মানুন বা না-মানুন, বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন যৌনকর্মীদের পর্যবেক্ষণ করে, যে চিত্র উঠে আসে, তা হল চটজলদি মোটা অঙ্ক রোজগারের হাতছানিতে এই পেশা বেছে নেয়। লঙ আইল্যান্ড ও ওয়েস্টার থেকে গৃহবধূ হাতেগরম রোজগারের জন্য ১৯৭৩ সালে নিউইয়র্কে পেশাদার গণিকাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামে। এঁরা কারোরই আর্থিক অবস্থা খারাপ ছিল না। ভারতেও বহু মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত মহিলাদের মধ্য থেকেও অনেকে যৌনপেশায় আসে। প্রোফাইল যেমন ‘হাই’ হবে, সেই মহিলাকে বিছানায় পেতেও তেমন ‘হাই’ মূল্য গুণতে হবে। সিরিয়াল করতে করতে, সিনেমা করতে করতেও অনেক অভিনেত্রী যৌনপেশা চালিয়ে যায়। ধনবান ক্লায়েন্টরা সিনেমা-সিরিয়ালের মহিলাদের ও মডেল-কন্যাদের সঙ্গ পেতে চড়া মূল্য পর্যন্ত দিতে রাজি থাকে। অনেক কম পরিশ্রমে, অনেক কম সময়ে এককালীন নগদ মোটা অঙ্কের রোজগারের হাতছানি এড়ানো অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয় না। একটা সময়ে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। অর্থনেশা ও যৌননেশা উভয়ই। ধনীর দুলালি থেকে শুরু করে ধনী গৃহবধূ, আইপিএস অফিসারের স্ত্রী থেকে কর্নেলের স্ত্রী, স্বামী পরিত্যক্তা ও স্বামীহারা বিধবা বা বিবাহবিচ্ছিন্না মহিলা সহ সমাজের উঁচুতলার মহিলাদেরও এই পেশায় দেখা যায়। এঁরা গণিকাপল্লিতে ঘর নিয়ে কারবার নিশ্চয় করে না। কলগার্ল হিসাবে কাজ করে লোকচক্ষুর আড়ালে। কলগার্লের ফোন নম্বর রাখা থাকে হোটেল বা রিসোর্ট বা অন্য কোনো মধ্যস্থতাকারীর কাছে। কাস্টমারের চাহিদা অনুযায়ী ফোন করলেই সময়মতো চলে আসে কলগার্লেরা। এঁরা বেশিরভাগ অবদমিত যৌনতাড়নায় আসে এবং অবশ্যই মোটা টাকারও দাবি করে। সানি লিওন যৌনপেশায় এসেছিল অভাবের তাড়নায় নয়, এসেছিল শখে। একথা সানি লিওন নিজেই বলেছে এক সাক্ষাৎকারে। দেশের আর্থিক উন্নতি যত হচ্ছে যৌনকর্মীর সংখ্যা তত বাড়ছে। তার কারণ ভোগবাদী সমাজ বিস্তার লাভ করছে। আগে নির্দিষ্ট এলাকায় যৌনকর্মীদের দেখা মিলত, আজকাল শহরে-গ্রামে লোক সমাগম হয় এমন জায়গাতেও যৌনকর্মীদের দেখতে পাবেন। সম্ভ্রান্ত এলাকায় সম্ভ্রান্ত মহিলাদেরও যৌন-পরিসেবা দিতে দেখা যাচ্ছে। যথাযথ পয়সা ফেললে ‘অ-গণিকা’ কলেজ পড়ুয়া থেকে ঘরোয়া বধূদের পেতে পারেন কয়েক ঘণ্টার জন্য শয্যাসঙ্গিনী হিসাবে।
এই আদি পেশাটি বর্তমান সময়ে কোনো পল্লিতে বা কোনো মহল্লায় বা কোনো রেড লাইট এলাকায় আটকে নেই। গণিকাঁচর্চা এখন ভুবনজুড়েই। ২৪ ঘণ্টাই। ৩৬৫ দিনই। প্রযুক্তি খুলে দিয়েছে নতুন নতুন জানালা ও দরজা। যে খুশি সেখানে আসতে পারে, যেতেও পারে। ক্লায়েন্ট হিসাবে আপনাকেও কোনো গণিকাপল্লিতে মুখ লুকিয়ে ঢুকতে হবে না। সেক্স অ্যাডভেঞ্চার পাওয়ার জন্য গুগলে গিয়ে সার্চ করলেই হল। যৌনসঙ্গী আর যৌনসঙ্গিনীর বিশাল বাজার খুলে যাবে আপনার চোখের সামনে। অসংখ্য সাইট আপনার জন্য অপেক্ষা করে আছে ১০০% সুরক্ষা নিয়ে। আড়ালে-আবডালে অন্ধকারের অন্ধগলিতে এক চিলতে ঘরের দেড় হাত চওড়া সিঙ্গেল চৌকি নয়, ঝাঁ চকচকে বেডরুমে। যৌনবাজার এখন খোলা বাজার। এখান থেকেই পাওয়া যায় নিরাপদ কোনো নির্জন নিরাপদ ফ্ল্যাটের ঠিকানা।
আসুন, একটু অন্তর্জাল যৌনবাজার ঘুরে দেখে আসি। তার আগে কিছু প্রাসঙ্গিক কথা সেরে নেব। আমেরিকার যৌনকর্মীরা চিন্তিত অনলাইন গণিকাবৃত্তির অধিকার খর্ব করা নিয়ে একটি নতুন আইন। এই আইনবলে আমেরিকার অনলাইন দেহব্যাবসার সাইটগুলি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। এমতাবস্থায় নামজাদা গণিকা জনৈকা মলি স্মিথ তাঁর মতামত জানিয়ে বললেন –”শরীর নিয়ে ব্যাবসায়িক চুক্তি অনলাইনেই হলে গণিকাদের আর রাস্তায় গিয়ে দাঁড়াতে হয় না। তাতে তাঁদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় না, বিশেষ করে নতুনদের। তা ছাড়া গণিকারা প্রকাশ্যে এলে পুলিশ কর্তৃক ধরা পড়ার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। সরকার ভাত মারছেন আমাদের। যৌনপেশাকে ক্রিমিনালাইজ করলে তা কখনোই বন্ধ করা সম্ভব নয়। কোনো না-কোনোভাবে টিকে থাকবেই। অথচ তার খেসারত গুণতে থাকে এই পেশার সঙ্গে জড়িতরা।”
একেবারে শুরুর দিকে এই ধরনের ব্যাবসার সাইটগুলি কিছু দেশে বন্ধ করে দেওয়ার হিড়িক পড়লেও কিছু বাদে সাইটগুলি রমরমাভাবে চালু আছে সারা বিশ্বে। আইনগতভাবে আর বন্ধ করতে পারছে না। কারণ ওইসব দেহব্যাবসার সাইটগুলিতে দেহব্যাবসার নামগন্ধ পর্যন্ত থাকে না। সরাসরি দেহবিক্রির কোনোরূপ ঘোষণা থাকে না। মেসেজ পার্লারের পরিসেবা দেওয়ার ঘোষণা থাকে মাত্র। মেসেজ শরীর ও মন চর্চার অংশ। তাই মেসেজ পার্লার নিষিদ্ধ নয় কোনো দেশেই। এই মেসেজ পার্লারের বিজ্ঞাপন দেখে যাঁরা খাদ্য খোঁজার তাঁরা খুঁজে নেয়। নির্দিষ্ট সান্ধ্যভাষা, চিহ্ন, ছবি বা কিছু নমুনা দেখে ক্ষুধার্ত ক্লায়েন্ট বুঝে নেয়। অভিজ্ঞদের কোনোরূপ বেগ পেতে হয় না। তবে আজকাল অবশ্য সাইটের গণিকারা সরাসরিই উল্লেখ করে দেয় তাঁরা কোন্ ধরনের যৌন পরিসেবায় কত মূল্যে নেবেন।
শিকাগোর লোয়োলা ইউনিভার্সিটি এবং মিশিগান স্টেট ইউনিভার্সিটির মেরি ফিন, অ্যান্ট্রি হিনিয়ন প্রমুখ ক্রিমিনোলজিস্টরা এই ধরনের অনলাইন গণিকাবৃত্তির উপর একটি সমীক্ষা চালিয়ে হাতে যে তথ্য আসে, তা হল–মোট ৭১ জন গণিকা-মধ্যস্থতাকারী (Pimp) জানিয়েছেন তাঁরা নতুন টেকনোলজি অর্থাৎ অনলাইনেই বেশি আগ্রহী। অনলাইনের গণিকাদের রোজগার গড় ৭৫ হাজার ডলারের (বার্ষিক) কাছাকাছি। বর্তমানে আমেরিকার ৮০% যৌনপেশা অনলাইনের মাধ্যমেই হয়। কম-বেশি সব দেশেই এখন অনলাইন যৌনব্যাবসা বেছে নিয়েছে। শুধু অনলাইনে সাইটের মাধ্যমেই নয়, ফেসবুক, ইন্সট্রাগ্রাম ইত্যাদি সোস্যাল মিডিয়াকেও ব্যাপকভাবে যৌনপেশা প্রসারে ব্যবহার করা হচ্ছে। সমকামী থেকে বিষমকামী সকলেই সোস্যাল মিডিয়ায় ভিড় করছে। ফ্রান্সে তো যৌনব্যাবসার মূল মাধ্যমই টিল্ডার আর ফেসবুক। ইজরায়েলেও টিন্ডার নির্ভর যৌনব্যাবসা ফুলেফেঁপে উঠেছে। জাম্বিয়াতে আবার হোয়াটস অ্যাপ ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে, ফেসবুকও পিছিয়ে নেই। কলকাতায় বহুদিন হোয়াটস অ্যাপ যৌনব্যাবসা চালু আছে। নির্দিষ্ট নম্বরে হোয়াটস অ্যাপ নক করলেই একগুচ্ছ মেয়েদের ছবি চলে আসবে কাছে। তারপর নির্দিষ্ট ফ্ল্যাটে। চিন, জাপানের মতো দেশে যতই কড়া বিধিনিষেধ থাকুক না-কেন, বা জার্মানের মত উদারপন্থী দেশেও একই অবতার। সবসময়ই যে মধ্যস্থতাকারী যৌনকর্মীদের জন্য ক্লায়েন্ট সংগ্রহ করেন, তা কিন্তু নয়। অনেকক্ষেত্রেই গণিকারা মধ্যস্থতাকারীদের সযত্নে এড়িয়ে নিজেরাই ক্লায়েন্ট সংগ্রহ করে নিচ্ছে। যিনি যৌনতা বা শরীর বিক্রি করতে ইচ্ছুক, তিনি নিজেই সরাসরি বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বা নিষিদ্ধপল্লিতে অবস্থান করে যৌনবৃত্তি করার দিন শেষ হতে চলেছে। হাতের মুঠোয় অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল থাকলে হাতের মুঠোয় ক্লায়েন্ট পৌঁছে যাচ্ছে। এই ব্যবস্থায় মধ্যস্থতাকারীরা বা দালালরা অনুপস্থিত থাকায় ক্লায়েন্টদের থেকে প্রাপ্য পুরো পারিশ্রমিকটাই গণিকাদের। গণিকারা বাঁদরের ভাগ করা পিঠে খেতে চায় না। নিজের পিঠে নিজে বানাবে, নিজেই খাবে।
