‘বিদুর’ গ্রন্থে লেখক মিহির সেনগুপ্ত লিখেছেন– ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে ব্রাহ্মণরা বৈশ্য প্রভৃতি বর্ণের সাহায্যও কখনো-কখনো গ্রহণ করেছিল এবং তথাপি পরাজিতও হয়েছিলেন। সে বোধহয় পরশুরামের আবির্ভাবের আগেকার কথা হবে। জামদগ্ন্যরাম যখন ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণদের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেননি, তখন তাঁরা নাকি বৈশ্য এবং শূদ্রদেরও সহায়তা নিয়ে ক্ষত্রিয়দের কাছে বারবার পরাজিত হচ্ছিলেন। মিহির সেনগুপ্ত আরও লিখেছেন– যুদ্ধবিরতিকালীন সাময়িক শান্তির সময়ে ব্রাহ্মণেরা ক্ষত্রিয়দের জিজ্ঞাসা করেছিলেন, এত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও তাঁরা কেন বিজয়ী হতে পারছেন না! ক্ষত্রিয়রা তখন বলেছিলেন যে, এক অখণ্ড নেতৃত্বের অধীনে সংগ্রাম না করলে বিজয় লাভ করা যায় না। আপনারা যে যাঁর বিচারমতো চলতে চান। তাই কখনোই বিজয়লাভ করতে পারেন না। অতঃপর জামদগ্ন্যরামকে ব্রাহ্মণরা তাঁদের অখণ্ড নেতা হিসাবে নির্বাচন করার পরই তাঁরা জয়লাভ করতে শুরু করে। তার পরবর্তী দীর্ঘকাল এই পরশুরামের অনুগামী ব্রাহ্মণেরা শস্ত্রশিক্ষা বিষয়ে সবিশেষ পারদর্শিতা দেখিয়ে আসছিলেন। এঁদের পরবর্তী সব দলপতিকেই এঁরা ‘পরশুরাম’ নামে অভিহিত করে থাকেন। পরশুরাম’ নামটি একদা তাঁদের গোত্ৰনাম হয় এবং গোত্ৰাধিপতি এই নামেই পরিচিত হতে থাকেন। যখন ক্ষত্রিয় এবং ব্রাহ্মণদের বৃত্তির কোনো নির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট বিভাগ ছিল না, তখন এইসব পরশুরামেরা বহুবার ক্ষত্রিয়দের নিঃশেষ করার সংগ্রামে জয়ী হয়েছেন।
বস্তুত ক্ষমতা কুক্ষিগত করার কারণেই ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়দের এই দীর্ঘকালীন বিরোধ। এরপর ব্রাহ্মণেরা বিধ্বংসী ও নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। সূক্ষ্ম বুদ্ধিপ্রয়োগে শাসকের আসনে না-বসলেও ক্ষত্রিয়দের পুতুলে পরিণত করে ব্রাহ্মণরাই রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠলেন। এমনকি সামরিক বিভাগটিও ব্রাহ্মণরা নিজেদের দখলে রেখেছিলেন। বিশ্বামিত্র, বশিষ্ট, দুর্বাসা, দ্রোণাচার্য, মার্কণ্ডেয়, অগস্ত্য প্রমুখ দোর্দণ্ডপ্রতাপ ব্রাহ্মণেরা ছিলেন সামরিক শক্তির আধার। বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার ছিল তাঁদের। যুদ্ধকালে এইসব ব্রাহ্মণদের কাছ থেকেই অস্ত্র সংগ্রহ করতে হত ক্ষত্রিয় যোদ্ধাদের। প্রাচীন যুগে ব্রাহ্মণরাই ছিলেন মূল ক্রীড়ক, ক্ষত্রিয়রা ছিলেন ক্রীড়নক মাত্র।
মৌর্যযুগের কৌটিল্য শূদ্রদের ঢেলে অধিকার দিয়েছে, একথা ভাবা মূর্খামি। ব্রাহ্মণদের আধিপত্য ঘষালো আনা অক্ষুণ্ণ রেখেই শূদ্রদের যৎসামান্য দেওয়া হয়েছে। ভিক্ষার দান! না-হলে নিজে ব্রাহ্মণ হয়েও কীভাবে শূদ্রদের ঘি-মাখন খাওয়ার ব্যবস্থা করে! কাজ হাসিল করে পিছনে পদাঘাত। কৌটিল্য শূদ্রদের এতই মঙ্গল চেয়েছিলেন যদি, তাহলে শূদ্র-শাসনকালেই শূদ্ররা পূর্ণমুক্তি পেল না কেন? মৌর্য সাম্রাজ্যের চরম উন্নতি হয় চন্দ্রগুপ্তের পৌত্র অশোকের রাজত্বকালে। যদিও চন্দ্রগুপ্তকে সম্রাট করে ব্রাহ্মণরা নিজেদের আধিপত্য একচেটিয়া করতে যথাসম্ভব চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করে ব্রাহ্মণদের সেই আশায় ছাই ঢেলে দেয়। অশোক বৌদ্ধ হয়েই অনুশাসন যজ্ঞে জীবহিংসা নিষিদ্ধ করে দেন। এই অনুশাসন অবশ্যই ব্রাহ্মণদের বিরুদ্ধে গেল। কারণ এই অনুশাসন একজন শূদ্ররাজার হুকুম। অশোক বারবার মনে করিয়ে দিতেন –যাঁরা পূর্বে পৃথিবীতে দেবতা বলে মান্য হতেন, তাঁদের তিনি মিথ্যা দেবতায় পরিণত করে দিয়েছেন। বৌদ্ধধর্ম গ্রন্থে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী লিখেছেন– যাঁরা ‘ভূদেব’ (ব্রাহ্মণ) বলে সম্মান ও পুজো পেত, তাঁদেরও তিনি মিথ্যা বলে প্রমাণ করে দিয়েছেন। অতঃপর অশোক ধৰ্ম্ম-মহাপাত্র, অর্থাৎ নীতি পর্যবেক্ষণের নিযুক্তি করে ব্রাহ্মণদের অধিকার ও সুবিধাভোগের উপর হস্তক্ষেপ করেন।
ব্রাহ্মণদের অনুশাসনে শূদ্ররা যেসব নির্যাতন ভোগ করত, অশোক তা সংশোধন করেন। তিনি জাতি, বর্ণ ও ধর্মে সাম্য স্থাপনে সচেষ্ট হন। এই সাম্যবাদ ব্রাহ্মণদের স্বার্থে কুঠারাঘাত করে। তাঁদের কাছে খুবই অসহ্য ও আপত্তিজনক মনে হয়েছিল। কারণ এই সাম্যবাদে ব্রাহ্মণেরা ‘অবধ্য ও মৃত্যুদণ্ডের অতীত’ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। ব্রাহ্মণেরা এ সময়কালে খাপে খাপ হয়ে গিয়েছিলেন। একদম কোণঠাসা অবস্থা। তথাপি কোণঠাসা হয়েছিলেন বলে তাঁরা হাত গুটিয়ে বসে থাকননি। অপেক্ষা করছিলেন একটা সুযোগের জন্য। খুঁজছিলেন কৌশল।
মৌর্যশাসনের সময়ই পাটলিপুত্র নগরে রাজসৈন্যের কুচকাওয়াজের সময়। ব্রাহ্মণ-সেনাপতি পুষ্যমিত্র রাজাকে হত্যা করে সিংহাসন দখল করে নেয়। বলা যায় ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রতিক্রিয়াশীলতা এই সময় থেকেই শুরু হয়ে গেল। এ সময় থেকেই বৌদ্ধশাসন ভেঙে দিয়ে ব্রাহ্মণ আধিপত্য কায়েম হয়ে যায়। এই সময়েই তথাকথিত মানবধর্মশাস্ত্র মনুসংহিতা বা মনুস্মৃতি পুনঃসংকলিত (নবরূপে) প্রকাশ্যে এলো। জয়সওয়াল ও জলির মতে, এই গ্রন্থ পাটলিপুত্রের জনৈক ব্রাহ্মণ সুমতী ভার্গব কর্তৃক রচিত হয়। গ্রন্থটি রচনার সময় পুষ্যমিত্রকে মাথায় রেখে কী প্রকার অবস্থায় অথবা কী প্রকার চরিত্রের রাজা বিনষ্ট হয়, তা বর্ণিত হয়েছে। মনুসংহিতার সপ্তম অধ্যায় জুড়ে রাজা কে, রাজা কী, রাজা কেন, রাজা কীভাবে, রাজা কী করবে, কী করবে না –তার পুঙ্খানুপুঙ্খ নীতিনির্দেশ লিখিত হয়েছে। কারণ রাজা পুষ্যমিত্র ছিলেন একজন রাজহন্তা। বস্তুত ভার্গবই শূদ্র-বিদ্বেষপূর্ণ এবং পুষ্যমিত্রের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ মনুসংহিতায় বিষবৃক্ষ রোপণ করে দিলেন।
