বিপরীতকামীরা যদি বলেন তারা শুধুই সৃষ্টির জন্যই যৌনক্রীড়া করেন, তা করুন না। সমকামীদের যৌনতায় যদি কিছু সৃষ্টি না হয় তাতে বিপরীতকামীদের অসুবিধাটা কোথায়? ওরা তো কারোর পাকা ধানে মই দিচ্ছে না! আপনি বা আপনারা বা আদালত বা রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিন বা না-দিন তাতে তো ওদের সৃষ্টিহীন যৌনতা বন্ধ থাকবে না। পৃথিবীও রসাতলে যাবে না– স্বীকৃতি দিলেও না, স্বীকৃতি না দিলেও না। আপনার পছন্দ নয় বলে তো বিকল্প যৌনতা মিথ্যা হয়ে যাবে না। আপনার পছন্দ নয় বলে আপনি কোনো একজনের জীবনও বিপন্ন করে তুলতে পারেন না। সেই অধিকার আপনার। নেই। মনে রাখবেন, বিপরীতকামীদেরই সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যৌনতার ফলে যে হাজার হাজার সন্তান পিতৃমাতৃপরিচয়হীন হয়ে অনাথ আশ্রমগুলিতে অনাদরে অসহায় হয়ে আছে, প্রয়োজন হলে ওই সমকামী দম্পতি সেইসব সন্তান দত্তক নিয়ে বাবা-মা হওয়ার অহংকারে অহংকারী হবেন। আমিও চাই সমকামী দম্পতিরা সন্তান দত্তক নিয়ে পিতা-মাতার সাধ মেটাক।
সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া, বিনোদনের জন্য নয় –এই বক্তব্যের সমর্থনে কোনো দৃষ্টান্তই আমি উপস্থাপন করতে পারছি না। মানুষ মূলত উদ্ধৃঙ্খল যৌনাচারকে শৃঙ্খলিত-বৈধতা দেওয়ার জন্যই বিবাহ নামক প্রতিষ্ঠানের সৃষ্টি করেছিল। শুধু বৈধ যৌনতাই নয়, সন্তানের পিতৃ-পরিচয় নিশ্চিত করতেও বিবাহের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। মানুষ শুধুমাত্র সৃষ্টির জন্যই যৌনতা করে না, করে না-বলেই মানুষের জন্য যৌনক্রীড়ার সময় ৭ X ২৪ x ৩৬৫ দিনই। সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া করে না, তাই অনেক অবিবেচক পাষণ্ড মানুষ ঋতুচক্র চলাকালীনও মিলিত হন। সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া করে না-বলেই গর্ভবতী হয়ে পড়লেও যৌনক্রীড়া বন্ধ করে না। সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া করে না-বলেই অনেকে বিবাহ বহির্ভূত যৌনতা করে থাকে। সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া করে না-বলেই অনেক নারী বা পুরুষ একাধিক পুরুষ বা নারীর সঙ্গলাভের প্রত্যাশা করে। মানুষ সৃষ্টির জন্য যৌনক্রীড়া করে না-বলেই সারা পৃথিবী জুড়ে গণিকাপল্লি বা। গণিকাবৃত্তির এত রমরমা। গণিকাপল্লিতে কেউ নিশ্চয় সৃষ্টি করতে যায় না! প্রতিদিন সকালে খবরের কাগজের পাতায় যৌন কেলেঙ্কারীর খবরগুলি আমরা পাই সেগুলি নিশ্চয় সৃষ্টির জন্য বলবেন না। এত যে ধর্ষণকাণ্ড (জোরপূর্বক যৌনক্রীড়া) ঘটে যায় গোটা পৃথিবী জুড়ে প্রতিদিন কোথাও-না-কোথাও, তা কি সৃষ্টির জন্য? তবে প্রাচীনকালে নিয়োগ প্রথার মাধ্যমে শুধুমাত্র সন্তান সষ্টির জন্যই যৌনমিলন করতে হত। এটি ছিল বিশেষ শর্তসাপেক্ষ যৌনমিলন। পাণ্ডবের পাঁচজন, কৌরবদের ১০১ জন, কর্ণ, রাম-লক্ষ্মণ-ভরত-শত্রুঘ্ন প্রমুখরা তো নিয়োগ প্রথারই ফসল। এই ব্যতিক্রমী যৌনমিলনগুলি অবশ্যই শুধুমাত্র সৃষ্টির জন্য ছিল। এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
একটা সুস্থ মানুষ তার সমগ্র জীবনে (কমবেশি) ১০,০০০ থেকে ১১,০০০ যৌনদিবস (নিশি?) পান। তার মধ্যে মাত্র ৩০ দিন থেকে ৯০ দিন সৃষ্টির জন্য ব্যয় করেন। বাকি যৌনক্রীড়ার দীর্ঘ দিনগুলি শুধুই যৌনানন্দ বা যৌনবিনোদন বা যৌনসুখের জন্য অতিবাহিত করে থাকে। তাই পাত্র বা পাত্রী যৌনক্রীড়ায় অক্ষম হলে কোনো ক্ষমা নেই। সোজা ডিভোর্সের মামলা। সন্তান উৎপাদনে অক্ষম হলে ডিভোর্স হয় কি না আমার জানা নেই, তবে পাত্র বা পাত্রীর যে কেউ একজন যৌনক্রীড়ায় অক্ষম হলে এক লহমায় সম্পর্ক শেষ। যে যুগে মানুষের যৌনক্রীড়া মানেই অনিবার্য সন্তানের জন্ম হত, সে যুগে মানুষ নিশ্চয় খুব অসহায় ছিল। সেই অসহায়ত্ব থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য জন্মনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা আবিষ্কৃত হল। মানুষের সেই অসহায়তা এখন সম্পূর্ণ বিলুপ্ত। সারা পৃথিবী জুড়ে রক্তপাতহীন বিপ্লব ঘটে গেল। বাজারে এখন হাজারটা জন্ম নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা সুলভে পাওয়া যায়, যার যার সুবিধামতো। এইসব প্রোডাক্টের বিক্রিবাটাও ব্যাপক। এমন কি স্রেফ যৌনসুখ করতে গিয়ে সন্তান যদি এসেও যায় সমূলে বিনাশ করার তারও ব্যবস্থা পর্যাপ্ত মজুত আছে। সন্তানহীন (পড়ুন সৃষ্টিহীন) যৌনসুখ পেতে মানুষ কি-না করছেন! এরপরেও কেউ যদি বলে সৃষ্টির জন্যই যৌনতা, তাহলে বলব ওসব হিপোক্রাসি ঝেড়ে ফেলে আসুন প্রান্তিক হয়ে যাওয়া মানুষের পাশে দাঁড়াই। মানুষের অধিকার রক্ষার লড়াইয়ে সামিল হই। ভারত পথ-প্রদর্শক হতে পারত, তার বদলে ভারত এখন ক্রমশ পিছন দিকে এগোতে চাইছে। একে চূড়ান্ত পশ্চাদগামী মানসিকতা’ ও ‘লজ্জা’ ছাড়া অন্য কোনও ভাষায় ব্যাখ্যা করা যায় না। ভুললে চলবে না— চোখ বন্ধ রাখলে প্রলয় থেমে থাকে না।
প্রায় ১৫০ বছর ধরে আমাদের চোখ বন্ধই ছিল। অবশেষে ২০১৮ সালের ৬ সেপ্টেম্বর চোখ খুলল সুপ্রিমকোর্টের এক ঐতিহাসিক রায়ে। সুপ্রিমকোর্ট স্পষ্ট করে জানিয়ে দিলেন –“Gay sex is not a crime. Gay sex is legal in India now.”। সুপ্রিমকোর্টের প্রধান বিচারপতি দীপক মিশ্রের মন্তব্য– “পুরোনো ধ্যানধারণাকে বিদায় দিয়ে সমস্ত নাগরিকদের সমান অধিকার আমাদের দিতে হবে।” বিচারপতি দীপক মিশ্রের সঙ্গে সহমত পোষণ করে একই বক্তব্য রেখেছেন অন্য চার বিচারপতিও। একই সঙ্গে তাঁরা জানিয়েছেন– “ব্যক্তিগত পছন্দ স্বাধীনতার অন্যতম শর্ত। ভারতীয় সংবিধানে এলজিবিটি গোষ্ঠীর সদস্যরা বাকিদের মতো একই অধিকার পাওয়ার যোগ্য।”
