেত্রে মিলিত ভাবে কাজ করতে পারবে, একই ভোজনালয়ে পাশাপাশি বসে পানাহার করতে পারবে। স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে ভারত সরকার নিম্নবর্গের মানুষদের উচ্চবর্গে উন্নীত করার জন্য বিভিন্ন প্রকার উন্নয়নমূলক ব্যবস্থা করেছে। দলিত ও তফসিলিদের (Schedule Caste) জন্য শিক্ষা ও জীবিকার ক্ষেত্রে সংরক্ষণ ব্যবস্থার প্রচলন করে তাঁদের শিক্ষাগত ও অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি ঘটানোর প্রয়াসও রয়েছে।
কতটা বদলেছে সমাজ? কতটা বদলেছি আমরা? সময়ের সংকটে কয়েকজন যুক্তিমনষ্ক মানুষদের কিছুটা বদলালেও এখনও দলিত শ্রেণির মানুষেরা তিমিরেই পড়ে আছে। এখনও জাতির ক্ষেত্রে স্বজাতি বিবাহ শাস্ত্রসম্মত, উঁচু জাতির সঙ্গে নীচু জাতির বিবাহ গ্রহণ হয় না। আজও ব্রাহ্মণ-পুত্রসন্তান যদি কোনো শূদ্র-কন্যার বিবাহ হয় তাহলে তাঁকে শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে জাতিচ্যুত না-হলেও পরিবারচ্যুত হতে হয়। খবরের কাগজে ‘পাত্রপাত্রী চাই’ বিজ্ঞাপনে লক্ষ করুন কেমন জাতবিচারের ধূম! চূড়ান্ত বজ্জাতি। এ বজ্জাতি কি অসংবিধানিক নয়? অবশ্যই এ বজ্জাতি কি অশাস্ত্রীয় নয়? অবশ্যই। কী বলছে শাস্ত্র? একবার ফিরে দেখা যাক –“অথ ব্রাহ্মণস্য বর্ণানুক্রমেণ চতস্রো ভাৰ্য্যা ভবন্তি।১। তিস্রঃ ক্ষত্রিয়স্য।২। দ্বে বৈশ্যস্য।৩। এক শূদ্রস্য।৪।— অর্থাৎ ব্রাহ্মণ স্বর্ণ ব্যতীত অন্য তিন বর্ণের কন্যাকে বিয়ে করতে পারবে। ক্ষত্রিয়, বৈশ্যা ও শূদ্রাদের বিয়ে করতে পারবে; বৈশ্যেরও শূদ্রা বিবাহে কোনো আপত্তি নেই, শুধুমাত্র শূদ্ররাই শূদ্রা ভিন্ন অন্য কারোকেও বিয়ে করতে পারবে না। তার মানে উচ্চবর্ণের বিয়েতে কোনো বাছবিচার নেই, তাঁদের বিয়ে সকল বর্ণের সঙ্গে হতে পারে। তাহলে পাত্রপাত্রী চাই বিজ্ঞাপনের এত জাতপাতের বিচার কেন আজও জারি আছে। এটা কি হিন্দুদের শাস্ত্রের অবমাননা নয়? অপরদিকে শূদ্রের পাত্ররা শূদ্র ব্যতীত অন্য কোনো উচ্চবর্ণের পাত্রীকে বিয়ে করতে পারবে না। কারণ বিবাহ সূত্রে সেইসব উচ্চবর্ণের পাত্রীরা শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হবে। এ ব্যবস্থা আজও মেনে চলা হয় আমাদের সমাজে। সে কারণে নিম্নবর্ণ উচ্চবর্ণে উন্নীত হতে না পরলেও সমান হতে পারল না। মনু বলেছেন– যে স্বপত্নী শূদ্রাতে ব্রাহ্মণ ঔরসে জাতা কন্যা যদি অন্য ব্রাহ্মণ বিবাহ করে এবং তার কন্যাকে যদি অপর ব্রাহ্মণ বিবাহ করে এবং এমনভাবে ব্রাহ্মণ সংসর্গ যদি ধারাবাহিক সাতপুরুষ পর্যন্ত হয়, তবে ওই বর্ণ ব্রাহ্মণত্ব প্রাপ্ত হয় এবং এমনভাবে যেমন শূদ্র ব্রাহ্মণ হয়, তেমনই ব্রাহ্মণও শূদ্রত্ব প্রাপ্ত হয়। ভুলে গেলেন ব্রাহ্মণেরা, পিছিয়ে গেলেন শূদ্রেরা। কোনো এক অনৈতিক উদ্দেশ্যে ক্রমে ক্রমে শূদ্রের সঙ্গে বৈবাহিক সম্বন্ধ রহিত হয়ে গেল। বললেন –“ব্রাহ্মণী ক্ষত্রিয়া বৈশ্যা ব্রাহ্মণস্য প্রকীৰ্ত্তিতাঃ।/ক্ষত্রিয়া চৈব বৈশ্যা চ ক্ষত্রিয়স্য বিধীয়তে।/বৈশ্যৈব ভাৰ্য্যা বৈশ্যস্য শূদ্রা শূদ্রস্য কীৰ্ত্তিতাঃ।” শূদ্র সমাজশরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ল। তাঁদের আর বর্ণান্তর প্রাপ্তির সুযোগ থাকল না।
মাঝেমাঝেই দেশনেতাদের মুখে শোনা যায়, শূদ্রদের শিক্ষার মাধ্যমে ক্রমোন্নত করাই আমাদের সমাজের লক্ষ্য। সেই আদর্শ তো ছিলই, সব ভুলে গেলেন কেন? কিরকম সেই শিক্ষা?
“ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বিশস্ত্ৰয়োবর্ণা দ্বিজাতয়ঃ।
শ্রুতিস্মৃতি পুরাণোক্ত ধৰ্ম্মযোগ্যাস্তুনেতরে।
শূদ্রোবর্ণশ্চতুর্থোপি বর্ণত্বাদ্ধৰ্ম্মমহতি।
বেদমন্ত্রস্বধা-স্বাহা ষষ্কারাদিভিবিনা।”
অর্থাৎ ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয় বৈশ্য এই তিন জাতি দ্বিজ শব্দবাচ্য। এঁরাই শ্রুতি স্মৃতি ও পুরাণোক্ত ধর্মের অধিকারী। অন্য জাতি নয়। শূদ্রজাতি চতুর্থবর্ণ বলে ধর্মে অধিকারী, কিন্তু বেদমন্ত্র ও স্বাহা, স্বধা বষটকারাদি শব্দের উচ্চারণের অধিকারী নয়। শুধু ধর্ম বিষয়েই নয়, লৌকিক বিষয়েও শূদ্রকে কোনো উপদেশ দিতে মনু নিষেধ করেছেন এই বলে –“ন শূদ্রায় মতিং দদ্যাৎ।” শাস্ত্রকারগণ খুবই ন্যায় বিচারক, ধর্মবেত্তাগণ তো সেটাই বলেন! কেমন সেই ন্যায় বিচার? চার বর্ণের একই অপরাধের শাস্তি চার প্রকারের। ব্রাহ্মণগণের সত্য দ্বারা শপথ করলেই হত, ক্ষত্রিয় অশ্ব বা আয়ুধ দ্বারা এবং বৈশ্য গো, বীজ বা কাঞ্চন দ্বারা শপথ করত, কিন্তু এত অল্পে ছাড়া যায় না। তাই শূদ্রের জন্য ফতোয়া —
