মৌর্যযুগ অবসানের পর ব্রাহ্মণরা ‘অবধ্য’ ঘোষিত হলেও মৌর্যযুগে বা তারও আগে ব্রাহ্মণ বধ্যই ছিল। অনেকে মনে করেন অশোকের সমদণ্ডনীতিতেই ব্রাহ্মণরা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে পড়ল। এর ফলে ব্রাহ্মণ-বিদ্রোহে মৌর্য সাম্রাজ্য ধ্বংস হয়। বাস্তবিক এ তথ্য সত্য নয়। পূর্বে স্থলবিশেষে ব্রাহ্মণদেরও মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। মহাভারতে যেমন ব্রাহ্মণদের মৃত্যুদণ্ড ছিল, তেমনই বৃহদারণ্যক উপনিষদেও দেখতে পাই জনৈক ব্রাহ্মণ তার্কিক যাজ্ঞবন্ধ্যের প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারায় মুণ্ডহীন হয়েছিল। পঞ্চবিংশ ব্রাহ্মণে বর্ণিত আছে, মনিবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার করলে পুরোহিতেরও মৃত্যুদণ্ড হতে পারে। তবে এগুলো ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের শ্রেণি-সংঘাতের পরিচায়ক। অর্থশাস্ত্রেও আমরা পাচ্ছি, বিশ্বাসঘাতকতার অপরাধে ব্রাহ্মণকে জলে ডুবিয়ে মারার নির্দেশ। ব্রাহ্মণপ্রবর কৌটিল্য মৌর্যসাম্রাজ্যের মন্ত্রী ছিলেন। কাজেই ব্রাহ্মণের বধ্যতা মেনে নিতে হয়েছিল। ব্রাহ্মণদের অকথ্য অত্যাচারে সমাজের বেশিরভাগ নীচজাতীয় মানুষজন বৌদ্ধধর্মে চলে যাচ্ছিল। এসময় কৌটিল্যের পক্ষে শূদ্রদের ‘আর্যত্ব’ না। দিয়ে আর কোনো উপায় ছিল না। অধিকাংশ মানুষ তখন ভেরীঘোষ অপেক্ষা বুদ্ধের ধর্মঘোষ শ্রবণ করাই শ্রেষ্ঠ মনে করেছিলেন। ধৰ্ম্মঘোষ শ্রবণ করা মানেই পুরোহিত ডেকে যাগযজ্ঞ করার মানুষজনও আর থাকছিল না। বৌদ্ধধর্ম ও শূদ্ৰাধিপত্যের ফলে ব্রাহ্মণদের বনিয়াদি স্বার্থে ব্যাপক আঘাত লাগে। সেই আঘাতেই ব্রাহ্মণপ্রবর ক্ষেপে ওঠেন। প্রাচীন মনুসংহিতা গ্রন্থটি চালাচালি করে নব সংযোজন করলেন। মনুর নামেই মনুসংহিতা প্রয়োগ হতে থাকল। ব্রাহ্মণ্যবাদীদের শাসন প্রবর্তিত হওয়ার পর মনুশাসন শূদ্রদের দাবিয়ে রাখার জন্য কঠোর বিধিনিষেধ প্রণয়ন করলেন।
শাস্ত্রসমূহ ঘোষণা দিল –সব ধরনের পাপের পাপী হলেও ব্রাহ্মণকে কখনোই হত্যা করা যাবে না (মনুসংহিতা, ৮/৩৮০)। রাজাকে নির্দেশ দেওয়া হল– ক্রীত হোক বা না হোক, শূদ্রকে দিয়ে সমস্ত রকমের দাস্যকর্ম করিয়ে নেবেন। কারণ বিধাতা শূদ্রদের দাস্যকর্ম করানোর জন্যেই সৃষ্টি করেছেন। শূদ্র প্রভুমুক্ত হলেও দাসত্বমুক্ত হয় না। দাস্যকর্ম তাঁর জন্য স্বাভাবিক। অতএব কার সাধ্যি শূদ্রদের দাসত্ব থেকে মুক্তি দেবে? এইভাবেই ব্রাহ্মণ্যধর্মের ব্রাহ্মণ্যবাদীরা কৌশলে শূদ্রদের ‘চিরঅভিশপ্ত থেকে যাওয়ার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে গেল। শূদ্রদের প্রতি ঘৃণা এমন পর্যায়ে চলে গেল যে, শূদ্রের কেউ উচ্চবর্ণের দাওয়ায় বসলে সে উঠার পর গোবরজল দিয়ে ধুয়ে ফেলা হয় শূদ্রের ছায়া মাড়ালে বা শূদ্র ছুঁয়ে দিলে উচ্চবর্ণের মানুষরা স্নান করে শুদ্ধ বা পবিত্র হত। উচ্চবর্ণের সামনে দিয়ে শূদ্রকে কোমর ভেঙে পাশ কাটাতে হবে। উচ্চবর্ণের সামনে ছাতা মাথায় দেওয়া যাবে না, কখনোই পায়ে জুতো পরা যাবে না, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ঊর্ধ্বাঙ্গে কোনো কাপড় রাখতে পারবে না ইত্যাদি নানাবিধ অবমাননাকর সমাজব্যবস্থা প্রচলন হল।
ব্রাহ্মণ রাজা হতে পারে। ব্রাহ্মণ দেবতাও হতে পারে। কিন্তু শূদ্র দাস ছাড়া কিছুই হতে পারে না। ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী বৌদ্ধ ও শূদ্রদের প্রতি এইভাবেই ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছিল ব্রাহ্মণ্যবাদীরা। মৌর্যরাও ব্রাহ্মণ্যবাদ বিরোধী ছিলেন। ব্রাহ্মণ্য প্রতিক্রিয়ায় মৌর্য সাম্রাজ্যের পতন হল। শুরু হল ব্রাহ্মণ্যাধিপত্যের প্রথম যুগ, তা হল পুষ্যমিত্রের রাজত্বাধীন রাষ্ট্রেই। এই সময় সুঙ্গ, কম্ব বংশ মগধের সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়ে উত্তর ভারতে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা ও বিস্তার লাভ করে। পরে দক্ষিণ ভারতে অন্ধ্র, শতবাহন বংশ প্রভূত্ব শুরু করে।
এ সময় দক্ষিণ ভারত উপমহাদেশে এক রাজশক্তির উত্থান হয়। এঁদের অন্ধ্র বা অন্ধ্রভৃত্য বলা বলা হত। মনু তাঁর স্মৃতিগ্রন্থে মেদ, চণ্ডালের মতো গোষ্ঠীকে পতিত বলেছেন। যদিও অন্ধ্রভৃত্য শতবাহন বংশ নিজেদেরকে ব্রাহ্মণ বলত। এই বংশের পুনঃপ্রতিষ্ঠাতা সিরি সতকর্ণি গোতমিপুত্ত নিজেকে ‘একবীর’ ও ‘একব্রাহ্মণ’ বলতেন। ইনি ব্রাহ্মণ্যত্বের ঠেলায় ক্ষত্রিয়দের অহংকার নষ্ট করে দেন। দ্বিজদের স্বার্থোন্নতি সাধন করে চতুর্বর্ণের মিশ্রণ বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
অতএব যে শ্রেণির হাতে শাসনযন্ত্র থাকবে রাষ্ট্রের আইন-অনুশাসন ইত্যাদি ব্যবস্থাপত্রও সেই শ্রেণির স্বার্থ ও সুবিধা অনুসারেই সৃষ্ট তথা বিধিবদ্ধ হয়। আজও তার অন্যথা হয় না। অতএব রাজবংশের পরিবর্তন হলেও শাসন পদ্ধতির তেমন কোনো পরিবর্তন হত না। তথাকথিত ধর্মগ্রন্থগুলি তো আদতে শাসনগ্রন্থ বা আইনগ্রন্থই। প্রাচীন রাষ্ট্রধারণায় ধর্মীয় অনুশাসন দ্বারা শাসিত হলেও আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্মীয় অনুশাসন তেমন অনুসরণ করা হয় না। তবে সামাজিক অনুশাসনে আজও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রভাব আছে। পুরোহিততন্ত্র সেই অনুশাসন চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। মৌর্যযুগের অবসানের পরপরই ব্রাহ্মণ্য আধিপত্যের অস্ত্র হিসাবে শাস্ত্র-সংহিতা পুরাণাদি রচিত হল। এইসব গ্রন্থগুলি পাঠ করেই অনুধাবন করা যায় ব্রাহ্মণদের মূল লক্ষ্য সমাজের চার শ্রেণি– ব্রাহ্মণ, রাজা বা ক্ষত্রিয়, নারী ও শূদ্র। এই চার শ্রেণির জন্য ব্রাহ্মণগণ উদয়াস্ত পরিশ্রম করে অসংখ্য গ্রন্থ রচনা করে ফেলেছেন, যা হিন্দুসমাজে সম লাভ করেছে। ঐতিহাসিক জয়সওয়াল বলেন, অন্ধ্ররাজাদের সমসাময়িককালে উত্তর ভারতেই যাজ্ঞবল্ক্যর সংহিতা রচিত হয়। যাজ্ঞবল্ক্য শতবাহন বংশের রাজত্বকালের সমসাময়িক ছিলেন। যাজ্ঞবল্ক্য তাঁর সংহিতার প্রথম অধ্যায়ের ২৭৩ নম্বর নির্দেশিকায় বৌদ্ধভিক্ষুর বিরুদ্ধে বিষ উগড়ে দিয়েছেন। তিনি সেই নির্দেশিকায় বলেছেন –“হরিদ্রা রঙের কাপড় পরিধানকারী ব্যক্তিগণ অশুভ-দর্শন”। শূদ্রদের বিরুদ্ধে বলছেন– “দ্বিজজাতিদের শূদ্রা স্ত্রীলোক গ্রহণ নিষিদ্ধ। শূদ্র কেবল নিজ জাতির মধ্যে বিবাহ করবে। কারণ প্রতিলোম বিবাহের সন্তানেরা ‘অসৎ’ এবং অনুলোম বিবাহের সন্তানেরা ‘সৎ’ বলে বিবেচিত। ভারতে যে ‘মিতাক্ষরা’ আইন, তা যাজ্ঞবন্ধ্যের সংহিতার উপরই তার ভিত্তি স্থাপিত, যা আজও ভারতে বিদ্যমান। অথচ ব্রাহ্মণ্যবাদীদের শিরোমণি তথা আরএসএসের প্রতিষ্ঠাতা গোলওয়ালকর কী বলছে পড়ন– “শূদ্র মহিলাদের প্রথম সন্তান ব্রাহ্মণ ঔরসজাত হওয়া বাঞ্ছনীয়, তাঁর বিবাহ যাঁর সঙ্গেই হোক না কেন। এতে ব্রাহ্মণ জাতের গুন নিচু জাতের মধ্যে সম্প্রসারিত হয়” (অর্গানাইজার, ১৯৬১)।
