সপ্তম-অষ্টম শতাব্দী থেকেই ভারতীয় হিন্দু-বৌদ্ধ শাসকরা ক্ষমতাচ্যুত হতে শুরু করে। সেই মুসলিম শাসক দ্বারা ক্ষমতাচ্যুত হিন্দু-বৌদ্ধ রাজাদের বিস্তারিত ইতিহাস তেমন পাওয়া যায় না। সেই পতনের ইতিহাস কেউ বোধহয় লেখার প্রয়োজন বোধ করেনি। তবে মুসলিম শাসনে অমুসলিম শাসকরা ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পড়লেও ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ ভেদ-বিভাজন কঠোর থেকে কঠোরতর করে চলছিল। সপ্তম থেকে নবম শতাব্দীতে ব্রাহ্মণ্যবাদীয় মনোবৃত্তি পর্যবেক্ষণ করে সেই সমাজের অবস্থা বোঝা যায়। এ সময়েই রচিত হয়েছিল বেশকিছু কঠোর অনুশাসনযুক্ত গ্রন্থ। তার মধ্যে সৎত্রিমিসাংমাতা’ গ্রন্থে বলা হল –“বৌদ্ধ, পাশুপত্য, জৈন, নাস্তিক কপিলে শিষ্যদের গাত্র স্পর্শ করলে স্নান করতে হয়। পাঠক লক্ষ করুন, মুসলিমরা কিন্তু এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে অচ্ছুৎ হয়নি। অচ্ছুৎ সেদিন থেকেই হল যেদিন থেকে নিম্নবর্গীয়রা মুসলিম হতে শুরু করে দিল। নতুন কিছু নয় এটা। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ঠিক যেভাবে হিন্দু নিম্নবর্গীয়দের ঘৃণ্য ও অচ্ছুৎ ভাবত, ঠিক সেই সূত্রেই মুসলিম হয়ে যাওয়া নিম্নবর্গীয়দের ঘৃণ্য ও অচ্ছুৎ করল। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা তথাপি নিম্নবর্গীয়দের যথাযথ সম্মান জানিয়ে ফিরিয়ে আনার ন্যূনতম চেষ্টা করেনি। সেদিন যদি ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ব্রাহ্মণ্যবাদে কিঞ্চিৎ শিথিলতা এনে নিম্নবর্গীয়দের যথাযযাগ্য সম্মান জানাতে পারত, তাহলে কখনোই এত সংখ্যক হিন্দু সম্প্রদায় থেকে মানুষ ইসলাম ও বৌদ্ধধর্মে কনভার্ট হয়ে যেত না।
বিদেশি শত্রুদের সঙ্গে বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন ছিল নিজেদের মধ্যে ঐক্য স্থাপন করা। ঐক্য তো দূরের কথা, উল্টে একটা জাতি ভেঙে হাজার টুকরো হয়ে গেল। ফলে বিদেশি আক্রমণকারীরা পেয়ে গেল ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী একটা গোষ্ঠীর সাহচর্য। তা না-হলে বিদেশ থেকে আসা ভিন্ন ধর্মের একটা জাতি দীর্ঘ ৮০০ বছর ভারত শাসন করতে পারত না। আরও কিছু তথ্য শোনাই আপনাদের। ব্রাহ্মণ্যবাদীরা ‘বিষ্ণুধর্মশাস্ত্র গ্রন্থ লিখে ফেললেন এসময়। কী বলছেন এ গ্রন্থে? বলছেন –“হরিদ্রাবণের বস্ত্র পরিহিত সাধুদের (বৌদ্ধ) ও কাপালিকদের দর্শন মঙ্গলজনক নয়।” এই গ্রন্থে ম্লেচ্ছ, অন্ত্যজদের সঙ্গে বাক্যালাপ পর্যন্ত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ম্লেচ্ছদেশে (সমুদ্র অতিক্রম করে যে দেশে যেতে হয়, কালাপানি) পর্যটনও নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। বস্তুত এ সময়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী তথা উচ্চবর্গীয় হিন্দুসমাজ নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে উঠেপড়ে লেগেছিল। ফলে হিন্দুসমাজ সংকীর্ণ হতে হতে ক্রমশ কূর্মাবস্থা প্রাপ্ত হতে শুরু করল। মনু, যাজ্ঞবল্ক্যরা বৌদ্ধ দেশগুলিকে ব্রাহ্মণবর্জিত ‘ম্লেচ্ছদেশ’ বলে ঘোষণা করে দিল। অচ্ছুৎ হিসাবে বৌদ্ধ আর মুসলিমদের এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিল বলা যায়। এমনভাবে ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণবাদীরা নিজেদের চারদিকে একটা অদৃশ্য পাঁচিল তুলে দিল। এ সময় থেকেই জাতিভেদ, স্পর্শদোষ, বিধর্মীদের প্রতি ঘৃণা প্রদর্শন গেড়ে বসতে থাকল। এমতাবস্থায় শূদ্র-অন্ত্যজ তথা পতিতদের ভাগ্যে অতীব দুর্দশা চিরস্থায়ীভাবে পোক্ত হয়ে গেল। ব্রাহ্মণ্যবাদী ঘূত্মার্গীয় জাতিভেদের ভীষণ কঠোরতা ও বিধিনিষেধ সংবলিত বর্তমান এই ভারতের হিন্দুসমাজের এই সময় থেকেই পাকাপাকিভাবে শুরু গেল, যা আজও প্রবাহমান। ব্রাহ্মণ্যবাদী উচ্চবর্গীয়দের উৎপীড়ন সংখ্যালঘু স্বদেশি বৌদ্ধদের দেশ থেকে উৎখাত করতে সক্ষম হলেও সংখ্যালঘু বিদেশি মুসলিম শাসকদের উৎখাত করতে সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে। যে জাতি নিজেদের মধ্যে কোন্দল হানাহানি রক্তারক্তি করে থাকে, সেই জাতির দিগ্বিজয় অনেক দূরের স্বপ্ন, জয়ী হতেই পারে না।
পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনের শিক্ষক প্রমোদবরণ বিশ্বাস তাঁর ‘ব্রাহ্মণ্যবাদ ও দলিত সমাজ’ গ্রন্থে লিখেছেন– “…বিবেকানন্দ কিন্তু এই দরিদ্র মূর্খদের জন্য কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করে যাননি। বরং বাস্তবে তিনি ঠিক এর বিপরীত কাজটিই করে গেছেন। বিবেকানন্দের নিজের হাতে প্রতিষ্ঠিত রামকৃষ্ণ মিশন দ্বারা পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে কোন্ সমাজের ছাত্ররা ভর্তি হতে পারবে। তার একটা সুনির্দিষ্ট ধারা তিনি রামকৃষ্ণ মঠ-মিশনের সংবিধানে নিজের হাতে Fotelcata– Only the Hindu boys of good family will be admitted in this mission.’ অর্থাৎ একমাত্র কুলীন হিন্দু পরিবারের ছেলেরাই এই মিশনে ভর্তি পারবে। এই গোপন সার্কুলারের মধ্য দিয়েই আমরা প্রকৃত বিবেকানন্দকে দেখতে পেলাম। সুতরাং দলিতদের দৃষ্টিতে স্বামী বিবেকানন্দ আসলে হঠকারী ব্যক্তিত্ব। তাই তো দেখি রামকৃষ্ণ মিশন পরিচালিত কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দরিদ্র, মূর্খ, চাষাভূষো তফসিলি এবং আদিবাসী সমাজের ছাত্রছাত্রীদের ভর্তির জন্য সংবিধান নির্দেশিত সামান্য সংরক্ষণ প্রথাও মান্য করা হয় না। আর সংরক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ তো দূর অস্ত! কারণ এতে নাকি মিশনের ঐতিহ্য নষ্ট হয়ে যাবে।”
“স্বধর্মে নিধনং শ্ৰেয় পরধর্মো ভয়াবহঃ”– এই শ্লোকটি গীতায় পাওয়া যায়। এখানে যে ধর্মের কথা বলা হয়েছে, সেটা হিন্দুধর্ম নয়। সেই ধর্ম ব্রাহ্মণদের ধর্ম ব্রাহ্মণ্যধর্ম। এ সময় দুটোই ধর্ম– একটি আর্য ধর্ম, অন্যটি অনার্য ধর্ম। আবার চতুর্বর্ণের মধ্যে একে অপরের বিচারে ‘পরধর্ম’। বর্ণবাদী ব্রাহ্মণেরা শ্রীকৃষ্ণের মুখে কথাগুলি বসিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য সাধন করেছেন। সে সময় বর্তমান হিন্দুধর্মের মতো সন্মিলিত ধর্মের সৃষ্টি হয়নি, সে সময়ের ভারতীয় ধর্মকে সনাতন ধর্ম বললেই সঠিক হয়। গীতায় উল্লিখিত এই ধর্ম আসলে ব্রাহ্মণ ধর্ম, ক্ষত্রিয় ধর্ম, বৈশ্য ধর্ম এবং শূদ্র ধর্ম। এই ধর্ম রক্ষা করতেই ত্রেতাযুগের রাজা রামচন্দ্র শূদ্র শম্বুককে হত্যা করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি তপস্যা করে ব্রাহ্মণ হতে চেয়েছিলেন। তার অপরাধ, তিনি লুকিয়ে বেদ পাঠ করেছিলেন। ঘটনাটি এ রকম : এক কুলিন ব্রাহ্মণের বালকপুত্র অসময়ে মারা যায়। রাজপুরোহিতরা রামকে বলেন, “রাজ্যে কেউ পাপ করেছে, যার ফলে এই অঘটন ঘটছে”। খোঁজ নিয়ে দেখা গেল, শম্বুক নামে এক শূদ্র সশরীরে দেবত্ব পাওয়ার জন্যে তপস্যা করছে এবং তা সে নিজেই সেই কথা স্বীকার করল (রামায়ণ : ৭/৬/২)। “সেই শূদ্রটি কথা বলতে বলতেই উজ্জ্বল খঙ্গ কোশ থেকে বের করে তার শিরোচ্ছেদ করলেন রাঘব।” তখন দেবতারা রামকে সাধুবাদ দিয়ে বললেন, “রাম তুমি দেবতাদের কার্যসাধন করলে, তোমার জন্য এই শূদ্র স্বভাক হতে পারল না।” (পৃ: ১৩)
