স্পেনের গণিকাবৃত্তি কোনো নির্দিষ্ট আইনের দ্বারা সংযত নয়, তবে কিছু ক্ষেত্রে অবৈধ। জাতিসংঘের হিসাব অনুসারে স্পেনে ৭০,২৬৮ গণিকালয় আছে। গণিকাবৃত্তি সরাসরি স্পেনের ফৌজদারি কোডে অন্তর্ভুক্ত নয়, তবে পিং পিং হিসাবে অবৈধ। সেক্ষেত্রে ১৮৮ ধারা একমাত্র নিষিদ্ধ ধারা, বিশেষ করে পিং পিং দের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কেউ ভীতি প্রদর্শন, শঠতা বা প্রয়োজনের শিকার হয়, তবে ১২ থেকে ২৪ মাসের জেল হতে পারে।
তবে কি স্পেন গণিকাবৃত্তি স্বীকার করেনি কোনোদিন? মধ্যযুগে কিন্তু স্পেনে গণিকাবৃত্তিকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। সতেরো শতকে চতুর্থ ফিলিপের ফরমানে এটি বন্ধ হয়। উনিশ শতকের পর ইসাবেল দ্বিতীয় রাজত্বকালে এই প্রথা আবার শহরে চালু হয়, রমরমিয়ে এই ব্যাবসা বাড়াবাড়ির চূড়ান্ত পর্যায়ে যায়। ১৯৩৫ সালে আবার এই গণিকাবৃত্তি নিষিদ্ধ হয়, শুরু হয় একনায়কতন্ত্র, বাতিল হয়ে যায় এই আইন। ১৯৭৫ সালে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। পায়। ১৯৯৯ আরও সংশোধন করা হয় এবং এই যৌন-ব্যভিচারের শিকারদের আশ্রয় প্রদান করা হয়।
২০০৯ সালের TAMPEP গবেষণার মতে, শতকরা ৯৫ শতাংশ যৌনকর্মী অভিবাসী। প্রায় শতকরা ৮০ শতাংশ লাতিন আমেরিকান (প্রধানত ইকুয়েডর, কলম্বিয়া এবং ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্র থেকে)। তবে পূর্ব। ইউরোপীয় অভিবাসী (প্রধানত রোমানিয়া ও বুলগেরিয়া) আগমনের কারণে পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে।
ইমিগ্রেশন প্রসঙ্গে স্পেন উল্লেখযোগ্য। ২০০৮ সালে স্প্যানিশ সরকার পাচার করা নারীদের সাহায্য করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছিল। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১২ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৩ পর্যন্ত বার্সেলোনার এশিয়ান ১৩৮ টি পরিদর্শনে ৫৪৪ গণিকা সনাক্ত করা হয়েছিল। ৩০ নভেম্বর ২০১২ সালে প্যারাগুয়ে থেকে ৩৪ বছর বয়সি একজন মহিলা কুয়েনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল, তখন তিনি তাঁর মেয়ের সঙ্গে একটি গণিকা করছিলেন।
স্পেনের যৌনকর্মীদের সঙ্গে কাজ করার সংস্থাগুলির মধ্যে আছে এপিআরএএমপিপি (অ্যাসোসিয়েশন প্যারা লা প্রেভেনসিওন, রেইন্সরসিওন ইয় এটেনসিওন দে লা মুজার প্রোফ্লুইটিডাডা) যৌনকর্মীদের অধিকার সংগঠন হিটাইরা (মাদ্রিদ), সেইসঙ্গে আঞ্চলিক সংগঠন যেমন এসআইসিএর অস্টুরিয়াস, এএমটিটিসিএসইএ (অ্যাসোসিয়েশন দে মুজিরেস), ট্রানসুকেসেলস ইয়ে ট্রাভিস্টিস কমো ট্র্যাজেজাদাসাস স্পেসিস এ এস স্পনা, মালাগা) এবং সিএটিএস (কমেট দে অ্যাপোও লাস ট্র্যাজাজাদাসার ডেল সেক্সো, মুরসিয়া)। স্প্যানিশ যৌনকর্মীরা তাঁদের সুরক্ষার অভাব সম্পর্কে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করে। একটি যোগাযোগ মাধ্যম যৌনকর্মীদের অভিযোগগুলি নির্ধারণের জন্য প্রকাশ করে। স্প্যানিশ সংস্কৃতি যৌনকেন্দ্র হল গোয়া। স্পেন যৌন-পাচারের শিকার নারী এবং শিশুদের জন্য ট্রানজিট দেশ। স্পেনের পাচারকারীরা লিবিয়া থেকে মরোক্কো পর্যন্ত পৌঁছে যায় এবং এখানে সাগরের দক্ষিণে স্পেনে স্থানান্তরিত হয়।
কিছু ইন্টারনেট সূত্র সত্ত্বেও স্পেনের গণিকাবৃত্তি আইনি বলে দাবি করে, সত্য হল যৌনকর্মীরা আইনি ভ্যাকুয়ামেই আছে। যৌন শ্রমিকদের দণ্ডিত করা হয় না, বরং এর পরিবর্তে ক্রয়কারীরা আইন দ্বারা শাস্তি পায়। স্পেনের ৯০ শতাংশ যৌনকর্মী মানব পাচারের শিকার বলে মনে করা হয়, যা আইনতভাবে জটিল মনে হতে পারে। ১৯৫৬ সাল থেকে গণিকালয়গুলি স্পেনে অবৈধ ছিল। কিন্তু আজকাল তাদের বেশিরভাগই ‘হেসেস্টারিয়া’ বা ‘ক্লাব’ হিসাবে ছদ্মবেশী এবং স্বাভাবিক হিসাবে কাজ করার জন্য আছে। স্পেনের কিছু অংশে বার্সেলোনা সহ যৌনকর্মী ও তার ক্লায়েন্ট উভয়ের বিরুদ্ধে মামলা করা যেতে পারে। সত্যিকার অর্থে, স্পেনের গণিকাবৃত্তি অন্যান্য দেশের মতো কলঙ্কিত নয়। সাধারণ মানুষ বার্সেলোনার গ্রান ভিয়া এবং বার্সেলোনায় লাস রাযাম্বলাসের মতো খোলা জায়গাগুলিতে যৌনকর্মীদের কাছে আসতে পারেন, যা অনেকগুলি স্প্যানিশ শহরের একটি সম্পূর্ণ সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির মতো মনে হয়। স্পেনের গণিকাবৃত্তি নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্যকর ব্যাপার নয়, এটি নেদারল্যান্ডস বলে। হিউম্যান ট্র্যাফিকিং বা মানব পাচার হল গুরুতর বিশ্বব্যাপী সমস্যা এবং শোষিত যৌনকর্মীদের নিয়োগের জন্য কিছুটা অসন্তুষ্ট ক্রিয়াকলাপ, যা সরাসরি অর্থোপার্জনে সহায়ক।
(৩) জাপান : জাপানে গণিকাবৃত্তির প্রাচীন ইতিহাসের উৎস সহজলভ্য নয়। কারণ হয়তো এই বৃত্তি রুচিসম্মত নয় বলেই ইতিহাসের প্রাচীনকাল কেউ রচনা করার প্রয়োজন বোধ করেনি। জাপানে ঠিক কবে ঠিক কোন্ অঞ্চলে প্রথম যৌনপেশার অভ্যুদয় হয়েছিল, সেটা জানতে হলে ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন। তবে কিছু তথ্য দেওয়া যেতেই পারে। প্রাচীনকালে জাপানের গণিকাবৃত্তি জাপানি সমাজে একটি বুনকা’ (সংস্কৃতি) হিসাবে দেখা হত। জাপানি ভাষায় যৌনকর্মীদের নানা শব্দবন্ধে বলা হয়েছে, যেমন–ইউজো, আসোবি মে, তাইউ, ওইরান, শোওবাই ওননা, কুগুৎসুমে, শিরাবিয়োশি, জোরোও, ইউকুন, শোওগি, গেই, গেইজুৎসু, গেইশাবুনকা, ইউনা, অদোরিকো, হাকুজিন, জোকাবুকি ইত্যাদি।
জাপানের গণিকাবৃত্তিকে কয়েকটা যুগে ভাগ করা যায়। ৭১০ সাল থেকে ৭৯৪ সাল পর্যন্তকে বলা হয় নারা যুগ’, ৭৯৪ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্তকে বলা হয় হেইয়ান যুগ’, ১১৮৫ সাল থেকে ১৩৩৩ সাল পর্যন্ত সময়কে বলা হয় “কামাকুরা যুগ’, ১৩৩৩ সাল থেকে ১৫৭৩ ‘মুরোমাচি যুগ’, ১৪৬৭ সাল থেকে ১৫৭৩ সাল পর্যন্ত ‘গৃহযুদ্ধের যুগ’ বা ‘ছেনগোকু জিদাই’-ও বলা হয়, ১৬০৩ সাল থেকে ১৬৬৮ সাল পর্যন্ত এদো যুগ। এই সময়কালে জাপানিদের শরীর বিক্রি বা যৌনপেশার কথা জানা যায়। এই সময়কালে আমরা ‘ইউজো’ বা আসোবি মে’ শব্দবন্ধের গণিকানারীদের কথা জানতে পারে। এঁরা যেমন শরীর বিক্রি করে অর্থ রোজগার করতেন, তেমনি নাচ-গান-অভিনয় করেও অর্থ রোজগার করত। মানয়োওশুউ’ (সহস্র পাতার বই) নামে এক প্রাচীন কবিতা-সংকলনে এইসব নারীদের ‘উকারে মে’ বা ‘ইউকোওজোফু’ বলা হয়েছে। নারা যুগ থেকে হেইয়ান যুগ পর্যন্ত ‘মিকো’ বা ‘ফুজো’ শব্দবন্ধের যুবতী নারীরা শিন্তো জিনজা মন্দিরে সেবাদাসী হিসাবে কাজ করত। এইসব সেবাদাসী বা দেবদাসীদের কেউ কেউ বিভিন্ন সরাইখানা, হাটবাজার, নদীবন্দর প্রভৃতি জায়গাগুলিতে গিয়ে বিনোদন যেমন দিত তেমন যৌনসেবাতেও লিপ্ত হতেন। জাপানি সমাজে এঁদের জন্য শব্দবন্ধ বরাদ্দ হয়েছে ইউজো’ বা ‘আসোবি মে’। মুরোমাচি যুগে জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলে ‘কোওশোকুকা’ অর্থাৎ ‘অশোভন এবং ‘কেইসেইইয়া’ অর্থাৎ ‘রাজকীয় গণিকালয়’ নামে গণিকালয় গড়ে উঠেছিল ব্যক্তিগত উদ্যোগে। জানা যায় সে সময়ে সুজিকো নামে এক ধনী গণিকা একটি বড়ো গণিকালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল। এদো যুগের প্রথম দিকে জাপানের কিয়োতো নগরে ইজুমো-নো-ওকুনি নামে এক প্রভাবশালী ও লাস্যময়ী নারীর কথা জানা যায়, যিনি পক্ষান্তরে গণিকা ছিল। তিনি হাজার হাজার গণিকাদের পরিচালনা করতেন। এমন অবস্থা হয় যে, কিয়োতো নগরের চারিদিক ভাসমান গণিকা ছড়িয়ে পড়ে যেনবিপর্যস্ত অবস্থা। এই বিপর্যস্ততা থেকে রেহাই পেতে বা সমাজকে রক্ষা করতে ভাসমান গণিকাদের একত্রিত করে জাপানের প্রথম গণিকালয়টি স্থাপন হয়। এরপর ওসাকা ও এদো শহরেও গণিকালয় স্থাপিত হয়। তবে জাপানের সামুরাই শাসক তোয়োতোমি হিদেয়োশির রাজত্বকালে শাসক অনুমোদিত প্রথম গণিকালয়টি স্থাপিত হয়। সেই গণিকালয়ের মালিকের নাম ছিল সাবুরোজোয়েমোন হারা।
