১১ ডিসেম্বর, ২০১৩ সালের এক রায়ে সুপ্রিম কোর্ট সমকামিতাকে অপরাধ বলেই গণ্য করতে বলে। দেশের সর্বোচ্চ আদালত জানান, ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী সমকামিতা দণ্ডনীয় অপরাধ। যতক্ষণ না সংসদ আইন করে এই ধারা লোপ করছে ততক্ষণ সমকামিতা আইনত অপরাধই থাকছে। এর আগে ২০০৯ সালে দিল্লি হাইকোর্ট ৩৭৭ ধারার বিরুদ্ধে রায় দিয়েছিল। ওই রায়ে বলা হয়েছিল, ভারতীয় দণ্ডবিধির এই ধারাটি বৈষম্যমূলক এবং মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। দিল্লি হাইকোর্টের এই রায়ের সুবাদেই সমকামী এবং রূপান্তরকামীরা তাঁদের অধিকার অর্জনের পথে এগিয়েছিলেন বলে দাবি করতেন। সুপ্রিম কোর্টের এই বক্তব্য সেই এলজিবিটি আন্দোলনকারীদের পক্ষে বড়ো ধাক্কা। শীর্ষ আদালতের বেঞ্চের বক্তব্য– “৩৭৭ ধারা বাতিল নয়। ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী সমকামিতা দণ্ডনীয় অপরাধ, সাজা হতে পারে যাবজ্জীবন পর্যন্ত।”
কী আছে ৩৭৭ নম্বর ধারায়? একটু দেখে নেওয়া যাক– “Unnatural offences– whoever voluntarily has carnal intercourse against the order of nature with any man, women or animal, shall be punished with imprisonment for life, or with imprisonment of either description for a term which may extend to ten years, and shall also be liable to fine. Explanation– Penetration is sufficient to constitute the carnal intercourse necessary to the offence described in this section.”
প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশেও দণ্ডবিধির ৩৭৭ ধারা অনুযায়ী, যে ব্যক্তি স্বেচ্ছাকৃতভাবে কোনো পুরুষ, নারী বা জন্তুর সঙ্গে, প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধে যৌন সহবাস করে সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে বা যে-কোনো বর্ণনার কারাদণ্ডে— যার মেয়াদ দশ বছর পর্যন্ত হতে পারে— দণ্ডিত হবে এবং তদুপরি অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবে। এই ধারায় অস্বাভাবিক অপরাধের শাস্তির বিধান করা হয়েছে এবং তা অবশ্য প্রাকৃতিক নিয়মের বিরুদ্ধভাবে হতে হবে। যদিও প্রাকৃতিক নিয়ম বিরুদ্ধ যৌন সহবাসের সর্বজনীন স্বীকৃত সংজ্ঞা এখনও নির্ণীত হয়নি।
বর্তমানে বহু সমকামী সেক্সচেঞ্জ করে বিয়ে করে ঘর-সংসার করছে। আসুন, দেখে নিই দেশে দেশে সমকামী ও সমকামীদের আইনি অবস্থান :
নেদারল্যান্ডস : ২০০১ সালে বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে নেদারল্যান্ডস্ সমকামী বিয়ে বৈধ ঘোষণা করে।
ইংল্যান্ড : ২০১৩ সালের জুলাই মাসে সমকামী বিয়ে বৈধ করে আইন পাস হয়।
ফ্রান্স : ২০১৩ সালের মে মাসে সমকামী বিয়ের বৈধতা দেওয়া হয়।
লুক্সেমবার্গ : ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসে সমকামী বিয়েকে বৈধতা দেওয়া হয়।
আয়ারল্যান্ড : বিশ্বের প্রথম দেশ হিসাবে আয়ারল্যান্ড ২০১৫ সালের মে মাসে গণভোটের মাধ্যমে সমকামী বিয়েকে বৈধ করা হয়।
ইউরোপের অন্যান্য দেশ : ২০০৩ সালে বেলজিয়াম, ২০০৫ সালে স্পেন, ২০০৯ সালে নরওয়ে ও সুইডেন, ২০১০ সালে পোর্তুগাল ও আইসল্যান্ড, ২০১২ সালে ডেনমার্ক, ২০১৪ সালে ফিনল্যান্ড এবং ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসে গ্রিসে সমকামী বিয়ের বৈধতা দেওয়া হয়।
দক্ষিণ আফ্রিকা : আফ্রিকা মহাদেশের একটি দেশ দক্ষিণ আফ্রিকায় ২০০৬ সালে থেকে সমকামী বিয়ে বৈধ।
আর্জেন্টিনা : লাতিন আমেরিকার প্রথম দেশ হিসাবে ২০১০ সাল থেকে সমকামী বিয়ে বৈধ।
ব্রাজিল : ২০১০ সাল থেকে সমকামী বিয়ে বৈধ।
যুক্তরাষ্ট্র : ২০১৫ সালের জুন মাসে গোটা যুক্তরাষ্ট্র জুড়ে সমকামী বিয়ে বৈধ ঘোষণা করে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট।
নিউজিল্যান্ড : এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের একমাত্র দেশ নিউজিল্যান্ডে ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে সমকামী বিয়ে বৈধ করা হয়।
এছাড়া মেক্সিকো (২০০৯), উরুগুয়ে (২০১৩), স্কটল্যান্ড (২০১৪), গ্রিনল্যান্ড (২০১৫), কলম্বিয়া (২০১৬), অস্ট্রেলিয়া (২০১৭), মালটা (২০১৭), অস্ট্রিয়া (২০১৭), এবং জার্মানে (২০১৭) সমকামী বিয়ে বৈধতা পায়।
পরিশেষে বলব– সাধারণ মানুষের কাছে এরা প্রান্তিক, এরা হিজড়া অথবা সমকামী। তাই এদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাজনিত উৎকণ্ঠা ও উদবেগ খুব সাধারণভাবেই লক্ষ করা যায়। দ্বৈতসত্ত্বার টানাপোড়েনে খোজারা জর্জরিত। এঁদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা যেমন প্রকট, তেমনি হীনমন্যতা কুরে কুরে খায়। বেশিরভাগ খোজাই যেহেতু পরিস্থিতির চাপে লিঙ্গ কর্তন করে হিজড়া সম্প্রদায়ের বাসিন্দা হয়, তাই তাঁরা এ জীবন সহজভাবে মেনে নিতে পারে না। উৎকণ্ঠা চেপে ধরে ক্রমাগত, প্রতি মুহূর্ত। হিজড়ারা মূলত সমকামী –একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, সুস্থ যৌনজীবনে এঁরা অক্ষম বলেই সমকামী মানসিকতার শিকার। সেই কারণেই তথাকথিত পরিশীলিত সমাজের মানুষেরা এদের নারীর বিকল্প হিসাবে ভাবে। এই উপেক্ষিত হিজড়ারা মূলস্রোতের মানুষদের কাছ থেকে স্নেহ-ভালোবাসা-সম্মান পাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে। বিনিময়ে মূলস্রোতের মানুষেরা এদেরকে কৌতুকের বস্তু মনে করে, হিজড়া আর জোকার যেন সমার্থক। তার উপর এঁদের সম্বন্ধে বিপুল অজ্ঞতার কারণে দূরত্ব বেড়েই চলেছে। আর এই অজ্ঞতার ফলেই এদের নিয়ে চটুল রসিকতা। ছেলেছোকারা এঁদের দেখলেই “এই আমারটা একটু চুষে দিবি?” বলে লেগপুলিং করে। এদেরকে মানবিক আন্তরিকতা ও সহানুভূতির সঙ্গে দেখার কথা কেউ ভাবতে পারে না। নানা রকমের কটুক্তি, কু-ইঙ্গিতের মধ্যে দিয়ে সাধারণ মানুষ এদের উত্যক্ত করে, উত্তেজিত করে। সমাজের অনেকেই হিজড়াদের ‘অশুভ শক্তি ভাবে। আবার কেউ কেউ অশুভ বা অপয়া তো নয়ই, উলটে শুভ বা পয়া ভাবে। কারোর কারোর মধ্যে হিজড়াদের শ্রদ্ধা করার রেওয়াজও আছে।
