এই স্মৃতিগ্রন্থেই ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন করা হয়েছে এবং অবশ্যই শূদ্রদের প্রতি কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করা হয়েছে। শূদ্রদের ঘৃণ্যতর করা হয়েছে। আদি মনুসংহিতায় বা স্মৃতি সমূহে শূদ্রদের প্রতি এত বিদ্বেষ ছিল না। মনুর মতে– “শূদ্র বিচারকের পদ পেতে পারে না।” (৮/২০) “যে রাজ্য শূদ্রবহুল, নাস্তিকতাক্রান্ত এবং দ্বিজশূন্য –সেই রাজ্য অচিরেই দুর্ভিক্ষ ও বহুবিধ ব্যাধিপ্রপীড়িত হয়ে বিনষ্ট হয়ে থাকে।” (৮/২২) বাস্তবিকই এই গ্রন্থ থেকে অশোকের দণ্ড সমতাগুলি বাতিল করা হয়েছে। উপরন্তু বলা হয়েছে, উচ্চশ্রেণির মানুষরা যদি নীচশ্রেণির মানুষদের উপর অত্যাচার করলে দণ্ড কম হবে। কিন্তু নীচশ্রেণির মানুষরা যদি উচ্চবর্ণের উপর অত্যাচার করে তাহলে তাঁর দণ্ড অধিক হবে। “দর্পের সঙ্গে শূদ্র যদি ব্রাহ্মণকে ধর্মোপদেশ দেয়, তাহলে রাজা তাঁর মুখে ও কানে গরম তেল ঢেলে দেবে।” (৮/২৭২) শূদ্র যদি শ্রেষ্ঠ জাতির প্রতি কোনো প্রকার হিংসামূলক কাজ করে তাহলে সেই অপরাধের জন্য হাত বা পা, নিতম্ব কর্তন করে দেবে, অথবা ঠোঁট দুটি ছেদন করে দেওয়া হবে।” (৮/২৭৯-২৮৩) মনু নির্দেশ দিয়েছেন– ব্রাহ্মণ বিশ্রদ্ধচিত্তে দাস-শূদ্রের ধন সম্পদ আত্মসাৎ করতে পারেন। কোনো জিনিসই তাঁর নিজস্ব নয়। তাঁর সমুদয় অর্থই ভর্তৃহার্য। (৮/৪১৭) এখানেই শেষ নয়, নিজেদের বন্দোবস্তও করিয়ে রাখেন। বলছেন –“রাজা অর্থাভাবে মরণাপন্ন হলেও বেদজ্ঞ ব্রাহ্মণের কাছ কখনো কর গ্রহণ করবে না।” (৭/১৩৩) সেই মনুর নীতি আজও অব্যাহত। আজও মন্দিরের রোজগার আয়কর নেওয়া হয় না। মন্দিরের আয় নিষ্কর। আয়কর দফতরকে কোনো রিটার্ন জমা দিতে হয় না। অথচ ভাবুন তো কী বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদ মন্দিরগুলো আয় করে। কষ্ট করে ভাবার দরকার নেই। আসুন দেখে নিই মন্দিরের রাজগার।
ভারতের সবচেয়ে সম্পদশালী মন্দিরটি হল কেরালায়। মন্দিরটির নাম পদ্মনাভস্বামী। এদের বার্ষিক আয় কত জানা যায় না। তবে এখানের সম্পদের মূল্য প্রায় ১১ লাখ কোটি টাকা।
তালিকার দ্বিতীয় নাম্বারে রয়েছে তিরুপতি বালাজি মন্দির। বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেবতা। মন্দির চত্বরের মূল মন্দিরটি সোনা দিয়ে মোড়া। মন্দিরের গর্ভগৃহে প্রদীপের আলোয় দেবদর্শন। কালো বিশাল মূর্তির মাঝে সোনার প্রলেপ। বছরভর ভিড় লেগেই থাকে এই বিশ্ববিখ্যাত মন্দিরে। হতদরিদ্র থেকে কোটিপতি, অভিনেতা থেকে মেগাস্টার, রাজনীতিবিদ থেকে মন্ত্রীসান্ত্রী, এমনকি দেশের বাইরের কূটনীতিবিদরাও তিরুপতি মন্দিরে আসেন। বছরভর প্রচুর মানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। প্রতিদিন প্রায় ৭০ হাজার ভক্ত এখানে উপাসনা করতে আসেন। উৎসব ও পার্বণে এই সংখ্যা ৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এই মন্দিরের বার্ষিক আয় প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা আয় হয় দান থেকে। দর্শনার্থীদের কাছে টিকিট বিক্রি করে আয় হয় প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। বাকিটা আসে বিভিন্ন ধরনের বিনিয়োগ থেকে। আছে ডোনেশন। এই মন্দিরে ২০ টন সোনা ও হিরার গহনা আছে। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের তিরুমালা তিরুপতি ভেঙ্কটেশ্বর মন্দিরে শুধু সোনা রয়েছে ৩০০০ কেজি, আর তাদের ঘোষিত সম্পত্তি রয়েছে ৫০,০০০ কোটি টাকা।
জম্মু ও কাশ্মীরের বিষ্ণুদেবী মন্দির সবচেয়ে পুরাতন মন্দির। প্রতিবছর আনুমানিক ৮০ লাখ ভক্ত এখানে উপাসনা করতে আসেন। যে সংখ্যাটি বালাজি মন্দিরের পরেই। এই মন্দিরের আয় প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। অন্য মন্দিরগুলোর মতোই এখানেও থাকার বন্দোবস্ত আছে।
সম্পদের দিক থেকে চার নাম্বারে পাঞ্জাবের অমৃতসরের গোল্ডেন টেম্পল বা সোনালি মন্দির। শিখ গুরু অর্জুন ষোড়শ শতকে এই মন্দির নির্মাণ করেন। প্রতিদিন প্রায় ৪০ হাজার ভক্ত এখানে আসেন। কাঠ, সোনা আর রূপার কারুকাজে পুরো মন্দির দৃষ্টি কাড়ে। এই মন্দিরের বার্ষিক আয় সুনির্দিষ্টভাবে জানা যায়নি।
মুম্বাইয়ের গণপতি মন্দির হল দেবতা গণেশের মন্দির। অষ্টাদশ শতকে এই মন্দির তৈরি করা হয়েছে। গণেশের মূর্তির মুকুটে সাড়ে তিন কেজি সোনা ব্যবহার করা হয়েছে। দিনে গড়ে প্রায় লাখ খানেক ভক্ত গণেশকে একনজর দেখতে এখানে আসেন। মুম্বাইতে হওয়ার কারণে বলিউডের নামিদামি তারকারা এখানে আসেন। তারা মুক্তহস্তে দান করেন। ফলে সবমিলেয়ে বছরে আড়াই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা আয় করে এই মন্দির।
মুম্বাই শহরের প্রান্তে আর-একটি মন্দির আছে সাঁইবাবা মন্দির। প্রতিবছর কয়েক লাখ দর্শনার্থী এখানে আসেন। এই মন্দির দান থেকে প্রতিবছর আয় করে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।
যাই হোক, ভারতীয় শ্রেণিগুলি যত বনিয়াদি স্বার্থ বিবর্তিত করে নিজেদের স্থানুবৎ অচল করতে লাগল ততই উচ্চশ্রেণির রক্তের বিশুদ্ধতা, জন্মের পবিত্রতা, আচার-ব্যবহারের নানাপ্রকারের বিভিন্নতা ও দাবি উদ্ভূত হতে থাকল। পরিশেষে এলো Divine Right of King। ভারতীয় সমাজ প্রবেশ করল সামন্ততান্ত্রিক যুগে। মানবধর্মশাস্ত্রে ব্রাহ্মণ-প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা ও শূদ্র এবং পতিতদের প্রতি বিশেষ কঠোর ব্যবস্থা দেখে জয়সওয়ালের অনুমান সত্য বলে মনে হয় যে, মৌর্য সাম্রাজ্য ধ্বংস হওয়ার পর ব্রাহ্মণাধিপত্যের সময় ব্রাহ্মণদের শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করে মনুসংহিতা তৎসহ বিভিন্ন স্মৃতিশাস্ত্র রচিত হল। পুষ্যমিত্রের রাজত্বাধীন রাষ্ট্রে ব্রাহ্মণাধিপত্যের প্রথম যুগ বলা হয়। রাষ্ট্রীয় আইন-অনুশাসনও তখন সেই শ্রেণির স্বার্থ-সুবিধা অনুসারেই সৃষ্টি হয়।
