নমো বা নম নামের বিসর্গীকরণ (ঃ) হয়েছে নমঃশূদ্র নাম হওয়ার পরে। সেনসাসে নমোরা চণ্ডাল থেকে নমঃশূদ্র হয়েছে ১৯১১ খ্রিস্টাব্দে। নমো নেতারা ‘নমো’ নামটি উদ্ধার করতে অনেক সংগ্রাম চালিয়েছেন। কিন্তু সর্বপ্রথম দলবদ্ধভাবে আন্দোলন হয় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে প্রথম লোকগণনাতে। বাংলায় নমোরা ‘চণ্ডাল’ নামে চিহ্নিত হয়েছেন ব্রাহ্মণ্যতন্ত্রের আগমনের পর, শুধুমাত্র ‘নিন্দাসূচক বাক্য হিসাবেই। কারণ সম্পদ সৃষ্টিকারী এই সুবিশাল জনগোষ্ঠীর তথাকথিত কোনো ধর্ম ছিল না।
তথাকথিত ‘ধর্ম’ ছিল না, তাই কোনো তথাকথিত ধর্ম মানার দায়ও এই গোষ্ঠীর ছিল না। তাই ব্রাহ্মণরাই তো বটেই, এমনকি বৌদ্ধরাও নিজ ধর্মে টানতে অসমর্থ হয়ে এই জাতিকে ‘চণ্ডাল’ নামে ভূষিত করেছিলেন! অথচ চণ্ডাল একটি আর্যভাষী জনগোষ্ঠী, যারা উত্তর-পশ্চিম ভারতের লোক এবং ব্রাহ্মণ্যসমাজ কর্তৃক নিন্দিত। বাংলায় ব্রাহ্মণ্য বা হিন্দুধর্মে ধর্মান্তরিত ব্রাহ্মণ বা অন্যান্যরা যে নমো নরগোষ্ঠীর লোক সে-কথা নৃতাত্ত্বিক পরিমিতিতেও পাওয়া গেছে। ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার বলেছেন, ভারতীয়রা যে হিন্দু তাঁরা জানতেই পারতেন না, যদি গ্রিকরা সমুদ্রপথে পূর্বদিক থেকে আক্রমণ করতেন। তখন তাঁদের সিন্ধুনদী অতিক্রম করতে হত না, আর গ্রিক উচ্চারণে ‘সিন্ধু’ নদী ‘হিন্দু’ হত না। ভারতীয়রা হিন্দু হওয়ার পরে সবচেয়ে বড়ড়া হিন্দু সেজেছেন ব্রাহ্মণরা (আমার অন্য একটি প্রবন্ধে জনৈক ব্রাহ্মণ-পাঠক সরাসরিই বলেছিলেন ব্রাহ্মণরাই সনাতন ধর্মকে টিকিয়ে রেখেছে’)— অবশ্যই নিজেদের স্বার্থে এবং গণসমর্থন পাওয়ার লক্ষ্যেই। যে লক্ষ্যে তাঁরা ১০০ ভাগ সফল, একথা বলাই বাহুল্য। ব্রাহ্মণ্যতন্ত্র সৃষ্টির জন্য বল্লালসেন যখন বাংলায় বৌদ্ধদের কচুকাটা করেন এবং বাঙালি হিন্দুদের মধ্যে জাতপাত সৃষ্টি করেন, তখনও নমোরা তাঁর কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। রাষ্ট্রশক্তির বহির্ভূত হয়েও এই জাতি ব্রাহ্মণ্যতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যায়ের বিরুদ্ধে বারবার প্রতিরোধ সংগ্রাম করেছিলেন। পুরাণ, রামায়ণ, মহাভারতে সেইসব আর্য-অনার্যদের যুদ্ধ বা সংগ্রামের কাহিনিই স্বর্ণাক্ষরে বর্ণিত আছে। বলা হয়, আমীষভোজী এই নমোগোষ্ঠী জৈবিক জীবনযাপনে যেমন বৌদ্ধ হতে পারেন না, তেমন মানবিক কারণে ব্রাহ্মণ হওয়াও সম্ভব নয়। তাহলে কীভাবে নমোদের নামের সঙ্গে শূদর যোগ করে তাঁদেরকে হিন্দু করা হল? ‘আত্মসমর্পণ না-করা এই নমোগোষ্ঠীকে ‘চণ্ডাল নামে নথিভূক্ত করে রেখেছিল ব্রাহ্মণ্যবাদীরা।
বড়োলাট ওয়াভেল সকাশে উপস্থিত হয়ে ভারতীয় হিন্দু অস্পৃশ্যদের কংগ্রেসী নেতা বাবু জগজীবন রাম আবেদন জানান– ইংরেজদের উচিত আরও দশ বছর ভারতে তাঁদের দখল কায়েম রাখা। কারণ ইংরেজদের অবর্তমানে বর্ণহিন্দুরা নীচুজাতের মানুষদের উপর নিপীড়ন আর অত্যাচার আরও বাড়িয়ে দেবে (ক্ষমতা হস্তান্তর ও দেশবিভাগ– লাডলীমোহন রায়চৌধুরী, পৃষ্ঠা ৯)। বাবু জগজীবন রামের এই বয়ান থেকে আন্দাজ করা যায়, মহাত্মা গান্ধির হরিজনদের দুর্গতি ছিল কতটা অসহনীয় ছিল। সেই কারণেই বাবু জগজীবনের কাছে কংগ্রেসী শাসনের অপেক্ষা পরাধীনতা তথা ইংরেজদের ন্যায় বিচার অধিকতর গ্রহণীয় ছিল। অস্পৃশ্য সমাজের নেতা আম্বেদকর গান্ধি প্রদত্ত ‘হরিজন’ অভিধাকে অভিহিত করেছিলেন ‘রাজনৈতিক অনুকম্পা’ বলে। আজও অস্পশ্যতা আইনত দণ্ডনীয় হওয়া সত্ত্বেও ‘গণতান্ত্রিক’ ও ‘সেকুলার’ ভারতে নির্বাচনের মরশুমে দেখা যায় রাজনৈতিক অনুকম্পা’-র মহোৎসব। স্বাধীনোত্তর ‘সেকুলার’ ভারতে মন্দির অপবিত্র করার অছিলায় ‘হরিজন’ বধ তো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। প্রকৃত ধর্মহীন বা সেকুলার মতাদর্শ আমাদের সমাজ প্রগতির শর্ত সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু রাজনীতির দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা হিন্দুত্ববাদী সংস্কৃতির বিলোপসাধন করবেন না। কারণ এই ব্যবস্থাই তাঁদের পুষ্টিসাধন করে। গান্ধিজি বললেন– “অস্পৃশ্যতা বিলুপ্ত হবেই, কারণ হিন্দুধর্ম বাঁচবে, আর যদি অস্পৃশ্যতা দূর না-হয় তাহলে হিন্দুধর্ম অবলুপ্ত হবে।” বাবা সাহেবও একই সুরে বলেছিলেন –“হিন্দুসমাজ যদি জাতব্যবস্থা মুক্ত না-হয়, তবে তাঁরা নিজেদের রক্ষা করার শক্তি অর্জন করতে পারবে না।” ডঃ আম্বেদকর আরও বলেছেন –“আজ প্রয়োজন সমস্ত নির্যাতিত ও বঞ্চিত শ্রেণির মানুষের একত্রিত হয়ে ভারতের মাটি থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদের মূল উৎপাটন করে ফেলা। অন্যথায় তাঁরা মানুষের অধিকার নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না।” একুশ শতকের ভারতে সাংবিধানিক বিধিনিষেধ সত্ত্বেও সমাজজীবনে আজও কিন্তু অস্পৃশ্যতার ঘৃণা খর্ব করা যায়নি। হিন্দুধর্মের অচলায়তন পূর্ববৎ স্থানুই রয়ে গেছে।
১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে সংবিধানে বিবৃত ১৭ নম্বর ধারা বলে সারা ভারতে অস্পৃশ্যতার বিলোপসাধন করা হয়। কিন্তু হিন্দুত্বের জগদ্দল পাথরে কোনো আঁচড় পড়ল না তাতে। ১৯৯২ খ্রিস্টাব্দের ১৬ আগস্ট, চুনি কোটালকে মনে পড়ছে? পশ্চিম মেদিনীপুরের দলিত আদিবাসী লোধা শবর সমাজের মেয়ে চুনি। তিনিই শবরদের প্রথম গ্রাজুয়েট। নিজ সমাজকে অশিক্ষার অন্ধকার থেকে টেনে বের করে আনার ব্রত নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা অর্জনের জন্য ভর্তি হয়েছিলেন মেদিনীপুরের বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু তার স্বপ্ন পূরণ হতে দেয়নি জাতপাতের প্রবর্তক সমাজপতিরা। ইউনিভার্সিটিতে তাঁকে এই সমাজপতিদের কঠিন বর্ণবৈষম্যের শিকার হতে হয়। একজন শিক্ষিত সমাজ সচেতনার প্রতি শুধু আদিবাসী হওয়ার কারণে দেশের সমাজপতিদের এই বৈষম্যমূলক আচরণ, অসহযোগিতা তিনি মেনে নিতে পারেননি। ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজব্যবস্থার প্রতি ধিক্কারে, ক্ষোধে, দুঃখে গলায় ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করেন। স্বাধীনতা দিবসের পরের দিনে চুনি কোটাল জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেল এদেশের দলিত আদিবাসী মূলনিবাসীদের বর্ণবৈষম্যের নিপীড়ন থেকে আজও মুক্তি দেয়নি ব্রাহ্মণ্যবাদী সমাজ। ব্রাহ্মণ্যবাদের বলি হলেন অন্ত্যজ চুনি কোটাল। যাঁদের জন্য যাঁদের প্ররোচনায় চুনি কোটাল আত্মহত্যা করলেন তাঁদের কোনো শাস্তি হয়েছে বলে আমি শুনিনি।
