বাবা সাহেবের প্রথম স্ত্রী রামাবাই দীর্ঘ অসুস্থতার পরে মৃত্যুবরণ করেন। অসুস্থ অবস্থায় তাঁর স্ত্রী রামাবাইয়ের পান্দরপুর তীর্থে যাওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। কিন্তু আম্বেদকর তাঁকে যেতে দিতে অস্বীকৃতি জানান এই বলে যে, তিনি তাঁকে বরং একটি নতুন পান্দরপুর বানিয়ে দিবেন হিন্দু পান্দরপুরের পরিবর্তে– যেটা কিনা তাঁদের অস্পৃশ্য বলে গণ্য করে। ১৩ অক্টোবর নাসিকের কাছে ঈওলার বৈঠকে বক্তব্যে আম্বেদকর তাঁর ভিন্ন ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার অভিপ্রায় ঘোষণা করেন এবং তাঁর অনুগতদেরও হিন্দুধর্ম ত্যাগে প্রণোদিত করেন। নিউইয়র্কে লিখিত গবেষণালব্ধ উপাত্তের ভিত্তিতে একই বছর তিনি তাঁর বই ‘The Annihilation of Cast’ প্রকাশ করেন। ব্যাপক জনপ্রিয় সাফল্যে অর্জনের পর, আম্বেদকর গোঁড়াবাদী ধর্মীয় নেতাদের এবং নিম্ন সাধারণের জন্য অস্পৃশ্য, বর্ণপ্রথার তীব্র সমালোচনা করেন। কংগ্রেস ও গান্ধি অস্পৃশ্যদের প্রতি যা করেছিল, আম্বেদকর কপটতার সহিত তীব্রভাবে গান্ধী ও কংগ্রেসকে আক্রমণ করেন। তাঁর কাজের মধ্যে ‘who were Shudras?’ প্রবন্ধে বর্ণনা করতে চেষ্টা করেন। শূদ্র বর্ণ গঠিত হয় অর্থাৎ পুরোহিত তন্ত্রের হিন্দু বর্ণ প্রথার (Hierarchy of Hindu Caste System) নিম্নবর্ণ গঠনের উপর আলোকপাত করেন। তিনি এও উল্লেখ করেন শূদ্র কীভাবে অস্পৃশ্য থেকে আলাদা। তিনি সারা ভারতের সিডিউল কাস্টেস ফেডারেশনে তাঁর রাজনৈতিক দল বদলে তদারকি করেন, যদিও তা ১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে ভারতের সংবিধান পরিষদের নির্বাচনে ভালো করেনি। পরিশিষ্ট লিখতে গিয়ে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে আম্বেদকর হিন্দুবাদকে কর্কশ ভাষায় সমালোচনা করেন তাঁর “The untouchable : a thesis on the origins of untouchability’-60 901– “The Hindu Civilisation…. is a diabolical contrivance to suppress and enslave humanity. Its proper name would be infamy. What else can be said of a civilisation which has produced a mass of people…. who are treated as an entity beyond human intercourse and whose mere touch is enough to cause pollution?” অর্থাৎ “হিন্দু সভ্যতা… হচ্ছে মানবতাকে দমন এবং পরাভূত করতে একটি পৈশাচিক কৌশল। এর প্রকৃত নাম হবে সামাজিক কুখ্যাতি। কাকে সভ্যতা বলে ডাকা যায়, যার একগাদা মানুষ…., যাদের সত্ত্বা মানব সম্পর্কের নীচে গণ্য হয় ও শুধু যাদের ছোঁয়া দূষণের জন্য যথেষ্ট?”
দলিত বৌদ্ধ আন্দোলন বা নববৌদ্ধ আন্দোলন হল বিশ শতাব্দীতে সিংহলী বৌদ্ধ ভিক্ষুগণের সহায়তায় ভারতের নিম্নজাতিদের নিয়ে গড়ে ওঠা একটি বৌদ্ধ নবজাগরণ। ভারতের নিম্নজাতি আন্দোলনের পুরোধা ভীমরাও আম্বেদকর বর্ণাশ্রম ভিত্তিক ব্রাহ্মণ হিন্দুসমাজের নিন্দাপূর্বক সমস্ত নিম্নজাতি, অর্থাৎ শূদ্রাদি নিম্নবর্ণীয় ব্যক্তিদেরকে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হতে আহ্বান জানান এবং এর ফলে এই আন্দোলন বিশেষ তাৎপর্য লাভ করে।
১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে ইয়েবেলা সম্মেলনে বাবাসাহেব ভীমরাও আম্বেদকর ঘোষণা করেন যে, তিনি কিছুতেই একজন হিন্দু ধর্মাবলম্বী হিসাবে মৃত্যুবরণ করবেন না। কারণ হিন্দুধর্ম বর্ণভিত্তিক সমাজব্যবস্থার মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে বিভেদ ও বৈষম্য সৃষ্টি করেছে। এর প্রেক্ষিতে বিভিন্ন ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ আম্বেদকরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং প্রত্যেকেই তাঁদের ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার আহ্বান জানান। এরপর বিভিন্ন নিম্নজাতিদের ধর্মান্তরিত হওয়ার ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দিকগুলি দিয়ে আলোচনা করেন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ২২ মে লখনউতে একটি ‘সর্বধর্ম সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। জগজীবন রাম সহ বহু বিশিষ্ট দলিত নেতৃবর্গ উক্ত সম্মেলনে যোগদান করেন। যদিও বাবাসাহেব আম্বেদকর এই সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে এই সম্মেলনে ইসলাম, খ্রিস্টধর্ম ও বৌদ্ধধর্ম সহ বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধিরা তাঁদের ধর্মের গুণাবলি দলিত নেতাদের সামনে ব্যাখ্যা করেন। ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দের ১০ জুন ভিক্ষু লোকনাথ বাবাসাহেব আম্বেদকরের দাদরের বাসভবনে গিয়ে সাক্ষাৎ করেন এবং বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করার জন্য তাঁকে অনুরোধ করেন। পরে গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বৌদ্ধভিক্ষু লোকনাথ ঘোষণা করেন –“আম্বেদকর বৌদ্ধধর্মের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন এবং সমগ্র দলিত সম্প্রদায়কে বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।” ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে লোকনাথ তাঁর সিংহলে অবস্থিত ছাপাখানা থেকে ভারতের নিপীড়িত এবং দলিত সম্প্রদায়ের উদ্দেশ্যে একটি প্রচারপত্র প্রকাশ করেন, যাতে লেখা হয় –বৌদ্ধধর্ম আপনাদের মুক্তি এনে দেবে।
এত কিছু করেও কি বাবা সাহেব সমাজকে বদলাতে পেরেছে? না, পারেনি। সমাজ যেখানে ছিল সেখানেই আছে। কারণ বাবা সাহেবের বার্তা দেশের সর্বত্র পৌঁছায়নি। কারণ অনুসরণকারীদের সদিচ্ছার অভাব। জাতপাতকে সামনে রেখে ভারতীয় রাজনীতিকদের নোংরা রাজনীতি আজও সমান বহমান।
জাতপাতের বিভাজন সামাজিকভাবে এমন নির্যাতনের রূপ নিয়েছিল যে, সমাজে নিম্নবর্গের মানুষদের ঠেকাটাই দায় হয়ে উঠেছিল। ভারতবর্ষে এই বিভাজনের মধ্য দিয়ে বিস্তৃতি ঘটে বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্মের। কিন্তু জাতপাতের সংকট ভারত-বাংলাদেশ থেকে আজও যায়নি। এখনও জাতপাতের তাম্রলিপিতে দলিত সম্প্রদায়েরা রয়ে গেছে। মহাত্মা গান্ধি দলিতদের মেথর, সুইপার না বলে ‘হরিজন’ বলার বাণী দিয়ে গেছেন। কিন্তু তাঁদের সমাজ ও সামাজিকতার মূল সমাজের সঙ্গে যুক্ত করেনি। অর্থাৎ এক একজন শাসক জাতি বিভাজন করলেও তাঁকে টিকিয়ে রেখেছেন ব্রাহ্মণসমাজ। মহাত্মা গান্ধির হরিজন’ তার একটি প্রকাশ মাত্র।
