৩, ইরাকের সিক্রেট সিকিউরিটি পুলিশ। প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের সামরিক সরকারের সঙ্গে কুর্দদের সংঘর্ষ লেগেই থাকত। শিশু, মহিলা, পুরুষ নির্বিশেষে সুযোগ পেলেই নিরপরাধ কুর্দদের ঠান্ডা মাথায় খুন করত ইরাকের সিক্রেট পুলিশ। সাদ্দামের সামরিক সরকার প্রায় ৩০০০ সাধারণ নিরীহ কুর্দদের হত্যা করেছিল বলে জানা যায়।
৪. ওজিপিইউ, অর্থাৎ ইউনাইটেট স্টেট পলিটিক্যাল অর্গানাইজেশন’। এই পুলিশ সংস্থাটি রাশিয়ার আর-একটি ঘাতকের দল। সামরিক বাহিনীতে কারা প্রশাসন ও পার্টির সমালোচক, অন্য অর্থে বিপ্লবের প্রতিবন্ধক বা দেশের শত্রু, তাঁদের খুঁজে বের করার কাজে ওজিপিইউ প্রথমদিকে ব্যস্ত থাকলেও পরে রাশিয়ার বৃহত্তম গণহত্যার জন্য এই সংস্থাকে ব্যবহার করা হয়েছিল। তিরিশের দশকে যখন সোভিয়েত যুক্তরাষ্ট্রের কালেকটিভাইজেশন প্রোগ্রাম’-এ রূপান্তরিত হয় তখন দেশের কৃষকরা এর বিরুদ্ধে সোচ্চারে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। ওই প্রতিবাদী কৃষকদের কণ্ঠস্বরকে চিরতরে স্তব্ধ করে দিয়েছিল এই ওজিপিইউ। রাশিয়ার ইতিহাস অনুযায়ী বিশ্বযুদ্ধের সময় দুই কোটি রুশ নাগরিক জার্মানদের হাতে নিহত হয়েছিল। কিন্তু তার আগে তিরিশের দশকে প্রায় সমসংখ্যক রুশি কৃষককে সে দেশের সরকার গুলি করে, ফাঁসি দিয়ে, বেয়নেটে বিদ্ধ করে ও লেবার ক্যাম্পে পাঠিয়ে হত্যা করেছিল। এই গণহত্যার নায়ক পরবর্তীকালে তাঁর কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা পর্যন্ত করেননি, বরং আমজনতার সামনে তা গর্ব করে বলতেন। প্রথমদিকে অবশ্য ব্যাপারটা চেপে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানরা যখন সব ফাঁস করে দেয়, তখনই এই নৃশংস কৃষক হত্যার কথা বিশ্ববাসী জানতে পেরেছিল। স্তালিনের দ্বিতীয় স্ত্রী নাজেদদা এই গণহত্যার মানসিক চাপ সহ্য করতে না-পেরে শেষপর্যন্ত আত্মহত্যা করেছিল।
৫. দেশের নাম আর্জেন্টিনা। তখন আর্জিন্টিনার রাষ্ট্রপ্রধান কর্নেল জুয়ান ডোমিঙ্গো পেরন। ‘ডিভিশন দ্য ইনফরমেশন পলিটিকাস অ্যান্টিডোমোক্রেটিকাস’ হল সিক্রেট পুলিশের দল। সংক্ষেপে ‘ডিপা। নিপীড়ন, নির্যাতন ও প্রচণ্ড অত্যাচারের জন্য অল্পদিনের মধ্যেই ‘ডিপা’ বিখ্যাত হয়ে ওঠে। আন্দোলন দমনের কাজে এই সিক্রেট পুলিশ বাহিনীকে সাহায্য করত ‘আলিজায়া অ্যান্টি কমিউনাস্টা আর্জেন্টিনা’ ও ‘কমান্ডো লিবারোটেডোরস দ্য আমেরিকান নামের দুটি দক্ষিণপন্থী রাজনৈতিক গুণ্ডার দল, যাঁদের প্রত্যক্ষ মদত দিতেন স্বয়ং প্রেসিডেন্ট পেরন। রাজনৈতিক কর্মীদের গ্রেফতার পর ভালো করে হাত-পা বেঁধে লরিতে তোলা হত। এরপর কবরখানায় নিয়ে গিয়ে আগে থেকে খোঁড়া ট্রেঞ্চের সামনে জোর করে বসানো হত তাঁদের। অবধারিত মৃত্যুর জন্য আর বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হত না হতভাগ্য বন্দিদের। অকস্মাৎ পিছন থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে মেশিনগানের গুলি এসে ঝাঁঝরা করে দিত ওদের শরীর। রক্তাক্ত প্রাণহীন দেহগুলি গড়িয়ে পড়ত ট্রেঞ্চের ভিতরে। অনেক সময় ভারপ্রাপ্ত অফিসার বন্দিদের মৃত্যুর আগে শেষবার ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনার জন্য পাঁচ মিনিট সুযোগ দিত। গুলি করার আগে বন্দিদের জানানো হত সরকারের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতার জন্য তাঁদের এই মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। যাই হোক, ট্রেঞ্চে মৃতদেহের স্তূপ জমে উঠলে তরল দাহ্য বস্তু ছড়িয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হত। এই সিক্রেট পুলিশের কীর্তিকলাপের এখানেই শেষ নয়। পৈশাচিক আনন্দের জন্য এঁরা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বৈদ্যুতিক শক দিত পুরুষ বন্দিদের অণ্ডকোশে। মহিলা বন্দিদের বৈদ্যুতিক শক দেওয়া হত স্তনবৃন্তে। বন্দিদের মাথার উপর কয়েক কুইন্টাল ওজনের ভেজা ভূষির বস্তা চাপিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখা হত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। অত্যাচার চালাতে চালাতে পুলিশ বা আর্মির লোকেরা ক্লান্ত হয়ে পড়লে বিশ্রামের সময় সিগারেট ধরাত। ওই সিগারেটের জ্বলন্ত টুকরো নেভাতে মহিলাদের যৌনাঙ্গকে অ্যাসট্রে হিসাবে ব্যবহার করত। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী ১৯৭৫ থেকে ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আর্জেন্টিনায় অন্তত ৫০০০ পরিচিত রাজনৈতিক কর্মী চিরতরে হারিয়ে গেছেন।
৬. দেশের নাম কলম্বিয়া। গোপন পুলিশ সংস্থার নাম ‘মুয়ের্তে এ সিকুয়েস্ট্রেটস’, সংক্ষেপে ‘মাস’। গ্রেফতার ও অপহরণের পর সাধারণ মানুষকে হত্যা করায় সিদ্ধহস্ত ছিল এই স্কোয়াড। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে ৩০০০ বন্দিকে বিনাবিচারে হত্যা করে এই ডেথ স্কোয়াড। কলম্বিয়ার ম্যাগডালেনা মিডিও এলাকায় ফাওয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী হাজার খানেক দরিদ্র কৃষক পতিত জমি পরিষ্কার করে উন্নত পদ্ধতিতে চাষবাস শুরু করে। বছর দুই/তিন ভালো ফসল পেয়েছিল ওই কৃষকেরা। এটাই চক্ষুশূল হয়ে দাঁড়াল। ভাড়াটে সেনা ও ডেথ স্কোয়াড মাস’ একসঙ্গে ৮০০ কৃষককে হত্যা করেছিল কোনোরকম প্ররোচনা ছাড়াই।
৭. উগান্ডা, আফ্রিকা মহাদেশের একটি রাষ্ট্র। ইদি আমিনের শাসনকাল। ১৯৭১ থেকে ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ– ইদি আমিনের রাজত্বকালের এই ৯ বছরে উগান্ডায় কমপক্ষে ১ লক্ষ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এই নিহতের আসল হিসাবে ১০ লক্ষও ছাপিয়ে যেতে পারে। প্রকৃত হিসাব কারোরই জানা নেই।
