ঠিক কবে থেকে শিল্পীদের মধ্যে নারীকে নগ্ন করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল? ঠিকঠাক সাল-তারিখ জানা না গেলেও একথা বলাই যায় সমাজে পুরুষ আধিপত্য কায়েম হওয়ার পর থেকেই নারীকে নগ্ন করা শুরু হয়। প্রাচীন তৈলচিত্ৰতেও আমরা নগ্ন নারীদের দেখতে পাই। মুসলিম যুগেও নগ্ন নারীর তৈলচিত্র পাওয়া যায়। নারীকে নগ্ন করা হত তা নয়, নারীদের নগ্ন রাখা হত। ক্রীতদাসী ও হারেমে রক্ষিত নারীদের নগ্নভাবে থাকতে হত। তাঁদের যেমন খুশি ব্যবহার করা হত। নিজ শরীরের উপর নারীদের কোনো অধিকার ছিল না। ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদীদের দাপটে নিন্মবর্ণের নারীদের ঊধ্বাঙ্গ অনাবৃত রাখতে হত। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্রে পুরুষরা নারীদের নগ্ন করতে নগ্ন দেখতে নানা অছিলায় লালায়িত। শরীরী বিভঙ্গের প্রশংসায় নারীও সজ্ঞানে-অজ্ঞানে পুরুষদের পাতা ফাঁদে নিজেদের পা গলিয়ে ফেলল। শরীরী-সৌন্দর্য প্রদর্শনে নারীরাও উদগ্রীব হয়ে উঠল।
সম্ভবত নগ্নচর্চা শুরু হয়েছে রাজাদের ইচ্ছাপূরণ ও মনোরঞ্জনের কারণে। অনুরূপ রাজাদের মনোরঞ্জনের শিল্পীরা চিত্র অঙ্কন করত, তেমনি নগ্ন তথা আদিরসাত্মক যৌনসাহিত্যও রচনা করত কবিরা। রাজারা নগ্নতা খুব পছন্দ করতেন। তাই রাজাদের খুশি করতে পারলে দামি উপটৌকন, সেইসঙ্গে সভাকবি বা রাজকবির পদ। চিত্রশিল্পীরাও পেতেন। সেকালে কবি-চিত্রশিল্পীরা রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতাতেই শিল্প-সাহিত্য সৃষ্টি করতেন। হাতুড়ি-ছেনি-তুলিতে ফুটিয়ে তোলা হত নারীর নগ্নতা। অশ্লীলতার সমালোচনার ঝড় এড়াতে সুপরিকল্পিতভাবে শিল্পের নামে মাহাত্ম বা মহিমা জুড়ে দেওয়া হল। নগ্নতাই হয়ে উঠল ‘শিল্প’। নারীকে যত খুশি যেমন খুশি নগ্ন করো, সামনে বসাও, শোয়াও, দাঁড় করাও এবং সুযোগ পেলে ভোগ করো। বিনিময়ে সামান্য পারিশ্রমিক দাও। সামান্য রোজগারের আশায় মফঃস্বল থেকে নিন্মবিত্ত এমনকি মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে মেয়েরা আসছে নগ্ন হতে। বেশিরভাগ মেয়েরা দারিদ্রতার কারণে সংসারে অভাব মেটানোর তাগিদে গোপনে এই পেশা বেছে নিচ্ছে। নগ্ন নারীদের চিত্র-ভাস্কর্য খুব চড়া দামেই বিকোয়। শিল্পীরা ‘দ্যুড আর্ট’ যতই মাহাত্ম্য আরোপ করুক না কেন, সমাজে এইসব মেয়েরা কুলটা’ বলেই ঘৃণিত।
(৭) আকর্ষণীয় পেশা হিসাবে গণিকা : সব মেয়েরাই যে পাচারকৃত হয়ে বা প্রতারিত হয়ে গণিকা পেশায় নিযুক্ত হচ্ছেন এ কথা বলা যায় না। প্রচুর মেয়েরা এ পেশায় আসছেন স্ব-ইচ্ছায়, কায়িক পরিশ্রমহীন মোটা টাকা রোজগারের হাতছানিতে। অন্য রোজগার থাকা সত্ত্বেও অতিরিক্ত রোজগারের আশায় যেমন আসে, তেমনি অভাবি মেয়ে-বউরাও গণিকাপেশায় আসে। আর পাঁচটা স্বাভাবিক পেশার মতোই এই পেশাকেও গ্রহণ করে।
তবে ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন এবং থাইল্যান্ড এই চারটি দেশে জরিপ তথ্য সাক্ষ্য দেয় যে, নিরক্ষর ও অদক্ষ মেয়েদের পক্ষে যেসব কাজ করা সম্ভব তার মধ্যে গণিকাবৃত্তিই সবচেয়ে বেশি অর্থাগম ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ, মালয়েশিয়ার ম্যানুফাঁকচারিং কোম্পানিতে কাজ করে ১৯৯০ সালে একজন দক্ষ শ্রমিক বছরে উপার্জন করত ২৮৫২ মার্কিন ডলার এবং একজন অদক্ষ শ্রমিক উপার্জন করত ১৭১১ মার্কিন ডলার। বিপরীতে সেই সময়ের হিসাবে কোনো নিন্মমানের হোটেলে যৌন-পরিসেবা বা শরীর বিক্রি করে একজন মহিলা সপ্তাহে মাত্র একদিন বারো ঘণ্টা কাজ করে বছরে ২০৮০ মার্কিন ডলার উপার্জন করতে পারত। স্কুল কলেজের ছাত্রীরা এবং গৃহবধূরা আজকাল স্বেচ্ছায় এই পেশায় আসছেন প্রচুর পরিমাণে। বাড়তি চাহিদা মেটাতেও এই পেশায় আসছে কাঁচা পয়সার হাতছানিতে। এই ভারতে তথা এই বাংলায় খুব গোপনে প্রচুর অর্থ রোজগারের আশায় মেয়েরা আসছে। এখন যৌনমিলনে কন্ডোম বাধ্যতামূলক। কন্ডোম ছাড়া কোনো মেয়েই যৌনকর্ম করে না। এর ফলে যেমন মেয়েদের গর্ভবতী হওয়ার ভয় নেই, তেমনি যৌনরোগেরও ভয় নেই। ফলে উদ্যাম যৌনকর্মে কোনোরকম ভয় কাজ করছে না। কন্ডোমের ব্যবহারের ফলে যৌনরোগেরও ভয় থাকছে না। এইসব মেয়েরা অনেকেই শিক্ষিত। ফলে ক্লায়েন্টের কাছ থেকে ঘৃণা নয়, সমীহ আদায় করে নেয় অনেকক্ষেত্রেই। এঁরা ট্রিপিকাল গণিকাদের মতো সারাক্ষণ পান চিবোয় না। ক্লায়েন্টের অনুরোধ না-থাকলে পারতপক্ষে মদ্যপান করে না, ধূমপান করে না। এইসব ধোপদুরস্ত মেয়ে-বউদের কাছে যৌনকর্মে ক্লায়েন্টরা স্বস্তি পায়। যৌনরোগের আশঙ্কায় ভোগে না ক্লায়েন্টরাও। এই শ্রেণির গণিকাদের রেটও যথেষট চড়া। যৌনপল্লির মতো ঘুপচি সিঙ্গেল খাটে যৌনক্রিয়া নয়। রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভেও অনেক মেয়ে-বউরা শাঁসালো পুরুষকে ক্লায়েন্ট হিসাবে বেছে নেয়। সমাজের আনাচে-কানাচে চলছে এহেন নিরন্তর যৌনকর্ম।
বছর কয়েক আগে সংবাদপত্রে একটি সংবাদ হয়তো সবাই পড়েছেন। যাঁরা পড়েননি, তাঁদের জন্য সংবাদটা উল্লেখ করলাম–ভারতের একটি শহর। থানায় এসে এক মহিলা সটান এসে বলল, “আমি বাজারের মেয়েছেলে নই। আমি যৌনকর্মী। এটাই আমার পেশা।” ডিউটি অফিসারের তো ভড়কে যাওয়ার দশা। মুম্বাইয়ের এক কলগার্ল উত্তরপ্রদেশের লখনউয়ে মহিলা থানায় অভিযোগ লেখাতে গিয়েছিলেন। শহরের কয়েকজন বিত্তবান ব্যক্তি এক পাঁচতারা হোটেলে এই মহিলার কাছ থেকে যৌন-পরিসেবা নিয়েছে। এরপর এই কলগার্লকে ন্যায্য পারিশ্রমিক তো দূরের কথা, উল্টে তাঁর কাছে থাকা প্রচুর পরিমাণে টাকাপয়সা ও অন্যান্য সামগ্রী যা ছিল, সব লুঠ করে ক্লায়েন্টরা পালিয়ে গেছে। মুখে তাঁর ইংরেজির ফুলঝুরি। মেয়েটিকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় পুলিশ আধিকারিকদের তো বিমূঢ় অবস্থা। নিজের পুরো কাহিনি শুনিয়ে বলল–“এই পেশা থেকে দুই কোটি টাকা আমাকে উপার্জন করতে হবে। সেই উপার্জনের অর্থে আমি একটা আধুনিক বিউটি পার্লার খুলব। এরপর এই পেশা ছেড়ে বিউটি পার্লার চালাব বাকি জীবন।” মেয়েটি পুলিশ আধিকারিককে জানায়, শরীরের জৌলুস ও বাঁধুনি ঠিক রাখতে একজন পেশাদার প্রশিক্ষকের কাছে তিনি যান। খাওয়াদাওয়ার ব্যাপারে তিনি খুব সচেতন। মাত্রাতিরিক্ত খাওয়ার ফলে শরীরে চর্বি জমে গেলে কদর থাকবে না। তাই সে ডায়াটিশিয়ানের পরামর্শ মেনে চলে। শুধু তাই নয়, তিনি প্রতি ছয় মাস অন্তর মেডিকেল চেক আপও করিয়ে নেয়।
