যেহেতু এই শ্রেষ্ঠ দেবগণের অংশ থেকে রাজার সৃষ্টি হয়েছিল, সেইজন্য তিনি সকল জীবকে তেজে অভিভূত করেন–
“যস্মদেষাং সুরেন্দ্রাণাং মাত্রাভ্যো নৃপঃ।
তস্মাদভিভবত্যেষ সর্বভূতানি তেজস্য।”
অথবা –রাজাকে বালক হলেও মানুষ মনে করে অবজ্ঞা করা উচিত নয়। ইনি মানুষের রূপে মহান দেবতা —
“বলোহপি নামমন্তব্যো মনুষ্যা ইতি ভূমিপঃ।
মহতী দেবতা হ্যেষা নররূপেণ তিষ্ঠতি।”
এই অধ্যায়ে এ রকম ২২৬টি শ্লোকে ভয় ধরানো বর্ণনা, বিশেষণ এবং নিদানের উল্লেখ আছে।
দেখা যাচ্ছে এঁরা সবাই-ই দেবতা বা সুর, এঁরা ছাড়া বাকি সব দৈত্য বা অসুর। তাই নিয়মনীতিও আলাদা —
“ব্রাহ্মণঃ ক্ষত্রিয়ো বৈশ্যস্ত্ৰয়ো বৰ্ণা দ্বিজাতয়ঃ।
চতুর্থ একজাতিস্তু শূদ্রো নাস্তি তু পঞ্চমঃ।” (১০/৪)
অর্থাৎ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় ও বৈশ্য এই তিন বর্ণের পক্ষে উপনয়ন সংস্কারের বিধান থাকায় এঁরা ‘দ্বিজাতি’ নামে অভিহিত হয়। আর চতুর্থ বর্ণ শূদ্র উপনয়ন সংস্কারবিহীন হওয়ায় দ্বিজাতি নয়, তাঁরা হল ‘একজাতি’। কারণ শূদ্রের পক্ষে উপনয়ন-সংস্কারের বিধান নেই। অতএব অনিবার্যভাবে শূদ্ররা হল নিম্নবর্ণ। ফলে এঁরা ব্রত যজ্ঞ অনুষ্ঠানাদি পালনের যোগ্য হতে পারে না। এছাড়া পঞ্চম কোনো বর্ণ নেই অর্থাৎ ঐ চারটি বর্ণের অতিরিক্ত যাঁরা আছে তাঁরা সকলেই সঙ্করজাতি। হিন্দুধর্মের চারবর্ণের সর্বশেষ ধাপে অবস্থান শূদ্রের। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য– যাঁদের সভ্য ভাষায় বলা হচ্ছে উচ্চবর্ণ বা উঁচু জাত এবং শূদ্রদের বলা হয় নিন্মবর্ণ বা নিচুজাত বা ছোটোজাত।
ডা. ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের মতে মনুর শ্লোকে ‘অনার্য’ শব্দের কুল্লুকভট্ট অর্থ করেছেন ‘শূদ্র’। কিন্তু অনার্য হলেই শূদ্র হয় না। Buehler অনার্য শব্দটির অর্থ করেছেন non-Aryan। এই অর্থ ঠিক নয়। Jones বলেছেন –base-man ও base-women। অনার্য শব্দের অর্থ নীচ, হীন এবং ব্রাহ্মণবিরোধী।
একজন মানুষ মৃত্যু বরণ করলে, মৃত ব্যক্তির পুত্র-কন্যা ও নিকট আত্মীয় স্বজনেরা হিন্দু সমাজের বিধান অনুযায়ী অশৌচ হয়ে যায়। এ জন্য জাতিভেদের নিয়ম অনুসারে ১০-১২-১৫-৩০ দিন অশৌচ পালন শেষে ব্রাহ্মণ দ্বারা মৃত ব্যক্তির শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠান করে তারপর পবিত্র হতে হয়।
“শুধ্যেদ্বিপ্যো দশাহেন দ্বাদশাহেন ভূমিপঃ।
বৈশ্য পঞ্চদশাহেন শূদ্রো মাসেন শুধ্যাতি।”
— যাঁরা ১০দিন অশৌচ পালন শেষে ১১দিনে শ্রাদ্ধনুষ্ঠান করে তাঁরা ব্রাহ্মণ, যাঁরা ১২দিন অশৌচ পালন শেষে ১৩ দিনে শ্রাদ্ধনুষ্ঠান করে তাঁরা ক্ষত্রিয়, যাঁরা ১৫দিন অশৌচ পালন শেষে ১৬দিনে শ্রাদ্ধনুষ্ঠান করে তাঁরা বৈশ্য, আর যাঁরা ৩০ দিন অশৌচ পালন শেষে ৩১ দিনে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান করে তাঁরাই শূদ্র। এরকম হাজারো বৈষম্যমূলক নিয়মনীতি শূদ্রদের তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, ঘৃণ্য করে তুলেছে। বেদ, উপনিষদ, পুরাণ, মনুসংহিতা, রামায়ণ, মহাভারত– সর্বত্রই শূদ্রদের অপমানের বিবরণ। প্রতি পদে পদে শূদ্রদের প্রান্তিক করে দিয়েছে, শৃঙ্খলিত করেছে। উদাহরণ দিয়ে প্রবন্ধটি ভারাক্রান্ত করতে চাই না।
বহু বছর আগে একটি মহামূল্য গ্রন্থ পাঠ করেছিলাম। গ্রন্থটি ডাঃ ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের ভারতীয় সমাজ পদ্ধতি’। গ্রন্থটি সম্ভবত তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছিল। এই গ্রন্থে লেখক প্রাচীন ভারতের শূদ্রদের অবস্থান নিয়ে যে সমাজচিত্রটি তুলে ধরেছেন, তা শুনলে চমকে যেতে হয়। টুকরো টুকরো মনে পড়ছে। স্মৃতি থেকে এখানে উল্লেখ করার চেষ্টা করি। তিনি লিখেছিলেন– মুড়া নামের এক নীচ জাতীয় নারীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করেন চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। চন্দ্রগুপ্ত আসলে জারজ সন্তান। মৌর্যদের শূদ্র বলে গণ্য হত। ভারতীয় জনশ্রুতিতে চন্দ্রগুপ্তকে শূদ্র বলেই অভিহিত করা হয়েছে। পুরাণেও চন্দ্রগুপ্তের গোষ্ঠীকে শূদ্র বলা হয়েছে। রাজা নন্দকেও প্রজারা পছন্দ করত না। কারণ তিনি ছিলেন নীচকুলোদ্ভব নাপিতের ঔরসজাত। তাই তিনি ঘৃণার যোগ্য।
শেষ নন্দরাজা কিংবা চন্দ্রগুপ্তের ধমনীতে শূদ্ররক্ত প্রবাহিত ছিল কি না তা নিশ্চয় গবেষণার বিষয় হতে পারে। কিন্তু মৌর্যরা যে শূদ্রবংশীয় ছিলেন, তা ভারতীয় লেখকরাই লিখে গেছেন। ব্রাহ্মণদের দ্বারাই মৌর্যরা উৎপাটিত হয়েছিল। শূদ্র তো ছাড়, ক্ষত্রিয়দের পিছনেও ব্রাহ্মণরা আদাজল খেয়ে লেগেছিল। সেইকাল থেকেই ব্রাহ্মণদের উপর ক্ষত্রিয়দের ঘৃণার সূত্রপাত হয়েছিল। ব্রাহ্মণদের উপর ঘৃণার জন্য ক্ষত্রিয়রা পর্যন্ত বৈদিক ধর্ম পরিত্যাগ করেছিল। ক্ষত্রিয় ও ব্রাহ্মণদের মধ্যে দীর্ঘ সংগ্রাম এবং জৈন ও বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তর ব্রাহ্মণদের বড়োই বিচলিত করে তুলেছিল। ক্ষত্রিয়ের আধিপত্য ধ্বংস করার জন্য ব্রাহ্মণরা যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। সেসব কাহিনি আমরা রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণগুলিতে পাই। এইসব গ্রন্থে আমরা দেখতে পাই, ব্রাহ্মণদের ষড়যন্ত্রে কীভাবে ক্ষত্রিয়কুল ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে। ব্রাহ্মণপ্রবর কৌটিল্যের ‘অর্থশাস্ত্র’ গ্রন্থে এইসব কার্যের সমর্থন প্রকাশ পেয়েছে। যে সময় ক্ষত্রিয়রা ঘৃণাভরে দলে দলে বৈদিক ধর্ম ত্যাগ করতে থাকল, তখন ধুরন্ধর এক শ্রেণির বুদ্ধিজীবী ব্রাহ্মণ নতুন এক অস্ত্র বা পথের সন্ধান করতে থাকল। সেই পাওয়াও গেল। ব্রাহ্মণপ্রবর কৌটিল্য (চাণক্য) শূদ্রদেরকেই অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করলেন। সামশাস্ত্র মতে, আর-এক ব্রাহ্মণপ্রবর ভরদ্বাজ বলেন, সুযোগ পেলে ব্রাহ্মণ মন্ত্রীরা ক্ষত্রিয় শাসন অপসারণ করে ব্রাহ্মণ অধ্যুষিত শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করা যেতে পারে। কিন্তু বিচক্ষণ কৌটিল্য সেই মত গ্রহণ করলেন না। কৌটিল্য চন্দ্রগুপ্তের মতো অসভ্য’ শূদ্র-সর্দারদের রাজারূপে হাজির করলেন। পুরাণগুলো থেকে জানা যায়, মহাপদ্ম নন্দের পর ক্ষত্রিয়কুল নির্বংশ হয়। এরপর ‘পৃথিবীর রাজারা শূদ্রবংশীয় ছিল’ (বিষ্ণুপুরাণ ৪, ২৪)। সামশাস্ত্রী বলেন– এটা অস্বীকার করা যায় না যে, বিরুদ্ধবাদী ক্ষত্রিয় রাজাদের দ্বারা অত্যাচার ও উৎপীড়নের যন্ত্রণায় বিতারিত হয়ে ব্রাহ্মণরা শূদ্রবংশীয় জংলি সর্দারদের সাহায্য গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। সেই সুযোগে জংলি কৌম দলপতিরা অনেকে আর্যরাষ্ট্রে রাজা হয়ে যান। এইভাবে শূদ্রদের সাহায্য নিয়ে এক ক্ষত্রিয় জাতি ধ্বংস করে অন্য ক্ষত্রিয় জাতির সৃষ্টি করে। সেই সত্যকে একটু ঘুরিয়ে পরশুরামের পৃথিবীকে ২১ বার নিঃক্ষত্রিয় করার কাহিনি উপস্থাপন করা হয়েছে।
