ব্রাহ্মণ্যযুগের পর পুনরায় বৈদেশিক আক্রমণ হল উপমহাদেশে প্রবেশ করে বর্বর শক জাতি। এরা ইরানীয় জাতি হলেও ভারত উপমহাদেশে প্রবেশ করে ভারতীয় সভ্যতা ও ভারতীয় ধর্ম গ্রহণ করে। এরপর মধ্য এশিয়া থেকে কুষাণরা ভারতে প্রবেশ করে শকদের স্থান দখল করে নেয়। তবে কনিষ্করা ব্রাহ্মণ্য ধর্ম (এ সময় হিন্দু নামে ধর্ম ছিল না। সেইসময়কার কোনো গ্রন্থে এই ধর্মের কোনো উল্লেখ পাওয়া যায় না।) প্রত্যখ্যান করে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে। এ সময় ধর্মাচরণে ও সমাজে ব্যাপক ওলোটপালোট লক্ষ করা যায়। এই সময়েই শৈবধর্ম, মহাযান, সূর্যপুজো ও কৃষ্ণের উপাসক সম্প্রদায়ের উত্থান হয়।
বিদেশি তথা বৌদ্ধধর্মাবলম্বী বলে ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দ্বারা কুষাণরা চিরকাল বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। কুষাণ ক্ষত্রপরা ভারতীয় নাম ও ধর্ম গ্রহণ করলেও গুপ্তসম্রাটদের দাপটে সমূলে উৎপাটিত হয়। কুষাণরা ব্রাহ্মণদের অবিশ্বাস করতেন। সেইজন্যেই কুষাণ রাজারা শূদ্ৰজাতিদের মধ্য থেকে নিজেদের কর্মচারী নিয়োগ করতেন। এ সময়েই বৌদ্ধপণ্ডিত অশ্বঘোষ বলেছেন– “ব্রাহ্মণদের আর শ্রেষ্ঠত্ব দাবি করার কোনো কারণ নেই। কারণ শূদ্ররা এখন ব্রাহ্মণদের সমান পণ্ডিত হয়েছে। এক্ষণে ব্রাহ্মণ ও শূদ্র সমান” (বজ্ৰচ্ছেদিকা)। বস্তুত বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মের প্রচারের সময় থেকেই ভারতের ইতিহাসে ‘পতিত’ শ্রেণির পুনরুত্থান হয়েছে বলে অনুমান করা হয়। ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধী ধর্মের সঙ্গে ব্রাহ্মণশ্রেণির এত বিরোধ ও সংঘর্ষ ছিল যে, সমাজের নিম্নস্তরের শ্রেণি তৎসহ পতিত শ্রেণিরা অন্য নতুন ধর্ম গ্রহণ করে উচ্চবর্ণের উৎপীড়ন ও শোষণনীতির কবল থেকে উদ্ধার পেতে চাইছিলেন। প্রথম দিকে বৌদ্ধ ও জৈনধর্মে এবং ইসলাম ধর্মে ধর্ম গ্রহণ করে মুক্তির পথ খুঁজে নেয়। অসংখ্য নিম্নবর্গীয় হিন্দুও খ্রিস্টধর্মে চলে আসেন।
কুষাণযুগের পর শুরু হয় গুপ্তযুগ। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের কাছে এই যুগটা প্রাচীনকালের হিন্দু-সভ্যতার চরমাবস্থা। এই সভ্যতার ইতিহাস পাঠ করলেই জানা যায়, ব্রাহ্মণ্যবাদীদের প্রাধান্যকালে পতিতদের অবস্থা কেমন ছিল। বৌদ্ধ পরিব্রাজকরা এই সময়েই ভারতে এসেছিলেন। তাঁদের রচিত গ্রন্থ থেকে জানা যায় শূদ্র, চণ্ডাল তথা পতিতদের দুরবস্থার ইতিহাস। জানা যায়, নিম্নজাতির মানুষরা এই সময়েই জাতিচ্যুত বলে বিবেচিত হত এবং তাঁদের নগরের বাইরে বসবাস করতে হত। অনেকের মতে, গুপ্ত সাম্রাজ্যেই বর্তমানের ব্রাহ্মণ্যবাদীয় হিন্দুধর্ম ও হিন্দুসমাজ বিবর্তিত শুরু করে। এই সময় থেকেই পৌরাণিক ধর্ম আরও আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে এবং পুরাণসমূহ ও মহাকাব্যগুলি বর্তমান কলেবর প্রাপ্ত হয়েছে। সংকলনের কাজও শেষ হয়। এরপর ভারতে জাতীয়বাদীয় যুগ আরম্ভ হয় এই একজাতীয়তা ব্রাহ্মণ্যবাদের প্রভাবাধীন হয়। গুপ্ত শাসনকালেই ব্রাহ্মণরা নিজেদের ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করে ‘ভূ-দেবতা’ রূপে জাহির করতে থাকে। এই যুগে স্মৃতিকারদের মধ্যে নারদ ও বৃহস্পতি ছিলেন প্রধান। এই সময়েই নারদ ‘বিষ্ণুসংহিতা’ গ্রন্থে ব্রাহ্মণদের অবধ্য ও শারীরিক শাস্তিভোগের অতীত বলেছেন। গুপ্তযুগেই পুরোহিত শ্রেণি ভগবানের প্রতিনিধি হয়ে গেলেন। সেই কারণেই তাঁদের সাত খুন মাফ। সেইসঙ্গে রাজারাও যে ভগবানের প্রতিনিধি ও দৈবশক্তিসম্পন্ন, সেটাও প্রচার হতে থাকল। সেটা নথি হিসাবে মনুসংহিতার সপ্তম অধ্যায়ে সংযোজিত হয়। বিষ্ণুসংহিতাতে বলা হয়েছে, “নিম্নশ্রেণির মানুষ উচ্চশ্রেণির মানুষের আসনে বসলে সেই নিম্নশ্রেণির নিতম্বে আগুনের ছাপ দিয়ে নির্বাসিত করে দেবে।” শূদ্রদের উদ্দেশ্যে আরও বলা হয়েছে –“সে যদি থুতু ফেলে তাঁর ঠোঁট কেটে দেবে।” বলা হয়েছে– “শূদ্র জাতিচ্যুত, তাই কোনো জাতিচ্যুত ব্যক্তি সাক্ষীরূপে গৃহীত হবে না।” শূদ্রদের সঙ্গে দ্বিজদের বিবাহ নিষিদ্ধ করে বলা হয়েছে– “দ্বিজেরা যদি নিম্নশ্রেণির স্ত্রীলোককে বিবাহ করে তাহলে তাঁরা তাঁদের পুত্রদের ও বংশকে শূদ্রের স্তরে নামিয়ে দেয়। আর এসব ধর্মোপসনার জন্য রক্তের পবিত্রতা রক্ষার তাগিদেই এমন কঠোর ব্যবস্থা। এই অজুহাতেই নীচজাতির সঙ্গে বিবাহ আহারাদি বন্ধ করা হয়। এ বিষয়ে ঐতিহাসিক ডা. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত স্পষ্ট করে বলেছেন –“প্রকৃতপক্ষে ইহা কিন্তু নিম্নশ্রেণি হইতে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপালন করিবার জন্য আলাদা হইবার ফন্দি মাত্র। এই যুগে রাজা ও পুরোহিত উভয়েই ভগবানের সনদপ্রাপ্ত লোক হয়। এই সময়েই গণ-সাধারণকে শোষণ ও লুণ্ঠনের জন্য ধর্ম ও রাষ্ট্র এক হয়।”
কিন্তু খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতকে গুপ্ত সাম্রাজ্যেও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে হুন আক্রমণে। হুনরা ছিল মধ্য এশিয়া থেকে আসা এক নিষ্ঠুর ও বর্বর জাতি। হুনদের বাধা দিতে গিয়ে গুপ্তরাজগণ হীনবল হয়ে পড়ে। এখন প্রশ্ন হল– এইসব শক, কুষাণ, হুন, পারদ, গুর্জরদের মতো বিদেশি বর্বর জাতিগুলো ভারতে প্রবেশ করেছিল এবং তাঁরা উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রাজত্ব করেছিল, তাহলে এঁরা গেল কোথায়? তাঁরা সমূলে নির্বংশ হয়ে গেছে এমন কোনো তথ্য তো পাওয়া যায় না। অতএব অনুমান করে নিতেই পারি, এঁরা কোনো না-কোনো ভারতীয় ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করে স্বকীয়তা খুঁইয়েছে। গ্রিকদের অনেকেই ভারতীয় ধর্ম গ্রহণ করেছিল। এঁদের সকলেরই সত্তা ভারতীয় সমাজে বিলীন হয়ে গেছে। তাঁরা কেউ বৌদ্ধ, কেউ জৈন, কেউবা ব্রাহ্মণ্যবাদীয় হয়ে তথাকথিত হিন্দুধর্মে মিশে যায়। ব্যতিক্রম কেবল বিদেশি আক্রমণকারী মুসলিমরা। মুসলিম আক্রমণকারীরা ভারতে প্রবেশ করেছে, রাজত্ব করেছে দীর্ঘ ৮০০ বছর। কিন্তু তাঁরা কেউই নিজের ধর্মীয় স্বকীয়তা ত্যাগ করে ভারতীয় কোনো ধর্মের ধারেকাছে ঘেঁষেনি। উপরন্তু তথাকথিত হিন্দুধর্মে দারুণভাবে প্রভাব ফেলেছে ইসলাম ধর্ম প্রচুর অমুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ ইসলাম ধর্মে আকৃষ্ট হয়ে পড়তে থাকল নানা কারণে। ইসলামের এই আগ্রাসন থেকে হিন্দু-বৌদ্ধ-জৈন-শিখ সকল ভারতীয় ধর্মই ব্যর্থ হল। ইসলাম শাসনকালে সবচেয়ে বেশি ধর্মান্তরিত হয়েছিল তথাকথিত নিম্নবর্গীয়রা। কিন্তু একজন মুসলিমও হিন্দু বা বৌদ্ধ বা জৈন ধর্মে রূপান্তরিত হয়েছে, এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
