(২) স্পেন : স্পেনকে বলা হয় গণিকাবৃত্তিতে বিশ্বের রাজধানী। গণিকাবৃত্তি স্পেনে এত জনপ্রিয় (এবং সামাজিকভাবেও গ্রহণযোগ্য) যে, জাতিসংঘের গবেষণায় দেখা গেছে যে, স্পেনীয় পুরুষদের ৩৯ শতাংশই অন্তত একবার গণিকা সেবা গ্রহণ করেছে। ২০০৯ সালে স্প্যানিশ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এক জরিপে দেখা গেছে, একবার গণিকা ব্যবহারকারীদের হার ৩২ শতাংশ। জাতিসংঘের সংখ্যা কম, সম্ভবত ১৪ শতাংশের চেয়েও বেশি, উদারমনস্ক হল্যান্ড বা ব্রিটেনের তুলনায় অনেক বেশি। ৫ এবং ১০ শতাংশ মধ্যে ‘Oscillate’ রিপোর্ট করা হয় এবং শুধু পুরুষরা এটা স্বীকার করতে ইচ্ছুক ছিল। এই বিশাল চাহিদা পূরণের জন্য স্পেনের প্রায় ৩,০০,০০০ গণিকা স্পেনে কাজ করছে। অন্ধকার নামতেই শহরের কেন্দ্রস্থলগুলিতে, যেমন ইন্ডাস্ট্রিয়াল এস্টেট, রাস্তার পাশে একচেটিয়া বার, শ্যাম্পেনের পকেটগুলো বা নমনীয় নারীদের শেপিং লক্ষণ দ্বারা সর্বশেষে স্বীকৃত। সম্প্রতি ১৮০ জন যৌনকর্মী সহ ফরাসি সীমান্তে ক্লাব প্যারাডাইজ খোলা হয়েছিল, এটি ইউরোপের বৃহত্তম গণিকালয় হিসাবে গড়ে উঠল। ক্লাব বড়ো হলেও কম বয়সি ক্লায়েন্টদের প্রত্যাশা পূরণ করে।
‘Spanish Association for the Social Reintegration of Female Prostitutes’ দ্বারা পরিচালিত গবেষণা বলছে, ১৯৯৮ সালে সাধারণ ক্লায়েন্টের মধ্যে ৪০ বছর বয়সি পুরুষদের প্রাধান্য ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ২০০৭ সালে সেই বয়সের ক্রম অনেক কমে গেছে। এখন প্রশ্ন হল, কমবয়সিরা কেন গণিকালয়ে যাচ্ছে? উত্তর হল, তাঁরা এই ক্ষেত্রে সবকিছু খুব দ্রুত পেয়ে যাচ্ছে, যেটা তাঁদের ইচ্ছার সঙ্গে সহমত আর চাহিদার সঙ্গে জোগান সহজলভ্য। যেখানে শরীর কেনাবেচাতে টাকা দেওয়ার অর্থ হল অধিকার বোধ জন্মানো। অধিকারের সঙ্গে ক্ষমতা মানে ইচ্ছার অপমৃত্যু, বর্বরতার জয়। তবে এটা খুব নির্মম, এটা কিন্তু বলা যায় না। কারণ সহজলভ্য উষ্ণতা যদি প্রয়োজনে দেহকামনার সঙ্গে এক হয়ে কেবল অর্থকে ভিত্তি করে ব্যাবসার নামে পরিসেবার রূপ নেয়, তাহলে হয়তো সেটা অধিক প্রয়োজনে, নিমর্মতা মোটেই নয়।
এখন প্রশ্ন হল, তবে কি দেহজ কারণই একমাত্র কারণ? না, কেবলমাত্র দেহজ নয়। বরং স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যক্তি স্বাধীনতা বোধকে প্রতিষ্ঠা করতেই এই গণিকাবৃত্তির রমরমা। ফ্রাঙ্কো যুগে সংকীর্ণতাভিত্তিক পরিবারের চাপ একসময় গণিকালয়গুলি নিষিদ্ধ করে দেয়। ১৯৩৫ সালে দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রেও গণিকাবৃত্তি নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৩৯ সালে ‘ডিকটেটরশিপ’ (একনায়কতন্ত্র) প্রতিষ্ঠা হয়। সে সময় যৌনকর্মের ক্ষেত্রে যৌনপল্লিগুলি প্রায় একঘরে হয়ে যায়। এটা ছিল সেই সময়ের একনায়কতন্ত্রের প্রভাব। যেহেতু সময় কখনও থেমে থাকে না, যেহেতু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতা হস্তান্তর হয়, এক্ষেত্রেও তেমনটাই ঘটল। তবে ১৯৪১ সালে এই আইন বাতিল হয়। ১৯৬২ সালে ১৮ জুন স্পেনে প্রাচীনপন্থী স্পেনীয়ভাব বিলুপ্ত হয়। গোপন ইচ্ছার অগোচর সমৃদ্ধি একনায়কের ইন্দ্রপতনে মাথা চাড়া দিয়ে উঠল। অর্থাৎ কেবলমাত্র স্পৃহা নয়, সংকীর্ণ চাপের ঊর্ধ্বে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করাই মূল কারণ। তবে ধীরে ধীরে গণিকাবৃত্তি বর্তমানে ইয়োলো পেজে স্থান পেয়েছে। স্প্যানিশ প্রদেশে ১৯৮০-এর দশকে একজন যদি গণিকালয়ে রাত কাটাতেন, তবে সেটা কুমারীত্ব হারানোর বিষয়ের মধ্যে গণ্য হত না। এবার তাহলে বুঝতেই হয় যে, যৌনবৃত্তি ক্ষুগ্নিবৃত্তির মতোই নিবৃত্তি ভোজনের সাধারণ অনুসঙ্গ ছাড়া আর কিছুই নয়।
১৯৯০ সালে ম্যাগাজিন, ইন্টারভিউ এবং অনুসন্ধিৎসু সাংবাদিকেরা Spanish Lover Guide’ প্রকাশ করে নিজেরা কৃতিত্ব অর্জন করতেন। বর্তমানেও যে ক্লায়েন্ট’ কথাটার গুরুত্ব হারায়নি, তা কিন্তু কথার মূলে শব্দপ্রয়োগ থেকেই বোধগম্য হয়। যদি ফ্রাঙ্কো যুগের সংকীর্ণতাভিত্তিক পরিবারের চাপ বর্তমানে গণিকাবৃত্তি সমর্থনের মূল কারণ হয়, তবে বর্তমানে দামি সংবাদপত্রগুলিতে যৌনকর্মীর জন্য বিজ্ঞাপন ‘যৌনবিপ্লব’ নামে অভিহিত হয়। কারণ পুরানো ভিত্তি নয়, বরং স্বৈরাচারের পতন আর স্বাভাবিক সাবলীলতার জয়ই হল ‘যৌনবিপ্লব’ শব্দের পরিচায়ক। উল্লেখ্য, এখনও একটি প্রধান ‘জাতীয় দৈনিক মাদ্রিদ’-এ ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ বিজ্ঞাপন গণিকাদের জন্য, আর তাদের কাছ থেকে সমস্ত রকম পরিসেবার জন্য বিবিধ মূল্য নির্দিষ্ট বিজ্ঞাপনে বিস্তারিত বর্ণনা করা হয়। এখন প্রশ্ন হল বিজ্ঞাপনগুলি দূর করা কি সম্ভব নয়? আসলে স্পেনের মুদ্রণের মাধ্যমে অনিশ্চিত অর্থনৈতিক রাষ্ট্রের দিকে তাকিয়ে এবং এটি ন্যায়সংগত।
যাই হোক, স্পেনে এই পেশা বাণিজ্যিক ধারার স্বীকৃত হলেও বাস্তবে পেশা বলতে যা বোঝায়, তার কোনো স্বীকৃতি নেই। ২০০৯ সালে শুধুমাত্র স্বরাষ্ট্রমন্ত্রালয় ১৭ টি আন্তর্জাতিক অপরাধের মূলে যৌনকর্মকে দায়ী করেছে। ১৯১৯ সালেই জানুয়ারি আর এপ্রিল মাসে ‘El Pais’ পত্রিকার মতে, কর্তৃপক্ষ যৌনদাসত্বে ক্রীত মহিলাদের ৪৯৩ টি মামলা দায়ের করে। মাদ্রিদভিত্তিক এনজিও ‘প্রোকেক্টো এসপেরা’-র মুখপাত্র মার্টা গঞ্জালেজ মত প্রকাশ করেন যে, নারী বিক্রির জন্য সম্পূর্ণ অসচেতনতাই দায়ী। এখানে ক্লায়েন্টরা বেশিরভাগ সময়েই বুঝতে পারেন না যে, এটি তাঁদের পরিবারের জন্য একটি মৃত্যু হুমকিস্বরূপ, তাই সচেতনতা একান্ত আবশ্যক।
