বিষ্ণুপুরাণে আমরা পাচ্ছি– “মগধে বিশ্বস্ফটিক নামে একজন রাজা অন্য জাতিদের (উপজাতি) প্রতিষ্ঠিত করবেন। তিনি ক্ষত্রিয়দের নির্বংশ করে জেলে, বর্বর, যদু, পুলিন্দ এবং ব্রাহ্মণদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করবেন। পদ্মবতী, কান্তিপুর ও মথুরাতে নয়জন নাগ জাতি রাজত্ব করবেন। দেবরক্ষিত নামে একজন রাজা সমুদ্রতীরে একটি নগরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে কোশল, ওড়, পুক আভিরেরা এবং শূদ্রেরা সৌরাষ্ট্রে, অবন্তী, সুর, আরবুদ মরুভূমি দখল করবে। শূদ্র, অন্ত্যজ এবং বর্বররা সিন্ধুতীর, দ্বারিকা, চন্দ্রভাগা ও কাশ্মীরে অধীশ্বর রূপে রাজত্ব করবে।”
এখন প্রশ্ন, পুরাণোক্ত এই বিশ্বস্ফটিক (কারও বিশ্বসফানি) কে ছিলেন? এঁর প্রকৃত নাম বাণস্পর। ইনি শক-সম্রাট কনিষ্কের অধীনে বেনারস বা বারাণসী প্রদেশের শাসনকর্তা ছিলেন। তিনি খ্রিস্টীয় ৯০ সাল থেকে ১৩০ সালের মধ্যে রাজত্ব করেছিলেন। তিনি ভারতীয় সমাজকে ব্রাহ্মণশূন্য করেছিলেন। উচ্চশ্রেণির বৈদিকধর্মীদের নামিয়ে নীচ জাতি এবং বিদেশিদের উচ্চ পদে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিলেন। ক্ষত্রিয়দের নির্বংশ করে নতুন শাসকজাতি সৃষ্টি করেছিলেন। কৈবর্ত শ্রেণি থেকে একটি নতুন শাসক অথবা রাজকর্মচারীশ্রেণি সৃষ্টি করেছিলেন। অস্পৃশ্য পচ্চকদের মধ্য থেকেও রাজকর্মচারী সৃষ্টি করেছিলেন। শক, পুলিন্দ জাতির লোক এনে বুন্দেলখণ্ড ও বিহারের মধ্যবর্তী স্থানগুলোতে উপনিবেশ করান। এই বক্তব্য ‘History of India’ গ্রন্থের লেখক শ্ৰীযুক্ত জয়সওয়ালের। জয়সওয়াল লিখেছেন– এই বাণস্পর বংশ এখনও বুন্দেলখণ্ডে আছে, তাঁরা নীচ বংশীয় বলেই গণ্য হয়। রাজপুতদের সঙ্গে তাঁরা বিবাহকার্য করতে পারে না।
এই বিশ্বস্ফটিকই কি ইতিহাসে চন্দ্রগুপ্ত? ঐতিহাসিক ডা. ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত অবশ্য এমনই দাবি করেছেন তাঁর গ্রন্থে। যাই হোক, মোদ্দা কথা হল, ব্রাহ্মণদের দাপট ও দৌরাত্ম্য সাময়িক হলেও চূর্ণবিচূর্ণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন বিশ্বস্ফটিক। তাঁর এই মহা-বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ব্রাহ্মণদের পরিকল্পিত বর্ণাশ্রম ধর্ম এবং পুরুষসূক্তের বর্ণগুলির উৎপত্তি ও তাঁদের কর্ম বিষয়ে ব্যবস্থাপদ্ধতি চরমভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হয়।
বেদোক্ত ‘দস্যু’, ‘দাস’, এবং পরবর্তী সময়ে শূদ্রেরা যখন ভারতের শাসকরূপে উন্নীত হল, তখন ফ্রান্সের মতো পতিতদের উত্থান হয়েছিল বলে স্বীকার করতে হবে। মূলত অর্থনৈতিক বিবিধ ফ্যাক্টরের মধ্যে বৌদ্ধ বনাম ব্রাহ্মণদের তুমুল কলহ ও সংঘর্ষই ছিল শূদ্র উত্থানের পটভূমি।
একদা বিদেশিরা ভাবত ভারতের ব্রাহ্মণসমাজ সারাজীবন ধর্মচর্চা করেই কাটিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু মৌর্যযুগের প্রাককালে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র আবিষ্কারের পর পণ্ডিতমহলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। তাঁরা বুঝলেন, কেবল ধর্মচর্চা নয়, ছিল যুদ্ধচর্চাও। তাঁরা রাজনীতি ও বিজ্ঞানের চর্চাও করতেন। এই অর্থশাস্ত্রই মৌর্য সাম্রাজ্যে আইনরূপে গৃহীত হয়েছিল, যার প্রভাব বৈবস্বত মনু। রচিত মনুসংহিতায় ব্যাপকভাবে পড়ে।
কৌটিল্য গান্ধার দেশীয় ব্রাহ্মণ ছিলেন। ব্রাহ্মণ হলেও তিনি কৃষ্ণবর্ণ ও কদাকার ছিলেন। সেই কারণে মহারাজ নন্দ তাঁকে পদে পদে অপমান করতেন। এই অপমানের শোধ তুলতে ব্রাহ্মণপ্রবর কৌটিল্য শূদ্র চন্দ্রগুপ্তের দ্বারা নন্দবংশের ধ্বংসসাধনে দৃঢ়প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। সেই কারণে ব্রাহ্মণদের প্রতি তাঁর অশেষ দুর্বলতা থাকলেও শূদ্রদের জন্যেও কিছুমাত্র প্রসাদের ব্যবস্থা করেছিলেন। আহ্লাদে নয়, তোষণ করতে। শূদ্ৰজাতিদের তোল্লা দিতেই অর্থশাস্ত্রের তৃতীয় খণ্ডে তেরো অধ্যায়ে বলেছেন –যে শূদ্র গোলামরূপে জন্মগ্রহণ করে নাই ও সাবালকত্ব প্রাপ্ত হয় নাই, এবং জন্ম দ্বারা যে আর্য (আর্যপ্রাণ); তাহাকে তাহার জাতিরা বিক্রয় করিলে অথবা বন্ধক দিলে তাহারা ১২ পণ শাস্তি পাইবে; বৈশ্যদের এই প্রকার হইলে ২৪ পণ, ক্ষত্রিয়দের ৩৬ পণ, ব্রাহ্মণদের ৪৮…ম্লেচ্ছদের মধ্যে এই প্রকার কার্য দোষবহ বলিয়া গণ্য হয় না। কিন্তু কোনো আর্য গোলামে পরিণত হইতে পারে না।
কৌটিল্য আরও বলছেন –“যে নিজেকে গোলামরূপে বিক্রয় করিয়া ফেলিয়াছে এরূপ ব্যক্তির পুত্র একজন ‘আর্য হইবে।”(১৬) “যে পরিমাণ অর্থের জন্য একজন গোলামে পরিণত হইয়াছে, সেই অর্থ প্রত্যার্পণ করিলে সেই গোলাম পুনঃ তাহার ‘আর্যত্ব’ ফিরিয়া পাইবে।” (১৭) কৌটিল্য ব্রাহ্মণদের শূদ্রা নারীকে গ্রহণ বা বিবাহের অনুমতিও দিয়েছিলেন।
আমরা কৌটিল্যের ‘সংবিধান’ থেকে যে তথ্য পেলাম, তা হল, শূদ্রদের ‘আর্যত্ব’ প্রাপ্তি। আর্য’ শব্দটি এখানে নরতত্ত্ববাচক নয়, এটি রাজনীতিবাচক বলেই প্রতীত হয়। অতএব একথা বুঝতে অসুবিধা হয় না যে, মৌর্য সাম্রাজ্যের স্বাধীন বা মুক্ত প্রজারা সকলেই ‘আর্য’ বলে গণ্য হয়েছিল। অথচ শূদ্র-উত্থান তথা কৌটিল্যের প্রবেশের আগে ব্রাহ্মণদের রচিত গ্রন্থগুলি আমরা ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্যদেরই ‘আর্য’ হিসাবে পাই। আর এই বেনিফিটটা শূদ্ররা পায় ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়ের মধ্যে সংঘর্ষের ফলেই। যদিও বেনিফিটটা ছিল সাময়িক।
ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের মধ্যে সংঘর্ষ কতটা তীব্র ছিল সেটা আমরা রামায়ণ, মহাভারত ও পুরাণগুলি নির্মোহ বিশ্লেষণ করলেই পেয়ে যাব। রামায়ণে আমরা দেখতে পাই ক্ষত্রিয়দের ‘শিখণ্ডী’ করে ব্রাহ্মণগোষ্ঠী অনার্যদের নির্বংশ করেছে। এ বিষয়ে আমি বিস্তারিত আলোচনা করেছি আমার ‘যুক্তিবাদীর চোখে রাম ও রামায়ণ’ গ্রন্থে। তাই রামায়ণের ক্ষত্রিয়-ব্রাহ্মণদের সংঘাতের কাহিনি এখানে। আলোচনা করছি না। মহাভারতেও আমরা ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়ের সংঘাতের চিত্র পাই। সেখানেও ব্রাহ্মণগোষ্ঠী ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে ক্ষত্রিয় লেলিয়ে ক্ষত্রিয় ধ্বংস করেছে। একই সঙ্গে যদুবংশও ধ্বংস করেছে। সে যুগে যখন ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা পরস্পরের প্রতি ক্ষমতার দ্বন্দ্বে যুযুধান, তখন জমদগ্নিরাম ব্রাহ্মণদের নিয়ে একটি সশস্ত্র বাহিনী গড়ে তোলেন। এই বাহিনীকে ব্যবহার করে পরশুরাম একুশবার ক্ষত্রিয় ধ্বংস করেছেন। মহর্ষি ভৃগুর (পরশুরামের প্রপিতামহ) বাক্যানুযায়ী পরশুরাম বৃত্তিতে ক্ষত্রিয় হয়েছিলেন। তাই জগতে তিনিই প্রথম ব্রাহ্মণ যোদ্ধা। পরশুরামের মা রেণুকা ছিলেন অযোধ্যার সূর্যবংশের মেয়ে। এই বংশেই রামচন্দ্রের জন্ম হয়। জমদগ্নির ঔরসে রেণুকার গর্ভে পাঁচ পুত্রের মধ্যে পরশুরাম ছিলেন কনিষ্ঠ। একবার চিত্ররথ নামে এক রাজাকে সস্ত্রীক জলবিহার করতে দেখে রেণুকা কামার্ত হয়ে পড়েন। ধ্যানমগ্ন অবস্থায় সেই দৃশ্য অবলোকন করেন জমদগ্নি। এই অপরাধে স্ত্রীকে শাস্তি দিতে পাঁচ পুত্রকে আহ্বান করলেন। মাকে হত্যা করতে কোনো পুত্র রাজি না-হলেও কনিষ্ঠ পুত্র পরশুরাম রাজি হয়ে যান এবং পিতার আদেশে কুঠারের আঘাতে মায়ের শিরচ্ছেদ করেন। তবে মাতৃহত্যাজনিত পাপে তাঁর হাতের কুঠার হাতেই সংযুক্ত হয়ে যায়। অপরদিকে পুত্রের মাতৃহত্যাজনিত কর্মে খুশি হয়ে পিতা জমদগ্নি তাঁকে বর প্রার্থনা করতে বলেন এবং অখুশি হয়ে বাকি পুত্রদের অভিশাপ দেন। বর হিসাবে পরশুরাম পিতার কাছ থেকে মায়ের পুনর্জন্ম, মাতৃহত্যাজনিত পাপ ও মাতৃহত্যার স্মৃতি বিস্মৃত হওয়া, ভাইদের জড়ত্ব মুক্তি, নিজের দীর্ঘায়ু এবং অজেয়ত্ব প্রার্থনা করেন। জমদগ্নি তাঁকে সবকটি বরই প্রদান করেন। ব্ৰহ্মকুণ্ডে স্নান করার পর হাত থেকে কুঠার বিচ্ছিন্ন হয়েছিল পরশুরামের। হৈহয়রাজ কীর্তবীর্য জমদগ্নির হোমধেনুর গোবৎস বহন করেছিলেন বলে পরশুরাম তাঁকে হত্যা করেছিলেন। কীর্তবীর্যের পুত্ররা প্রতিশোধ নিতে আশ্রমে এসে তপস্যারত জমদগ্নিকে হত্যা করে। ক্ষুব্ধ পরশুরাম একাই কীর্তবীর্যের সব পুত্রকে হত্যা করেন। এরপর তিনি একুশবার পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় করেছিলেন। তিনি ক্ষত্রিয়দের রক্ত দিয়ে সমস্ত পঞ্চক প্রদেশের পাঁচটি হ্রদ পূর্ণ করেন। (সমস্ত পঞ্চকোপাধ্যান– দ্বিতীয় অধ্যায়– আদিপর্ব, মহাভারত) শেষে পিতামহ ঋচিকের অনুরোধে ক্ষত্রিয় হত্যালীলা বন্ধ করেন পরশুরাম। ক্ষত্রিয়রা পরাভূত হন ব্রাহ্মণদের সশস্ত্র বাহিনীর হাতে।
