না, আর নয়। সারা পৃথিবী জুড়ে পুলিশ কর্তৃক ধৃতদের হত্যা করার এত ঘটনা পাওয়া যায় যে, চমকে যাওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। হাড় হিম করা সেসব কীর্তি।
“…‘নৈরাজ্য’ শব্দটার ভিতরে আছে ‘রাজা’ বিষয়ক ধ্যানধারণা। আসলে রাজ, বিরাজ, রাজ্য, রাজা, রাজন, সম্রাট, রাষ্ট্র প্রভৃতি শব্দের আদিতে আছে ‘রাজ’ নামের ধাতুটি (হরিচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৯৯৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত বঙ্গীয় শব্দকোষ, পৃষ্ঠা ১৯০৭)। এই ‘রাজ’-এর অর্থ হচ্ছে ‘শোভা’, ‘দীপ্তি’ (হরিচরণ)। এই ধাতু থেকে উৎপত্তি লাভ করা রাজ’ শব্দটির অর্থ ‘শোভা পাওয়া’, ‘দীপ্তি পাওয়া’, ‘প্রকাশ পাওয়া’, ‘বিদ্যমান থাকা’। এইভাবে ‘বিরাজ’ শব্দের অর্থ ‘শোভমান’, ‘শোভিত’, ‘দীপ্যমান’, দীপ্ত’; কিংবা শোভা পাওয়া’, ‘শোভিত হওয়া’, ‘শোভা করে অবস্থান করা’, ‘বিদ্যমান থাকা’, ‘উপস্থিত থাকা’। সম্রাট’ শব্দেরও অন্যতম অর্থ ‘রাজা’, এর গোড়ায় আছে ‘সম্ + রাজ + কিপ’, অর্থাৎ ‘যিনি মণ্ডলেশ্বর ও রাজগণের শাসক, তিনি সম্রাট। তার মানে যিনি শোভা পান, যিনি দীপ্তি পান, যিনি প্রকাশ পান, যিনি বিদ্যমান থাকেন, তিনিই হন রাজা।
কিন্তু ‘রাজা’ ছাড়া বাকি সব মানুষ কি শোভা পান না? দীপ্তি পান না? প্রকাশ পান না? বিদ্যমান থাকেন না? নিশ্চয়ই পান, নিশ্চয়ই থাকেন। কিন্তু রাজা’ ছাড়া অন্যসব লোকের শোভা, দীপ্তি, প্রকাশ, বিদ্যমানতা প্রভৃতির বিশেষ কোনো মূল্য ‘আইনত’ নেই (আইন এখানে রাজার আইন, রাষ্ট্রের আইন)। কেননা ‘রাজা’ ছাড়া অন্যসব ব্যক্তি যদিও শোভা পান, দীপ্তি পান, প্রকাশিত হন, বিদ্যমান থাকেন, তাহলে আর ‘রাজা’-র সঙ্গে সবার পার্থক্য কী থাকে?
সুতরাং, রবীন্দ্রনাথ যখন বলেন “আমরা সবাই রাজা”, তখনই আসে নৈরাজ্যের প্রশ্ন। কেননা যে রাজ্যে বা যে রাষ্ট্রে এক ‘রাজা’ ছাড়া আর কারোর অস্তিত্বের, বিদ্যমানতার, বিরাজমানতার স্বীকৃতিই নেই, সেই রাজ্য দিয়ে কার লাভ? শুধু রাজাদের লাভ। এ কথা কে না জানে, রাজতন্ত্রের সর্বনিম্নপদস্থ দায়োয়ানটিও স্থানকালপাত্র নিজের মতো নিজেই খোদ রাজা; আগাপাছতলা এই রাজাদের সিস্টেম বা বন্দোবস্ত বা তন্ত্রের নামই তো দাঁড়িয়েছে রাজতন্ত্র। রাজতন্ত্রে দাসত্ব ছাড়া আমাদের জন্য কিছু বরাদ্দ নেই। রাজাকে দেশ লিখে দাও, তারপর দেশের মালিক রাজাকে খাজনা দাও, আর রাজপেয়াদার লাঠির বাড়ি খাও– এই আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য। তাহলে তো নৈরাজ্যই ভালো। রাজতন্ত্রের বদলে অরাজতন্ত্রই ভালো।
‘রাষ্ট্র’ শব্দের উৎপত্তিও ওই একই জায়গা থেকে–’রাজ’ (হরিচরণ)। রাষ্ট্র শব্দটির গোড়ায় আছে: “রাজ + ত্র (স্ট্রন)”, যার অর্থ “রাজ্য”। আর এই যে ‘স্ট্র’ –এর অর্থ সবসময়ই কোনোকিছুর গঠন-পরিগঠনের সঙ্গে যুক্ত। মানে রাজত্ব বা বিরাজত্ব জিনিসটার যে গাঠনিক কাঠামো, তারই নাম ‘রাষ্ট্র’। আবার, ‘রাষ্ট্র’ কথাটার আরও একটা অর্থ ‘প্রচার, প্রকাশ’ (হরিচরণ)। রাজার বিরাজত্ব যখন প্রচারিত হয়, প্রকাশিত হয় এবং সবাই সে ব্যাপারে সম্মত হয়, তখনই ‘রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা লাভ করে, গ্রামময় রাষ্ট্র হয়ে যায়। এই গ্রামময় রাষ্ট্র হয়ে যাওয়ার সঙ্গেই উপরের ওই ‘এ’ কথাটার সম্পর্ক। ‘এ’ অর্থ ‘তরণ-রহন (এখনি তরিত হয়ে অন্য কোথাও চলে যাব, এই ভাব) (২০০৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত কলিম খান এবং রবি চক্রবর্তীর ‘বঙ্গীয় শব্দার্থকোষ” (ক্রিয়াভিত্তিক-বর্ণভিত্তিক শব্দার্থের অভিধান) পৃ. ৪৮৮]। তার মানে হলে, রাজা’-র একক, অদ্বিতীয় ও প্রশ্নাতীত বিরাজত্ব যখন বাকি সবাইকে ‘তরিত হয়ে কোথাও ‘রহন করে বা রহে বা স্থিতি-কাঠামো লাভ করে, তখনই তার নাম হয় রাষ্ট্র।
‘রাষ্ট্র’ জিনিসটা তার মানে নিতান্তই রাজা’-র একক ও অদ্বিতীয় বিদ্যমানতার সংস্থা। এ জিনিস কখনো জনগণের হতে পারে না। অতএব, বিদ্যমান গঠন-কাঠামোয় ‘জনগণের রাষ্ট্র’ বলে কিছু হয় না। এইজন্যই রাষ্ট্র শব্দের আরও একটা অর্থ ‘উপদ্রব, মকরাদি, দুর্ভিক্ষ (হরিচরণ)। তথাপি সভ্যতা নামক গত পাঁচ হাজার বছরের রাজতন্ত্রে-শাসনতন্ত্রে ‘রাজা’ রাষ্ট্র প্রভৃতিকে এতটাই স্বাভাবিকভাবে দেখানো হয়েছে যে, এগুলো সব ডালভাত তো বটেই, আলো-জল-হাওয়ার মতো প্রশ্নাতীত প্রাকৃতিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে যেন।
আজকের ‘রাজতন্ত্র’-এর মালিক-গোলাম-পেয়াদা আর নবরত্নসভার রাজ-বুদ্ধিজীবীরা এতক্ষণে হয়তো বলেই ফেলেছেন— তো জনাব, দেশটা চলবে কী করে, চালাবেটা কে? প্রাজ্ঞ-বিজ্ঞ-অজ্ঞ রাজাদের, তাঁদের বাঁচাকাচ্চাদের, বাচ্চা-রাজাদের বা রাজসন্তানদের এইরকম শিশুসুলভ প্রশ্নেরও সযত্ন উত্তর রচনা করতে হবে বৈকি। এবং সে উত্তর হতে হবে চিন্তারহিত সাবালকের উপযোগী। কেননা সে নিজে চিন্তা করবে না, খুঁজবে না, ভাববে না, শুধু মুখস্থ কথা বলবে এবং “উত্তম পশু’-র মতো কুলগুরু পুরুতঠাকুরের শেখানো গায়ত্রী মন্ত্র জপে যাবে, আর এক প্রশ্ন হাজারোভাবে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে যাবে— রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখতে হবে তো, নইলে দেশটা চলবে কীভাবে?
তাকিয়ে দেখুন— খোদ এই মহাবিশ্বপ্রকৃতিকে পরিচালনা করার জন্য কী কোনো ব্যক্তি-রাজা লাগে? রাজতন্ত্র লাগে? থানা-পুলিশ-পাইক-পেয়াদা-উজির নাজির-হাকিম-হুঁকুম-কারাগার-মন্ত্রী-মিনিস্টার লাগে? লাগে না। এগুলো লাগে পদার্থ-শক্তি-প্রাণের সর্বোচ্চ অভিপ্রকাশ মানুষের বেলায়ই শুধু। বাঘ-ভাল্লুক শেয়াল-কুকুর-হঁদুরের যা লাগে না, শাসকদের তা লাগে। আশ্চর্য ঘটনা বটে। বনের রাজা সিংহ, অথবা মাছের রাজা ইলিশ থেকে শুরু করে বাতির রাজা ফিলিপস পর্যন্ত যত বানোয়াট কেচ্ছা যে নিছকই ‘রাজা’-র দীপ্তি বাড়ানোর বুদ্ধিবৃত্তিক ছলনা, সে কথা বোঝা কী এতই কষ্ট? প্রয়োজনে স্মরণ করুন লোক-ছড়ার ইঙ্গিত– “মাছের রাজা রুই, শাকের রাজা পুঁই, নারীর মধ্যে আমেনার মা, পুরুষের মধ্যে মুই”।
