–খারাপ লাগে না এরকম পেশার যুক্ত থাকতে? লোকে বাঁকা চোখে দেখে, ভর্ৎসনা করে, ঘৃণাও করে। খারাপ লাগে না?
তপতী ঝাঁঝিয়ে জবাব দিল–“খারাপ লাগবে কেন? চুরি-ডাকাতি করছি কি? পরিশ্রম করি, রোজগার করি। শরীর আমাদের পুঁজি ঠিকই। শরীর খাঁটিয়ে আর পাঁচজনের মতো আমরাও রোজগার করি। এ পৃথিবীতে এমন কোনো পেশা আছে, যেখানে শরীরের প্রয়োজন হয় না। কেউ শরীরের হাত ব্যবহার করে রোজগার করে, কেউ শরীরের পা ব্যবহার করে রোজগার করে, কেউ শরীরের চোখ ব্যবহার করে রোজগার করে, কেউ শরীরের নাক ব্যবহার করে রোজগার করে, কেউ শরীরের জিভ ব্যবহার করে রোজগার করে, আর আমরা শরীরের যোনি ব্যবহার করে রোজগার করি। তফাৎ কোথায়? এইভাবে ভাবতে পারেন না কেন? আমরা সেভাবেই ভাবি। তাই খারাপ লাগে না। খারাপ লাগলে দিনের পর দিন এভাবে কাজ করতে পারতাম? পেশাকে তো জেনেই এসেছি। সবচেয়ে বড়ো কথা, আপনি যে পেশাতেই আসুন-না কেন স্বেচ্ছায় হোক বা বাধ্য হয়ে, সেই পেশাকে মন থেকে ভালোবাসতে না-পারলে আপনি কাজটি ঠিকঠাক করে উঠতে পারবেন না। শ্রমিক হিসাবেও আপনি ব্যর্থ।”
আর পাঁচটা ব্যবসার মতো শরীর বিক্রির ব্যবসারও এখন বেশ চাহিদা। শুধু শরীর কেন, অনেক মানুষকেই অনেক সময় অনেক অপছন্দের কাজ করতে হয়, বেঁচে-বর্তে থাকার জন্যে। এমএ পাশ বনগাঁর এক যুবককে জানি যিনি যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান করতে না পেরে পাথরপ্রতিমায় গিয়ে রিক্সা চালাত। পাড়া-প্রতিবেশী কেউ সেটা জানত না। বাড়ি থেকে ভালো শু্যট-বুট পরে হাতে ব্যাগ নিয়ে বেরত। এরকম খুঁজলে প্রচুর যুবকদের পাওয়া যাবে। এমএ পাশ পিএইডি করা কোনো যুবক যদি ডোমের চাকরি পেয়ে যেত, সেটা কী কেউ জানতে পারত যে, সে ডোমের কাজ করে? আমার বাড়ির পাশে এক ভদ্রলোক রাইটার্স বিল্ডিংয়ে সুইপারের কাজ করত। কিন্তু সারাজীবন সে পেশা লুকিয়ে রেখেছে। লুকিয়ে রাখা পেশা অনেককেই করতে হয়। আজকাল ছেলেরাও গোপনে যৌনপেশার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। এদের পুরুষ যৌনকর্মী বা জিগোলো বলে। এ বিষয়ে পরে বিস্তারিত আলোচনা করব।
শরীর বিক্রির ব্যাবসা যে বিনাপুঁজির লাভজনক ব্যাবসা, সেটা এই ভোগবাদী রাষ্ট্রনাগরিকরা বিলক্ষণ বুঝে গেছে। দেহোপজীবিনীরাও বুঝে গেছে একাধারে সীমাহীন যৌনসুখ ও অর্থসুখ দুইই ভোগ করা সম্ভব এই গণিকাবৃত্তিতে। বস্তুত যেসব মেয়েরা গণিকাবৃত্তি গ্রহণ করেন, তাঁরা কোনো না-কোনো ভাবে এই বৃত্তিতে আসছে বাধ্য হয়, এ ধারণা সবক্ষেক্ষেই সত্য নয়। মেয়েরা যে বাধ্য হয়েই গণিকাবৃত্তিতে আসে, তা প্রমাণ হয় কীসে? এ পেশায় বাধ্য এসেছে এ বয়ান কার? যিনি গণিকা তাঁর। গণিকা যে সত্য বলছেন না মিথ্যা বলছেন, তা সহসা প্রমাণ করা যায় না। কারণ যিনি বাদী, তিনিই বিবাদী, তিনিই সাক্ষী। গোপনে যৌনকর্ম করতে গিয়ে কত ‘ভদ্রঘরের’ (‘ভদ্রঘরের মহিলা’ বলতে যাঁর পিঠে গণিকার স্ট্যাম্প পড়েনি) মহিলাদের বলতে শুনেছি ‘পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে এ লাইনে এসেছি’। যৌনকর্ম করতে গিয়ে ধরা পড়ার পর সব মেয়েদেরই এই একটাই গৎ—‘পেটের দায়ে বাধ্য হয়ে এ লাইনে এসেছি’। এতে চরম সহানুভূতি মেলে। যৌনকর্ম আদিরস থেকে করুণ রসে ভেসে যেতে থাকে। পশ্চাৎপটে প্যাথোজ বাজতে থাকে। পেটের দায়’ ব্যাপারটা কেমন যেন অভাব অভাব দারিদ্র্য দারিদ্র্য ভাব। বস্তুত আমরা সকল কর্মজীবীরাই পেটে দায়ে কর্মযজ্ঞে আসি। পরের সেবা করি অর্থের বিনিময়ে। নিজেদের উৎকৃষ্ট পণ্য করে তোলার চেষ্টা করি। পেট আমাদের সকলের আছে। পেট আছে, তাই ক্ষুধাও আছে। পেট না থাকলে কেউ কোনো কর্ম করত না। তা সে যৌনকর্মই হোক কিংবা ক্ষৌরকর্ম। একটু ভাবুন, শরীর আমরা সবাই বেচি। সব পেশাতেই শরীর বেচতে হয়। যতক্ষণ শরীর, ততক্ষণ পেশা। অবশ্য রোজগারের জন্য কেউ কেউ বুদ্ধিও বেচে। অতএব বলা যায়, পেটের দায়’ কথাটা অত্যন্ত নিন্মমানের অজুহাত।
দারিদ্র্যতা থেকে অভাব, অভাব থেকেই যদি মেয়েরা গণিকাবৃত্তি বেছে নেয়, সেটা কতটা বাস্তবানুগ? চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি, রাহাজানি সবই কি অভাবের তাড়নায়? খেটে খেতে চাইলে কি এ পৃথিবীতে কাজের অভাব? তাহলে গণিকাবৃত্তি বা যৌনপেশায় কেন? অভাব, না স্বভাব? প্রতিটি যৌন-সক্ষম সুস্থ মানুষ জিনগতভাবে বহুগামী। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে। বহুগামিতা পুরুষের একচেটিয়া নয়। নারী-পুরুষ সমান আগ্রহী। সামাজিক কারণেই বেশিরভাগ মানুষ সেটা নিয়ন্ত্রণ করে, আবার পাপ বা অপরাধবোধ থেকেও ও-পথে পা বাড়াতে সাহস পায় না। সামাজিক জীবনযাপনের তোয়াক্কা না করে অনেকেই আবার ‘নিষিদ্ধ’ কাজে এসে পড়ে। এরা বেশ সাহসী মানসিকতার হয়। সমাজকে বুড়ো আঙ্গুল দেখাতে হলে সাহসী তো হতেই হয়।
দারিদ্রতা বা অভাবই যদি মেয়েদের যৌনপেশায় আসার একমাত্র কারণ হত, ভারত তথা গোটা পৃথিবীতে যে বিপুল সংখ্যক দারীদ্রসীমার নীচে থাকা মেয়ে-বউ, তাঁরা সকলেই গণিকাবৃত্তিকেই বেছে নিত। বাস্তবিকই তা হয় না। তাহলে অসংখ্য দরিদ্র মহিলারা কলে-কারখানায়, মাঠে-ময়দানে, খনিতে-নদীতে সেলাই-ফোঁড়াই করে, ঠোঙা বেঁধে, বিড়ি বেঁধে সর্বত্র হাড়খাটুনি পরিশ্রম করে জীবনধারণ করত না। সীমাবদ্ধ রোজগারে জীবনধারণ করত না। এমনকি চরম দারিদ্রতায় আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়, তবুও যৌনপেশায় আসে না। কোটি কোটি মহিলা দারিদ্র্যের যন্ত্রণায় ছটফট করে মরলেও তাঁরা যৌনপেশায় আসে না। প্রচুর অর্থলোভ ও সীমাহীন যৌনতার আনন্দ নিতেই বহুবল্লভা হয় এক শ্রেণির মহিলা। উপ জনজাতিদের মধ্যে অর্থনৈতিক অবস্থা দারিদ্র্যসীমার একেবারেই নীচে। পিঁপড়ে ডিম, ঝলসানো ছুঁচো, গাছের কন্দ ইত্যাদি খেয়ে যাঁদের জীবনধারণ করতে হয়, সেই আদিবাসীরা কখনো যৌনপেশায় এসেছে বলে শুনিনি।
