জাপানের এদো শহর। ১৫০০ সালে যে শহরের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০০০ জন। ১৬০০ সালে জনসংখ্যা এসে দাঁড়ায় ১,৫০,০০ জনে। ১৭০০ সালে সেই সংখ্যা এসে পৌঁছোয় ১ কোটিতে। মানুষের জৈবিক চাহিদা মেটাতে এ শহরে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে স্থাপিত হল স্বর্গীয় প্রমোদপুরী, যার নাম দেওয়া হল জাপানি ভাষায় ‘য়োশিওয়ারা, বাংলা অর্থ দাঁড়ায় গণিকালয়। এদো বাকুফুর কেন্দ্রীয় প্রশাসনের প্রচুর সৈন্যসামন্ত, সরকারি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সাধারণ কর্মচারী ছিল। বিশাল সেনাবাহিনীর অধিকাংশই ছিলেন অবিবাহিত যুবক। এমনিতেই এদো যুগে মেয়েদের চেয়ে পুরুষের সংখ্যা ছিল অস্বাভাবিক বেশি। একজন নারীপ্রতি আটজন পুরুষ। ফলে সকলের পক্ষে বিয়ে করে যৌনজীবন ভোগ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। অতএব যৌনচাহিদা মেটাতে শহরের প্রায় সর্বত্র গণিকালয় গড়ে উঠেছিল গোপনে। শুধু এদো শহরেই নয়, দেশের অন্যান্য শহরেও গণিকালয় গড়ে উঠেছিল। ১৬১২ সালে জিনয়েমোন শোউজি নামে এক ব্যক্তি গণিকাদের জন্য একটি সংরক্ষিত পরিবেষ্টন তৈরির আবেদন করেন সরকারের কাছে। অনুমোদন মিলল না। জিনয়েমোন দমে না-গিয়ে পুনঃপুনঃ চেষ্টা করতে লাগলেন অনুমোদন পাওয়ার জন্য। অবশেষে ১৬১৭ সালে অনুমোদন মিলে গেল। স্থাপিত হল গণিকালয়। অনুমোদনের সঙ্গে সঙ্গে সরকার কিছু নিয়মকানুনও বেঁধে দিল। যেমন–(১) গণিকালয়ে তালিকাভুক্ত গণিকাদের পরিবেষ্টনের ভিতরেই থাকতে হবে। পরিবেষ্টনের বাইরে কোথাও গিয়ে তাঁরা যৌনব্যাবসা করতে পারবে না। কোনো ক্লায়েন্টের সঙ্গে বাইরে কোথাও যেতে পারবে না। (২) গণিকারা জমকালো পোশাক দামি অলংকারে সাজতে পারবে না। (৩) কোনো ক্লায়েন্ট ২৪ ঘণ্টার মধ্যে একবার এসে নির্দিষ্ট সময়ের বেশি থাকতে পারবে না। (৪) পরিবেষ্টিত এলাকার অভ্যন্তরে উঁচু বাড়িঘর নির্মাণ করতে পারবে না ইত্যাদি।
য়োশিওয়ারা পুরুষদের জন্য যৌন-উপভোগের আনন্দ-অমরাবতী হলেও মেয়েদের জন্য ছিল দাসত্ব। কারণ এখানে ঢোকার পর বেরোবার আর কোনো উপায় ছিল না। ৯-১০ বছর বয়সি মেয়েদের গরিব বাবা-মায়েরা যোশিওয়ারাতে বিক্রি করে দিতেন। সেইসব শিশুকন্যাদের বড়ো হওয়া পর্যন্ত যোশিওয়ারা কর্তৃপক্ষ প্রচুর টাকা খরচ করত। ভোগযোগ্য হয়ে উঠলে তবেই গণিকাপেশায় নিযুক্ত করত। গণিকাদের কেশসজ্জার কাজ করতেন অভিজ্ঞ নর-নারী। ক্লায়েন্টের কাছে আরও আবেদনময়ী করার জন্য গণিকাদের যৌনকেশ চর্চা করতে হত। যৌনাঙ্গের উপরিভাগে ‘ইরেজুমি’ (উল্কি) আঁকাতে হত। তাঁদের বিক্রয়কল্পে যে টাকা বাবা-মাকে দিতে হত, সেই টাকা মেয়েদেরই শোধ করতে হত। এককালীন শোধ করা ছিল প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। তাই সেখান থেকে মুক্তি মৃত্যুর আগে মিলত না। এইসব মেয়েরা বাকি জীবনে মাত্র তিনবার ছুটি পেত। বাবা ও মায়ের মৃত্যুর পর এবং হানামি নামে একটি উৎসবে। এই বন্দিদশা থেকে উদ্ধারের একমাত্র পথ ছিল টাকা শোধ করা। যদিও সেই বিপুল পরিমাণের টাকা নিজের থেকে শোধ করা যেত। কিন্তু তা তো হওয়ার জো নেই। কারণ তাঁরা গণিকালয়ে যৌনকর্মী হিসাবে চাকরি করত মাত্র। পারিশ্রমিক হিসাবে যা পেত, তা দিয়ে নিজের চলাই কঠিন হয়ে যেত। তা থেকে অর্থ সঞ্চয় করে শোধ দেওয়া তো আকাশকুসুম।
জাপানে গণিকাবৃত্তি সে দেশের ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়। জাপানে গোটা দেশ জুড়ে হাজার হাজার ‘ওনছেন’ রিসর্ট হোটেল থাকে, যেখানে ‘কলগার্ল’ ও ‘কম্পেনিয়ন’ বলে পরিচিত, যাঁদের নিয়ে রাত্রিযাপন করা হয়। প্রাচীন ও মধ্যযুগ থেকে তো বটেই, আধুনিক যুগেও মেয়েরা গণিকাবৃত্তির সঙ্গে আছে। পণ্যপ্রস্তুতকারী সংস্থা ও চলচ্চিত্র বিষয়ক পোস্টারে নগ্নপ্রায় নারী না-থাকলে সেগুলি কোনো পোস্টারই নয়। জাপানিরা যৌনতা বিষয়ে খুবই সচেতন। গণিকাদের প্রকাশ্যে ফুওজোকু’ বা ‘বাইশুন’ বলা যায় না, বলতে হয় ‘সেক্স ওয়ার্কার’। জাপানি ‘বুনকা’ শব্দটির বাংলা অর্থ সংস্কৃতি। ফুওজোকু বুনকা’, ‘বাইশুন বুনকা’ শব্দগুলির বাংলা অর্থ দাঁড়ায় গণিকা সংস্কৃতি। এই বুনকার পিছনে প্রতিদিন কোটি কোটি ইয়েন-ডলার বিনিয়োগ হয়ে চলেছে। ৮০ ও ৯০ দশকে উপচে পড়া বাব অর্থনীতির রমরমা অবস্থার প্রভাবে জাপানি পুরুষরা দল বেঁধে ফিলিপিন্স ও থাইল্যান্ডের গণিকালয়ের তরুণীদের সঙ্গে যৌন-উপভোগ করার জন্য যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল।
জাপানের আধুনিক সমাজব্যবস্থায় গণিকা সংস্কৃতি ধরে না-রাখলে বড়ো বড়ো লেনদেন, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ব্যাবসা-বাণিজ্য এবং দেশ-জাতির কলুষতা রক্ষা করা কঠিন।
আধুনিক যুগে ১৯৫৬ সালের ‘গণিকাবৃত্তি বিরোধী আইন অনুসারে কোনো ব্যক্তি গণিকাবৃত্তি করতে পারে না বা তাঁর গ্রাহক হয়ে উঠতে পারে না।” উদার ব্যাখ্যা এবং আইন শূন্য প্রয়োগে যৌনশিল্পকে উন্নতি করতে প্রতি বছর আনুমানিক ২.৩ ট্রিলিয়ন ইয়েন আয়কে ২৪ বিলিয়ন ডলার করে দেওয়া হয়েছে। জাপানের ‘যৌনশিল্প’ কিন্তু গণিকাবৃত্তির সমার্থক নয়। যেহেতু জাপানি আইন গণিকাবৃত্তিকে ‘অর্থের বিনিময়ে অনির্দিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যৌন-সম্পর্ক হিসাবে সংজ্ঞায়িত করে, তাই বেশিরভাগ ফুজুকু কেবল কথোপকথন, নৃত্য বা স্নানের মতো আইন-কানুন পরিসেবাগুলি অফার করে আইনিবলেই। তবুও এমআইডাব্লিউ এবং জাপানের ন্যাশনাল উইমেনস এডুকেশন সেন্টারের জরিপে দেখা গেছে যে, শতকরা ২০ শতাংশ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত জাপানি পুরুষ যৌনতার জন্য অর্থ প্রদান করেছে।
