একটু ভিন্ন আঙ্গিকে হলেও, এমনকি ‘রাজা’-দের দিক থেকে হলেও মহাজ্ঞানী ভীষ্মদেব সেই স্মৃতিকথা অত্যন্ত সুস্পষ্ট ভাষায় বয়ান করেন কুরুক্ষেত্রের মহাযুদ্ধ-পরবর্তী কলিযুগের আদি রাজা যুধিষ্ঠিরের কাছে। এই পৃথিবীর আদিতে যে অরাজ ছিল তার এবং সেই অরাজকে বলপ্রয়োগ ও শাস্ত্রপ্রয়োগের মাধ্যমে উচ্ছেদ করে প্রতিষ্ঠিত হয় নয়া রাজতন্ত্রের, আদি বৃত্তান্ত।
ভীষ্মদেবের কথায় যা বোঝা গেল : আদি সেই অরাজকে ভেঙে ফেলে দেবতারা যে আদি দেবতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন তা ছিল মনুষ্যশ্রমনির্ভর। মানুষের প্রদত্ত ‘হোমাদি’ স্বরূপ অন্নেই দেবতাদের গ্রাসাচ্ছাদন হতে এবং সেটাকেই দেবতারা বেদের নাম দিয়ে ‘ধর্ম’ বলে অনেক দিন পর্যন্ত চালিয়েছেন। কিন্তু মনুষ্যসমাজ এক পর্যায়ে যখন তা আর মানল না, তখন দেবকুলের মুখে এই মর্মে অন্নাভাবের হাহাকার শোনা গেল— নরলোকে আর বেদ নাই; নরলোকে আর ধর্ম নাই; সব বিনষ্ট হয়ে গেছে; মানবদিগের ক্রিয়াকলাপ উচ্ছিন্ন হওয়াতে আমাদিগের অন্নাভাব হইয়াছে’; শুধু তাই নয়, সেই অন্নাভাবের পরিণামে দেবতারা আর দেবত্বই বজায় রাখতে পারছেন না বলে ব্রহ্মার কাছে গিয়ে আক্ষেপ করছেন –“অতঃপর আমরা মনুষ্যের ন্যায় অবস্থাপ্রাপ্ত হইলাম”।
মাঝখানে একটু টুকে রাখি– ‘দেবত্ব’ বা বৈষম্য টিকিয়ে রাখার শর্তই হচ্ছে ‘প্রিভিলেজ’ বা বিশেষাধিকারতন্ত্র, অর্থাৎ অন্যের (মানুষের) শ্রমে বসে বসে খাওয়া। বসে খাওয়ার বিশেষ অধিকার’ না-থাকলে দেবতাও আর দেবতা থাকেন না, তাঁর অন্নাভাব ঘটে, তিনি মনুষ্যদশাপ্রাপ্ত হন।
তো, ব্রহ্মা যেন নরলোক থেকে বেদ ও ধর্ম ধ্বংস হতে না দেন; একটা কিছু উপায় যেন তিনি বুদ্ধি খাঁটিয়ে, ‘স্বীয় বুদ্ধিপ্রভাবে বের করেন –দেবতাগণের এই সম্মিলিত নালিশ এবং আহাজারির মুখে ব্রহ্মা তাঁদের আশ্বস্ত করেন— নো টেনশন, মুনষ্যজাতিকে আবার বেদ ও ধর্ম মানতে বাধ্য করা হবে। কিন্তু কীভাবে? রাজাপ্রথার জোরে, রাজতন্ত্রের জোরে। কিন্তু রাজতন্ত্র চলবে কীসের জোরে? রাজতন্ত্র চলে কীসের জোরে? কেন– শাস্ত্রের জোরে! স্বয়ং ব্রহ্মা সে উপায় বের করেন ‘বুদ্ধিবলে। আদিতম ‘শাস্ত্র’ রচনা করে বসেন ‘প্রজাপতি ব্রহ্মা –সৃষ্টি করেন তিনি প্রকৃষ্টরূপে জাত’ বিশেষ ধরনের মানুষকে যারা অতঃপর ‘প্রজা’ হিসাবে পরিচিত হবে।
আদিতম ‘শাস্ত্র’ আর ‘বুদ্ধিজীবী’-র সন্ধান তাহলে মহাভারতেই পাওয়া গেল –| তিনি খোদ ব্রহ্মা। জানা গেল— তাঁর কাজ হচ্ছে শাসকদের অনুকূলে বৈষম্য ও বিশোধিকারতন্ত্র টিকিয়ে রাখা –প্রজাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে এবং তাতে কাজ না-হলে শাস্ত্রের জোর, শাস্তির জোর ও ভয়ের জোর খাটানোর ‘প্রেসক্রিপশন’ দিয়ে। এভাবে অবশেষে বুদ্ধির জোরে এবং গায়ের জোরে দুর্দান্ত ও দুর্দমনীয় মানুষকে শান্ত ও দমিত করার ব্যবস্থা হলে— তাঁদেরকে এই পৃথিবীতে রাজার রাজত্ব মানানো হলে, রাজবশীভূত করা হলে আদিতম শাস্ত্রের জোরে এবং ‘দণ্ড’-ই হচ্ছে এই ভূভারতের আদিতম শাস্ত্র। আর সেই শাস্ত্র চলে রাজা এবং রাজবুদ্ধিজীবীর যুগলবন্দিতে। এবার সেই চাঞ্চল্যকর ইতিহাসের সার-বিবরণী হুবহু শোনা যাক কুরুকুলপিতামহ সর্বজ্ঞ বৃদ্ধ ভীষ্মের মুখে।
ভীষ্ম কহিলেন, “ধর্মরাজ! সত্যযুগে প্রথমে যেরূপে রাজত্বের সৃষ্টি হয়, তাহা অবহিত হইয়া শ্রবণ করো। সর্বপ্রথমে পৃথিবীতে রাজ্য, রাজা, দণ্ড বা দপ্তাহ ব্যক্তি কিছুই ছিল না। মনুষ্যেরা একমাত্র ধর্ম অবলম্বনপূর্বক পরস্পরকে রক্ষা করিত। মানবগণ এইরূপে কিছুদিন কালযাপন করিয়া পরিশেষে পরস্পরের রক্ষণাবেক্ষণ নিতান্ত কষ্টকর বোধ করিতে লাগিল। ওই সময় মোহ তাহাদিগের মনোমন্দিরে প্রবিষ্ট হইল। মোহের আবির্ভাববশত ক্রমশ জ্ঞান ও ধর্মের লোপ হইতে লাগিল এবং মানবগণ ক্রমে ক্রমে লোভপরতন্ত্র, পরধনগ্রহণতৎপর, কামপরায়ণ, বিষয়াসক্ত ও কাৰ্যাকাৰ্য্যবিবেকশূন্য হইয়া উঠিল। … নরলোক এইরূপে কুমার্গগামী হইলে বেদ বিনষ্ট ও ধর্ম এককালে বিলুপ্ত হইয়া গেল।
তখন দেবগণ নিতান্ত শঙ্কিতচিত্তে লোকপিতামহ ভগবান ব্রহ্মার শরণাপন্ন হইয়া তাঁহাকে প্রসন্ন করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলেন, “ভগবন্! লোভমোহাদি প্রভৃতি নীচবৃত্তিসমুদয় নরলোকস্থ সনাতন বেদ গ্রাস করাতে আমরা ভীত হইয়াছি। বেদ ধ্বংস হওয়াতে ধর্মও বিনষ্ট হইয়াছে। অতঃপর আমরা মনুষ্যের ন্যায় অবস্থাপ্রাপ্ত হইলাম। মানবগণ হোমাদি কার্য দ্বারা ঊৰ্দ্ধবর্ষী বলিয়া বিখ্যাত ছিল এবং আমরা বারিবর্ষণাদি দ্বারা অধোবর্ষী বলিয়া প্রসিদ্ধ ছিলাম; কিন্তু এক্ষণে মানবদিগের ক্রিয়াকলাপ উচ্ছিন্ন হওয়াতে আমাদিগের অন্নাভাব হইয়াছে। অতএব যাহাতে আপনার প্রভাবে সম্ভত এই প্রাকৃতিক নিয়ম ধ্বংস না হয়, আপনি স্বীয় বুদ্ধিপ্রভাবে তাহার সদুপায় উদ্ভাবন করুন।’
তখন ভগবান্ কমলযোনি (ব্রহ্মা) সুরগণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, “হে দেবগণ! তোমরা ভীত হইও না; আমি অচিরাত উহার উপায় চিন্তা করিতেছি।” প্রজাপতি দেবগণকে এই কথা বলে বুদ্ধিবলে একটি লক্ষ অধ্যায়যুক্ত নীতিশাস্ত্র রচনা করলেন। …ভগবান্ পদ্মযোনি ওই নীতিশাস্ত্র প্রণীত করিয়া ইন্দ্র প্রভৃতি দেবগণকে হৃষ্টমনে কহিলেন, “সুরগণ! আমি ত্রিবর্গ সংস্থাপন ও লোকের উপকার-সাধনের নিমিত্ত বাক্যের সারস্বরূপ এই নীতিশাস্ত্র উদ্ভাবন করিয়াছি। ইহা পাঠ করিলে নিগ্রহ ও অনুগ্রহ দর্শনপূর্বক লোকরক্ষা করিবার বুদ্ধি জন্মিবে। এই শাস্ত্র দ্বারা জগতের যাবতীয় লোক দণ্ডপ্রভাবে পুরুষার্থ ফলোভে সমর্থ হইবে; অতএব ইহার নাম দণ্ডনীতি হইল।”
