সারা পৃথিবীতে (বিশেষ করে ভারতে) উভলিঙ্গ মানবদের প্রাপ্য অধিকার ও মানুষ হিসাবে পুনর্বাসনের জন্য বিশেষ আইনের খুব প্রয়োজন, সনাতন লৈঙ্গিক বলয় ভাঙারও প্রয়োজন। ঘৃণা নয়, অবজ্ঞা নয়– শুধু মানুষ পাক মানুষের সম্মান। সার্বিক উন্নতির জোয়ারে প্লাবিত হলেও আমরা এখনও পুরোপুরি বিজ্ঞানমনষ্ক হয়ে উঠতে পারিনি। আমাদের দেশে কিছুদিন আগেও সমকামিতা নিষিদ্ধ বিধায় হিজড়াদের যৌনজীবন ছিল অপ্রতিষ্ঠিত। ভাবলে তখন অবাক লাগে যখন দেখি মানুষের যৌনজীবনে রাষ্ট্র নাক গলায়। একটা রাষ্ট্র বলে দেবে একজন মানুষ কীভাবে, কখন যৌনমিলন করবে? একটা রাষ্ট্র বলে দেবে একজন মানুষ যৌনসঙ্গী বা সঙ্গিনীর সঙ্গে কীরকম যৌনাচরণ করবে? রাষ্ট্র বলে দেবে কে মুখমৈথুন করবে, কে পায়ুমৈথুন, কে উরুমৈথুন করবে, কে স্তমৈথুন করবে, কে জননাঙ্গমৈথুন করবে? এসব কি রাষ্ট্রের নির্দেশের অপেক্ষায় থাকে নাকি মানুষ? রাষ্ট্র সেখানেই নাক গলাতে পারে যেখানে যৌনমিলনের নামে অত্যাচার চলে, জোরজবরদস্তি চলে। যদি যৌনসঙ্গীর কেউ একজন তেমন অভিযোগ করে যে তাঁকে দিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বিশেষ যৌনাচরণে বাধ্য করাচ্ছে। তা সে সমকামীদের ক্ষেত্রেই হোক, কিংবা বিপরীতকামী। এই যে সমকামীরা লোক দেখা নেই জন দেখা নেই যাকে-তাকে সমকাম করার জন্য বিরক্ত করে মারে– এটা অবশ্যই দণ্ডনীয় অপরাধ হওয়া উচিত, সাধারণ নারী-পুরুষের যৌনতা সংক্রান্ত দণ্ডবিধিতে যেমন শাস্তির বিধান আছে। তাই বলে সমকামকে স্বীকৃতি দিলে পায়ুমৈথুনকে স্বীকৃতি দিতে হবে, সেই কারণে সমকাম নিষিদ্ধ –এ যুক্তি কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। সমকাম এবং সমকামীদের স্বীকৃতি দিলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যাবে? স্বীকৃতি দিলে পৃথিবীর সকলে লাইন দিয়ে সমকামী হয়ে যাবে? যদি তর্কের খাতিরে ধরেই নিই পৃথিবীর সকলে সমকামী হয়ে যাবে, তাতে কার কী এসে যাবে? সূর্য কি পশ্চিমদিক থেকে উঠতে শুরু করে দেবে? সন্তানের জন্ম? বিপরীতকামীদের মধ্যে কত হাজার হাজার দম্পতি সন্তানের জন্ম দিতে অপারগ, সে কারণে কি পৃথিবী রসাতলে চলে গেছে? খুবই অবাক লাগে মানুষের ব্যক্তিগত গণ্ডীর কামনা-বাসনা যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার জালে আটকে থাকে এবং তাঁদের স্বীকৃতির অপেক্ষায় ধুকে ধুকে মরে। চিলেকোঠার খাঁচায় ডানায় গুলিবিদ্ধ অবস্থায় অসুস্থ হয়ে যেই পাখিটি এখনও কাতরাচ্ছে সেও স্বপ্ন বুনে আকাশে পুনরায় ডানা মেলার। তারও পূর্ণ অধিকার আছে ফিরে যাওয়ার তার জগতে। লাঞ্ছনা, বঞ্চনার জগত থেকে নানা প্রতিবন্ধকতার মাঝেও অস্তিত্বের বৈধতার সংগ্রাম করে চলছে হিজড়ারা। হাজার হাজার শিখণ্ডী চোখের দ্যুতির মাঝে স্বপ্ন লালন করে চলছে সম্মান ও সমৃদ্ধির জীবনের, একটি ঘর-সংসারের।
আজ অনিবার্য হয়ে উঠেছে হিজড়াদের তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার মানবিক দাবিটাও। রূপান্তরী মানবী বন্দ্যোপাধ্যায় চাকরিস্থলে তৃতীয় লিঙ্গ হিসাবে আইডেন্টটি করেছেন। ৩৭৭ নম্বর ধারার কবলে পড়ে আমার যে সমস্ত ভাই-বোন-বন্ধুরা যৌন-অবদমিত হয়ে বন্দিদশায় দিন কাটাচ্ছেন আমি বিপরীতকামী হয়েও তাঁদের পাশে থাকার ইচ্ছা প্রকাশ করি। তাঁদের মানসিক যন্ত্রণা আমি উপলব্ধি করি। আমি তাঁদের যৌনভাবনাকে সম্মান করি, সমর্থনও করি। কারণ আমি মনে করি ওদের যৌনচেতনা প্রাকৃতিকই। যৌন-প্যাশানে আমাদের মতো নিশ্চয় নয়, ওদের মতো তো বটেই! ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সমকামীদের দাবি অন্যায্য বলেছেন একদা। বস্তুত সুপ্রিম কোর্টের এই রায় মানুষের মৌলিক অধিকারে হস্তক্ষেপের সমতুল। মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত পরিসরে এ ভাবে ঢুকে পড়ার অধিকার বিচারব্যবস্থারও থাকতে পারে নাকি! প্রান্তবয়স্ক দুজন মানুষ তাঁদের যৌনজীবনে কী কী স্বাধীনতা নেবেন সে ব্যাপারে কেন মন্তব্য করবে আদালত? তাঁদের মতো করে যৌনতা করলে কেন সমকামীদের শাস্তি দেওয়া হবে? একজন পুরুষ নারীকে আদর না-করে কোনো পুরুষকে আদর করলে কিংবা একজন নারী যদি পুরুষকে আদর না করে কোনো নারীকে আদর করে, তবে তাঁদের জেল দিতে হবে? এটা কেমনতর অপরাধ! এর বিরুদ্ধে শুধু সমকামীরা নয়, প্রতিবাদ করা উচিত সমাজের সর্বস্তরের মানুষদের। আইনি বিশেষজ্ঞেরা স্পষ্টই বলছেন, সংবিধানের ১৪, ১৫ ও ২১ ধারা ব্যক্তি মানুষের যে সমানাধিকার ও স্বাধীনতাকে স্বীকৃতি দেয়, সুপ্রিম কোর্টের এই রায় তার পরিপন্থী। এটা তো একটা ব্যক্তিগত পছন্দ অপছন্দের বিষয়। সেই পছন্দ তো অন্য কেউ করে দিতে পারে না। তবে হ্যাঁ, শুধু সৃষ্টি অর্থাৎ সন্তানধারণই যদি হয় ভালোবাসার সংজ্ঞা হয়, তা হলে তো অনেক কিছুই অস্বাভাবিক। শীর্ষ আদালত ভারতীয় দণ্ডবিধির যে ধারাকে সাংবিধানিক বলে বহাল রেখেছে, তা কেবল মাত্র পুরুষ বা নারীর সমকামিতার কথা বলে না। সেখানে বিষমকামিতার কথাও বলা আছে। সে ক্ষেত্রে ওরাল সেক্স ও অ্যানাল সেক্সও কিন্তু অপরাধযোগ্য। কারণ তাতে সৃষ্টির কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই ভালোবাসা বা প্রেমের একমাত্রিক অভিমুখের বাইরে কিন্তু দণ্ডমুণ্ডের কর্তারা ভাবছেন না।
১৬৩ বছর আগে ব্রিটিশ ভারত একে অপরাধ বলে গণ্য করেছিল। তার আগে পর্যন্ত কিন্তু সমকামিতা নিয়ে ভারতীয় সমাজে সেভাবে কোনো হেলদোল ছিল না। প্রাচীন বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ভারত যেখানে চিন্তার দিক থেকে এতটা অগ্রসর ছিল, তা হলে একবিংশ শতকে দাঁড়িয়ে কেন সুপ্রিম কোর্টের এহেন রায়? কেন পুরুষের সঙ্গে পুরুষ বা মহিলার সঙ্গে মহিলার সম্পর্ককে এখনও ‘প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধাচারণ ভাবা হচ্ছে? সুপ্রিম কোর্টের রায় বলছে— তাঁরা ভরসা করেছে ১৮৬০ সালের মেকলের ব্যাখ্যাকেই। তিনি বলেছিলেন, ‘যৌনতা সৃষ্টির জন্য, কোনো বিনোদনের জন্য নয়। এ ধরনের সম্পর্ক থেকে কোনও সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। কাজেই এই সম্পর্ক প্রাকৃতিক নয়। শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তার মানে সৃষ্টি হয়ে গেলে যৌনমিলন বন্ধ দেওয়া উচিত, তাই নয় কি? কন্ডোম বা অন্যান্য জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতিগুলি ব্যবহার করে যৌনমিলন করার উদ্দেশ্য তো বিনোদনই। পাঠক ভালো করে লক্ষ করুন এই লাইনটি– “যৌনতা সৃষ্টির জন্য, কোনো বিনোদনের জন্য নয়। এ ধরনের সম্পর্ক থেকে কোনো সৃষ্টির সম্ভাবনা নেই। কাজেই এই সম্পর্ক প্রাকৃতিক নয়।” যৌনতা সৃষ্টির জন্য? কবে থেকে? বাজারে, থুড়ি আমাদের মনুষ্যসমাজে এমন একটা কথা চালু আছে বইকি। আমিও শুনেছি। হিপোক্রাসি, জাস্ট হিপোক্রাসি। ভণ্ডামি। দেখো, আমরা মানবজাতি কী মহান উদ্দেশ্যই-না যৌনক্রীড়া করি, এটা বোঝাতেই বোধহয় এই গপ্পো সমাজে ছড়িয়ে আছে। যখন বা যেদিন যে আদি মানব-মানবীটি প্রথম যৌনক্রীড়া করেছিল সেটাই তো ছিল স্রেফ যৌনতাড়না। ওরা সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া করেছে বলে কোথাও উল্লেখ পাইনি। শিবপুরাণে শিব-পার্বতীর যে দীর্ঘ সময় একটানা যৌনক্রীড়ার বর্ণনা পাওয়া যায় তাতে কোনো সৃষ্টির কাহিনি বর্ণিত নেই। বরং সৃষ্টি স্তব্ধ হয়ে যাবে এই আতঙ্কে স্বয়ং বিষ্ণু শিব-পার্বতীর বেডরুমে শুকপাখিকে পাঠিয়ে দেয় তাঁদের যৌনক্রীড়া ঘেঁটে দেওয়ার জন্য।
