গো-বলয়ে নিম্নজাতিদের ‘দলিত’ বলা হয়ে থাকে। প্রকৃতভাবে বিচার করলে দেখা যাবে সাংবিধানিকভাবে যাদেরকে বাবাসাহেব নাম দিয়েছেন তফসিলি জাতি বা অনুসূচিত জাতি, তাঁদেরকেই গো-বলয়ে দলিত বলা হয়। এখন প্রশ্ন কেন তাঁদের দলিত বলা হয়? তাঁদের তো সাংবিধানিক নাম আছে, তবুও তাঁদের প্রতি এই ‘দলিত’ শব্দের প্রয়োগ কেন? বাবাসাহেবের কোনো লেখা বা ভাষণে আমরা কি কোথাও দলিত’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন? না, পাইনি। ভারতের সংবিধান রচিত হওয়ার পূর্বে যাঁদের অস্পৃশ্য (untouchable) বলে গণ্য করা হত পতিত বলে মনে করা হত, তাঁদের সাংবিধানিকভাবে দু-ভাগে ভাগ করা করা হয়েছে– (১) তফসিলি জনজাতি ও (২) তফসিলি উপজাতি। কারা কোন্ জাতির মধ্যে পড়ে তার বিস্তারিত তালিকা তৈরি করা আছে। তবে অনেক পরে আরও একটা তালিকা তৈরি করা হয়েছে, তার নাম দেওয়া হয়েছে ওবিসি (other Backward class/OBC)। বাবাসাহেব এঁদের সবাইকেই অস্পৃশ্য বলে চিহ্নিত করেছেন, দলিত বলেননি। তবে গো-বলয়ে এই শ্রেণির জনগোষ্ঠীকে দলিত বললেও বাংলায় কিন্তু নমঃশূদ্র বলা হয়।
তাহলে আমরা দেখে নেব ‘দলিত’ শব্দের উৎপত্তি কোথা থেকে? ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কৌশল হল তাঁরা কখনো সামনে থাকবে না। বরং হাতে থাকবে রিমোর্ট। যা ঘটবে, তা আড়াল থেকে পরিচালিত করা হবে। তাঁরা আমাদের আপন ভাই-জাতি-গোষ্ঠীকে একে অপরের বিরুদ্ধে লড়িয়ে দেবে। আর এই লড়াইয়ে যে পক্ষেরই জয় হোক না-কেন, সে জয় তাঁর নয়। সেই জয় হবে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের। তেমনিভাবে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা কৌশল করে বাবাসাহেবের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিপক্ষ তৈরি করার জন্য মাধ্যমিক লেভেল থেকে মেধাবী জগজীবন রামকে সমস্তরকম সাহায্য-সহযোগিতা দিয়ে লালনপালন করে সুশিক্ষিত করে গড়ে তোলে। আর ধীরে ধীরে জগজীবন রামকে বাবাসাহেবের প্রতিপক্ষ হিসাবে খাড়া করে। কংগ্রেস এই জগজীবন রামের মাধ্যমে দলিত বা দলিত নেতা শব্দের বিস্তার ঘটাতে শুরু করে। জগজীবন রাম যে সংগঠন তৈরি করেছিলেন, তার নাম ‘দলিত বর্গ সংঘ’। আর বাবাসাহেব তাঁর সংগঠনের নাম দিয়েছিলেন Scheduled Caste Federation। বাবাসাহেব মহাপরিনির্বাণের পূর্বে যে RPI (Republican Party of India)-র নির্মাণের পরিকল্পনা করেছিলেন, পরবর্তীতে কংগ্রেস সেই আরপিআই-এর মাধ্যমে দলিত’ শব্দের যথেচ্ছ ব্যবহার শুরু করে।
‘দলিত’ শব্দটি কী খুব গর্বের? বহুজন বা বা মূলনিবাসী বলেও অনেকে চিহ্নিত করেন। মূলনিবাসী শব্দেও অনেকের এলার্জি আছে। সংগঠনের নামে ‘বহুজন’ লেখা থাকবে, আবার ‘দলিত’ ‘দলিত’ বলে গলা ফাটাব –সেটা কি ভাবনা ও কর্মের মধ্যে বিশাল অন্তর সৃষ্টি করছে না? কিন্তু আমরা নিশ্চয় SC, ST, OBC ও converted minority-দের মিলন চাই বহজনবাদী ভাবনায়। আর দলিত বলতে যেখানে শুধু সিডিউল কাস্টদেরই বোঝানো হয়, তাহলে সাংবিধানিক শব্দ তফসিলি জাতি বা অনুসূচিত জাতি শব্দগুলোকে ব্যবহার করব না? ব্যবহার হয় না তা নয়, তবে সেগুলি সরকারি কাগজপত্রে।
ভারতে প্রথম জনগণনা হয় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে। সেখানে নমঃশূদ্রদের কোনো উল্লেখ ছিল না। তখন তাদের বলা হত ‘চণ্ডাল’ বা ‘চোঙ’। অবশ্য ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের জনগণনায় অবমাননাকর ‘চণ্ডাল’ নামের অবলুপ্তি ঘটে। জনগণনায় ‘চণ্ডাল’ নামের অপসারণ ঘটেছে ঠিকই, কিন্তু অস্পৃশ্যতা আজও ঘোচেনি। চণ্ডাল একটি বল-বীর্য সমন্বিত অর্থ দ্যোতক শব্দ। চণ্ডের সঙ্গে জাতিসূচক ‘আল’ প্রত্যয় যুক্ত হলে চণ্ডাল হয়। এমনিভাবে লাঙ্গল, জোঙ্গাল, জঙ্গল, ডাঙ্গাল, বহাল, খেড়ওয়াল, সাঁওতাল, বঙ্গাল প্রভৃতি আদি অস্ট্রাল শব্দগুলির ব্যুৎপত্তিগত বিশ্লেষণ করলেই ‘চণ্ডাল’ শব্দের গুণগত এবং অর্থগত অভিব্যক্তিটি যথার্থ প্রতিভাত হয়ে উঠবে। ঋকের অনেকগুলি শ্লোকের রচয়িতা বিশ্বামিত্র ছিলেন চণ্ডাল। গুহক চণ্ডাল, রাজা হরিশ্চন্দ্রের কাহিনি অনন্যতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। জাতক কাহিনিতে বোধিসত্ত্বকে সতোর প্রতীক হিসেবে ‘চণ্ডাল’ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে বহুবার। কার্যসিদ্ধির জন্য সুদাস, মনু, অগ্নী, বরুণ। প্রভৃতি দাস বা অসুর নেতাদেরও যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হত বৈদিক সাহিত্যে। অর্থাৎ রক্ষস (পরবর্তীকালে রাক্ষস বলা হয়েছে), অসুর, নাগ, চণ্ডাল শব্দগুলি কোনোভাবেই ঋণাত্মক নয়— বরং গুণবাচক এবং ঋনাত্মক। অন্যদিকে ‘নমঃশূদ্র’ শব্দটি একেবারেই অর্বাচীন ব্রিটিশ আমলের আরোপিত হীনাত্মক শব্দ। শূদ্র’ শব্দের ‘নমঃ’ জুড়ে দিলেই নমস্য হয়? হয়েছে কি?
১৯১১ খ্রিস্টাব্দে সেন্সাসে বাঙলার জাতিগুলির মধ্যে নাম পরিবর্তনের একটা হিড়িক তৈরি করা হয়েছিল। তথাকথিত ছোটজাতগুলিকে হিন্দুভুক্ত করার জন্য বাংলার তৎকালীন দিকগজ পণ্ডিতদের উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো। ‘জাতির উন্নয়ন’ নামক গালভরা নামকরণের আড়ালে তাঁরা বিজ্ঞাপন জারি করেছিলেন। প্রায় চল্লিশজন নামকরা মহাপণ্ডিত এই বিজ্ঞাপনে সই করে লিখেছিলেন –“The caste called Namasudra is Brahmin by origin beging descended from the great Brahmin, Kashypa and not ‘chandal’।” শুধু চণ্ডাল নয়, এই হিড়িকে সামিল হয়েছিল বাংলা, বিহার ও আসামের তথাকথিত ছোটোজাতেরা। আবেদনপত্রের ওজন ছিল দেড় মন। চণ্ডালেরা চেয়েছিল নমঃ ব্রাহ্মণ নাম, কোচরা চেয়েছিল ক্ষত্রিয়, বৈদ্যরা চেয়েছিল ব্রাহ্মণ, কাপালিরা চেয়েছিল বৈশ্যকাপালি, বাগদিরা চেয়েছিল ব্যগ্রক্ষত্রিয়, হাঁড়িরা চেয়েছিল ক্ষত্রিয়, সুবর্ণ বণিকেরা চেয়েছিল বৈশ্য আর পোদরা চেয়েছিল পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়। বিহারের ভূমিহারেরা হল ব্রাহ্মণ। কায়স্থরা প্রথমে শূদ্র পরে ক্ষত্রিয়। দুসাদেরা দাবি করেছিল ক্ষত্রিয়ত্বের। এর আসল কারণ ছিল আইন সভায় সংখ্যা অনুপাতে প্রতিনিধিত্ব করা। বিংশ শতকের শেষ দশকে আগা খাঁ ভাইয়েরা যখন সঠিকভাবে লোক গণনার জন্য সরকারকে চাপ দিচ্ছিলেন এবং বারবার প্রমাণ দাখিল করছিলেন যে, হাড়ি, ডোম, চণ্ডাল, সাঁওতালরা কেউই হিন্দু নয়। যাই হোক ‘জাতির উন্নয়ন’ নামে তৎকালীন ছোটোজাতগুলির মধ্যে হিন্দুকরণের হিড়িক পড়ে যায়। ব্রাহ্মণের আইনসভায় যাওয়ার প্রতিনিধি সংখ্যা বাড়ে। কিন্তু জাতিগুলি সিডিউল্ড তালিকা ভুক্ত হয়ে ব্রাহ্মণের স্থায়ী দাসে পরিণত হয়ে যায়। ১৯১১ খ্রিস্টাব্দের সেনসাসে স্বাধীন বোধি চিত্তসম্পন্ন একটি প্ৰাগ বৈদিক জাতি শূদ্ৰত্বে উন্নীত হয়।
