হ্যাঁ, ‘রাজা’ একটি অভ্যাসের নামই বটে। আনুষ্ঠানিক রাজতন্ত্র তো এখন বিলুপ্তপ্রায় পদার্থ। তার বদলে গণপতি গণেশের গণতন্ত্রের উত্থানের হাওয়া নতুন করে বইতে লেগেছে শ’ দুয়েক বছর ধরে। তথাপি তথাকথিত নিরক্ষর অশিক্ষিতদের জন্য মাতব্বর-চেয়ারম্যান তো লাগেই, সর্বোচ্চ শিক্ষালয়ের জন্যেও একজন বাদশাহি ভাইস-চ্যান্সেলরই লাগে। এতসব দীক্ষায়ন-প্রশিক্ষণ সত্ত্বেও কিন্তু রাজা’ এবং ‘রাজতন্ত্র’-র বৈধতা ও যুক্তিসিদ্ধতা সম্পর্কে খটকা সম্পূর্ণ দূরীভূত হয় না। মনের মধ্যে কোথায় একটা খচখচানি থেকেই যায়। খটকাটা একেবারে আদি থেকেই ছিল বৈকি। মহাভারত তার প্রমাণ। মহাভারতের যুদ্ধের পরে তাঁর সর্বগ্রহণযোগ্যতার কারণে সকলেই যুধিষ্ঠিরকে ‘রাজা’ হওয়ার জন্য অন্তহীন কাকুতি-মিনতি করেই চলেছিলেন। কিন্তু যুধিষ্ঠির ছিলেন অনড়। রাজা’ হতে চাননি তিনি মোটেও। তিনি বলছিলেন তিনি ধর্ম জগতের লোক, রাজা তিনি হতে পারবেন না। মহাভারতের ‘শান্তিপর্ব’-এর গোড়ায় অর্জুনকে তিনি বলছিলেন: “আমি রাজ্যলোলুপ হইয়াই পাপপঙ্কে লিপ্ত হইয়াছি। … অতএব আমি সমস্ত রাজ্যসম্পদ পরিত্যাগপূর্বক শোকদুঃখবিবর্জিত হইয়া অরণ্যে গমন করিব। আমার রাজ্য বা উপভোগ্য দ্রব্যে কিছুমাত্র অভিলাশ নাই। অতঃপর তুমিই নির্বিঘ্নে এই পৃথিবী শাসন করো।”
যুধিষ্ঠিরের এই একান্ত উপলব্ধির উত্তরে নিতান্তই রুষ্ট অর্জুনের বক্তব্য ছিল খুবই আক্রমণাত্মক ও সুস্পষ্ট এবং তাতে চিরন্তন ক্ষত্রিয়ধর্ম তথা কর্তৃত্বধর্মের মহাসারকথাই ফুটে ওঠে –“যদি রাজধর্মে দ্বেষ প্রকাশ করিয়া আলস্যে কালহরণ করিবেন, তবে কি নিমিত্ত ধৃতরাষ্ট্রপক্ষীয় বীরগণকে বিনাশ করিলেন? ক্ষাত্রধর্মাবলম্বী ব্যক্তিরা মিত্রের প্রতিও ক্ষমা, অনুকম্পা, কারুণ্য বা অনৃশংসতা প্রকাশ করেন না। … ক্ষত্রিয়গণ হিংসাৰ্থই জন্মগ্রহণ করেন। হিংসাই তাঁহাদের একমাত্র অবলম্বন, সুতরাং সেই সহজ-হিংসাধর্মের ও তাঁহার সৃষ্টিকর্তার নিন্দা করা ক্ষত্রিয়ের নিতান্ত অকর্তব্য।” (মহাভারত, ২০০১ সালে প্রকাশিত কলকাতার ‘তুলিকলম প্রকাশনী’-র রাজ-সংস্করণ)।
ক্ষত্রিয়/শাসক/রাজনীতিবিদ এবং তাঁদের শাসনযন্ত্র তো আজকের দিনেও এমনকি বন্ধুর প্রতিও “ক্ষমা, অনুকম্পা, কারুণ্য বা অনৃশংসতা” প্রকাশ করে, তা তো সমকালীন জাতীয় আন্তর্জাতিক রাজনীতির দিকে তাকালেই জলজ্যান্ত বোঝা যায়। রাজনীতিতে চিরস্থায়ী শত্রু-মিত্র বলে কিছু নেই’ জাতীয় কথা তো আর এমনিতেই রটেনি! আদি ক্ষত্রিয় অর্জুন থেকেই এইসব ধারণার উৎপত্তি। কিন্তু যুধিষ্ঠির তাঁর কথায় অনড়। রাজা হওয়ার যুক্তিপ্রণালী কিছুতেই তাঁর গ্রাহ্য হয় না –হওয়ার কথা না বলেই।
শেষপর্যন্ত রাজ-রাজত্বের যুক্তিসিদ্ধতা কীসের উপরে দাঁড়াচ্ছে সেটাই আপাতত আমাদের দেখার বিষয়। তো অর্জুনের যে নিজের ক্ষত্রিয়ধর্ম নিয়ে গর্ব, সেই গর্ব নিয়ে ‘দেবত্ব’ অর্জন করা যায় না, ‘দেবলোকে’ যাওয়া যায় না, সে কথাই তুলে ধরেন যুধিষ্ঠির। অনেক অনেক কথার পর অর্জুনকে এক পর্যায়ে তিনি বলেন– “যে ভূমিপতি এই অখিল ভূমণ্ডল মধ্যে একাধিপত্য বিস্তার করেন, তাঁহারও এক ভিন্ন দ্বিতীয় উদর নাই। তবে তুমি কি নিমিত্ত বিপুল রাজ্যভোগের প্রশংসা করিতেছ? … অতএব তুমি অগ্রে উদরকে পরাজিত করো, তাহা হইলেই তোমার সমুদয় পৃথিবী পরাজয় করা হইবে। … রাজ্যালাভ ও রাজ্যরক্ষা এই উভয়েই ধর্ম ও অধর্ম আছে, অতএব উহা পরিত্যাগ করিয়া মহম্ভার হইতে বিমুক্ত হও। … যাহাদের বর্ণ ও আশ্রমাদির অভিমান থাকে, তাঁহারা পিতৃলোক, আর যাহারা অভিমানশূন্য, তাহারা দেবলোকে গমন করিয়া থাকে।”
কী সাংঘাতিক কথা। দেখা যাচ্ছে, বর্ণপ্রথার শ্রেষ্ঠত্বের ধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে যে রাজতন্ত্র, খোদ সেই “বর্ণ ও আশ্রমের অভিমান” যুধিষ্ঠির আর বহন করতে প্রস্তুত নন। আর এই অভিমান না-থাকলে যে ‘রাজত্ব’-ই অর্জন করতে পারে না, সেই গুরুতর সত্যের প্রতিও এভাবে তিনি বিকালের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করে বসে থাকেন। রাজত্ব’ অর্জনের চেয়ে ‘দেবত্ব অর্জনের দিকেই তাঁর ঝোঁক। ফলত তাঁর শোক, আক্ষেপ, অনুতাপ ও পাপবোধ কিছুতেই প্রশমিত হয় না, বারংবার উথলে উঠতে থাকে। বেদব্যাসের কাছে তিনি অতঃপর এই ভয়াবহ সত্য উচ্চারণ করতে ছাড়েন না যে, ‘রাজা’ এবং ধর্ম, ‘রাজত্ব’ ও ‘ধর্মবোধ’ আসলে পরস্পরের বিরোধী –“ধর্মচর্যা ও রাজ্যরক্ষা এই উভয় পরস্পর বিরুদ্ধ, অতএব এক ব্যক্তি কীরূপে ধর্মরক্ষা ও রাজ্যভার গ্রহণ করিতে পারে, নিরন্তর এই চিন্তা করিয়া আমি মোহে বারংবার অভিভূত হইতেছি।”
নকুল-সহদেব-দ্রৌপদী-ভীমের এবং ঋষি দেবস্থান ও মহর্ষি ব্যাসদেবের এবং সর্বোপরি স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণের বহু বহু প্রকার, উপযুপরি, অনুরোধ-উপরোধ-যুক্তি তর্ক-দৃষ্টান্ত ও উত্তেজনা-উক্তি এবং বিশেষত মহর্ষি বৈশম্পায়ন বেদব্যাস কর্তৃক প্রায়শ্চিত্ত পাওয়ার উপায় বর্ণনার পর যুধিষ্ঠির অবশ্য রাজা হিসেবে অভিষিক্ত হন। কিন্তু সংশয় শোক তাঁর পিছু ছাড়ে না কিছুতেই। তখন বহু কিছুর পর মহর্ষি বৈশম্পায়নের পরামর্শে সবাই মিলে তাঁকে নিয়ে যান ‘সর্বজ্ঞ ধর্মবেত্তা’ “কুরুকুলপিতামহ বৃদ্ধ ভীষ্মের নিকট’ যুধিষ্ঠিরের ‘ধর্মগত সংশয় নিরাকরণ’ করার জন্য, সবিস্তারে রাজধর্ম সম্পর্কে জানার জন্য। সেখানে ভীষ্ম কর্তৃক নানারকম রাজধর্মবন্দনা এবং রাজার কর্তব্য-অকর্তব্য প্রভৃতি শোনার পরও যুধিষ্ঠির সংশয়মুক্ত হন না; বরং তিনি এবার সেই মোক্ষম, একেবারে গোড়ার প্রশ্নটি উত্থাপন করেন– “পিতামহ! রাজা’ এই শব্দটি কীরূপে সমুৎপন্ন হইল? রাজার হস্ত, গ্রীবা, পৃষ্ঠ, মুখ, উদর, শুক্র, অস্থি, মজ্জা, মাংস, রক্ত, নিঃশ্বাস, উচ্ছ্বাস, প্রাণ, শরীর, বুদ্ধি, ইন্দ্রিয়, সুখ, দুঃখ, জন্ম ও মরণ যেরূপ, প্রজাগণেরও তদ্রূপ। তবে রাজা কীরূপে একাকী অসংখ্য বিশিষ্টবুদ্ধি মহাবলপরাক্রান্ত পুরুষের উপর আধিপত্য করিয়া সমুদয় পৃথিবী পালন করিতে সমর্থ হয়েন? সকল লোকে কি নিমিত্ত রাজার প্রসাদলাভের আকাঙ্ক্ষা করে?” এ প্রশ্ন তো চিরন্তন স্বাধীনতাপরায়ণেরই বটে। ‘রাজা’র এবং প্রজা’-র মধ্যে কী এমন দৈহিক-প্রাকৃতিক পার্থক্য আছে যে, একজন মাত্র ব্যক্তি কোটি কোটি মানুষের ‘রাজা হয়ে বসে থাকেন? আর লোকে তাঁকে মানেই-বা কী কারণে? গুরুতর এই প্রশ্নের উত্তরে ভীষ্মদেব কিছুই লুকান না, ফাঁস করে দেন রাজতন্ত্রের গোড়ার গুমোর।
