(৫) রূপোলি পর্দায় গণিকা : মুভিমোগল শেখর কাপুর, রাজকাপুর প্রমুখ কতিপয় চলচ্চিত্র নির্মাতা খুব কায়দা করে সেলুলয়েডে নারী-শরীর বিক্রি করতেন মুনশিয়ানার সঙ্গে। এইসব নির্মাতারা বিলক্ষণ জানেন নারীর খোলা বুক, নগ্ন পা, খোলা পিঠ, স্বচ্ছ সাদা কাপড়ে জলে-ভেজা নগ্ন শরীর ভালো বিকোয়। তাই কোনো না কোনো ছুতোনাতায় নারী-শরীরের গোপন সেলুলয়েড বন্দি করে ফেলবে। কখনো-বা অভিনেত্রীর উপর প্রভাব খাঁটিয়ে, কখনো যথেষ্ট পারিশ্রমিক দিয়ে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই একদম আনকোরা মেয়েদের ব্যবহার করা হয়। সেইসব মেয়েরাও ইন্ডাস্ট্রিতে কেরিয়ারের স্বপ্ন দেখে রাজিও হয়ে যায়। অভিনেত্রীদের বোঝাতে সক্ষম হয় যে তারা কত মহান কাজ করতে চলেছে, ইতিহাস রচনা করতে চলেছে। সত্যি কথা বলতে কি সেইসব অভিনেত্রীরা বেশিদূর আর এগোতে পারে না। সব হারিয়ে যায় অকালেই। কারণ দর্শকরাও সেই অভিনেত্রীর কাছ থেকে কেবলমাত্র নগ্নতাই প্রত্যাশা করে। অল্পস্বল্প নারী-অঙ্গ দেখাতে দেখাতে নির্মাতারা এতটাই সাহসী হয়ে ওঠে যে নগ্নতা তথা যৌনমিলনের দৃশ্যও টেক করতে শুরু করে দেয়। ভারতীয় চলচ্চিত্রে এইসব দৃশ্য সেন্সর বোর্ড আটকে দিলেও হলিউডের চলচ্চিত্রগুলিতে সেইসব নগ্নতা তথা যৌনমিলনের দৃশ্য প্রদর্শন করা হয়। চলচ্চিত্র উৎসবে সেইসব আন-সেন্সর্ড সিনেমা দেখার জন্য দর্শকরা পাগলের মতো ছুটে গিয়ে প্রেক্ষাগৃহ হাউসফুল করে দেয়। নারীর নগ্ন শরীর দেখিয়ে প্রযোজকরা ফুলেফেঁপে ওঠে। তবে ভারতীয় চলচ্চিত্রে খুল্লামখুল্লা দৃশ্যায়ন হলে সেন্সর পায় না বটে, কিন্তু এ ধরনের সিনেমা তৈরি তাতে থেমে থাকে না। প্রচুর রগরগে যৌনদৃশ্য তৈরি করা হয়। খুব কম পয়সা বিনিয়োগ করে প্রচুর মুনাফা অর্জনের লোভ ছাড়বে কে? কসমিক সেক্স, দি ডিভাইন সেক্স, গাণ্ডু, মাশরুম (ছত্রাক), রঙ রসিয়া, কামসূত্র, কামসূত্র থ্রিডি, সিদ্ধার্থ, মচালতা জওয়ানি, রেশমি কি জওয়ানি, গোলাবি রাতে, হর রাত নই খিলাড়ি ইত্যাদি মুভি নারী-শরীর নির্ভর করেই। এইসব চলচ্চিত্রের অভিনেত্রীদের ‘গণিকা’ বই অন্য কিছু বলে না মানুষ।
মেইন স্ট্রিমের এইসব মুভিতে যৌনদৃশ্য কেন সেলুলয়েডে বন্দি করা হয়? নির্মাতারা বলেন–“চিত্রনাট্যের ডিমান্ড”। চিত্রনাট্যের ডিমান্ড কীভাবে তৈরি হয়? ঈশ্বর-প্রেরিত পূর্বনির্ধারিত ব্যাপার নাকি? আসলে কোনো মুভিতে কোথায় কতটা নগ্ন যৌনতা রাখা হবে, তা পরিকল্পিতভাবেই করা হয়। এটাই ব্যাবসায়িক কৌশল। প্রোডিউসারদের নির্দেশ। ব্যাবসা ভালো হয়। সেভাবেই ছক কষা হয়। কারণ ওই রগরগে যৌনদৃশ্যই মুনাফা আনবে। চিত্রনাট্যের ডিমান্ড একটা ভাঁওতা। সংশ্লিষ্ট মুভি যৌনদৃশ্যগুলি বাদ দিয়ে দেখানো হলে আপনি বুঝতেই পারবেন না, সেখানে কোনো যৌনদৃশ্যের প্রয়োজন আছে। একটা উদাহরণ দিই। আপনারা নিশ্চয় ‘মাশরুম’ বা ‘ছত্রাক’ মুভির নাম শুনেছেন? এই মুভির কোনো একটি দৃশ্যে দেখানো হয়েছে অভিনেত্রী পাওলি দাম নীচে পা ঝুলিয়ে খাটের উপর সম্পূর্ণ উলঙ্গ চিৎ হয়ে শুয়ে আছে। অভিনেতা অনুব্রত মণ্ডল পাওলির দু-পা ফাঁক করে উপরদিকে তুলে ধরে যৌনাঙ্গ চাটছে। পাওলির সংলাপ–“উফ উফ, চাট চাট”। এই দৃশ্য মুভি রিলিজের আগে ইন্টারনেটে লিক হয়ে মোবাইলে মোবাইলে ছড়িয়ে পড়ে। মাশরুম বা ছত্রাক মুভি কজন দেখেছেন সেটা বলা মুশকিল, পাওলি-অনুব্রতর যৌনদৃশ্যের ভিডিও ক্লিপিংটি দেখতে বোধহয় কেউ বাকি নেই। এখনও নেট সার্চ করলে এই ভিডিও ক্লিপিংটা পাওয়া যায়। যারা ‘মাশরুম’ বা ‘ছত্রাক’ মুভিটি দেখেছেন, তারা কি বলতে পারবেন মুভিতে ওই দৃশ্যটি কোথায় ছিল? বলতে পারবেন না। কারণ ওই দৃশ্যটি মুভিতে রাখাই যায়নি। এমনকি কান ও টরেন্টের চলচ্চিত্র উৎসবেও ওই দৃশ্যটি দেখানো যায়নি। যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে মুভি জগতের সঙ্গে জড়িত আছেন, তাঁরা বিলক্ষণ জানেন সেন্সর বোর্ড কী ছাড় দেবেন আর কী ছাড় দেবেন না। সেন্সর নির্দিষ্ট গাইড লাইন আছে। সেই গাইড লাইন কী নির্দেশ আছে সে বিষয়ে সকলেই অবগত। তা সত্ত্বে এই যৌনদৃশ্য বা যৌনমিলনের দৃশ্যগুলো সেলুলয়েডে বন্দি করা হয় কেন? উদ্দেশ্য দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। শুধু ভারতেই নয়, পৃথিবীর সর্বত্রই এক শ্রেণির অভিনেতা-অভিনেত্রীরা সেলুলয়েডে যৌনমিলনের দৃশ্য সেলুলয়েড বন্দি করে। এক একটা মুভি এমন তৈরি করা হয়, সেগুলি পর্নোমুভি বলাই যায়। সেলুলয়েডে সেক্স করা অভিনেত্রী (‘গাণ্ডু’ ও ‘কসমিক সেক্স’ খ্যাত) ঋতুপর্ণা ওরফে ঋ এক সাক্ষাৎকারে কী বলছে, পড়ুন – “আমার শরীরের মালিকানা আমার। দোকান সাজিয়ে বসেছি। বেচতে লজ্জা কীসের! আমার বাবু আর আমার দালাল আমি নিজেই। যারা আমার শরীর দেখে লজ্জা পান, উত্তেজিত হয়ে পড়েন, তাঁরা হোন। কিন্তু এই যে প্রতিনিয়ত তাঁদের আদিম সত্তাকে ‘ট্রিগার’ করি, এটাই কানেকশন উইথ মাই অডিয়েন্স।” কী বুঝলেন? গণিকা!
২০২০ সালের মার্চ মাস থেকে সারা বিশ্বে করোনা প্যানডেমিকের প্যানিকে লক ডাউন ঘোষণা হল। বলা হল মুখে মাস্ক এবং অবশ্যই সোস্যাল ডিসট্যান্সিং মেনে চলতে হবে। স্তব্ধ হয়ে রুজিরোজগার। কোটি কোটি মানুষ কাজ হারাল। সেই ভয়ংকর প্রভাব থেকে যৌনপল্লিও রেহাই পেল না। কোনো ক্লায়েন্ট আর যৌনকর্মীদের সংস্পর্শে আসতে চাইলেন করোনার ভয়ে। যৌনকর্মীরা ভাতে মারা গেল। রোজগার বন্ধ হয়ে গেল। মাসের পর মাস। লক ডাউন উঠে গেলেও যৌনবাজার স্বাভাবিক হল না। এমতাবস্থায় যৌনপল্লির যৌনকর্মীরা যেমন সংকটে পড়ে গেল, তেমনি যৌনপল্লির বাইরে স্বাধীন যৌনকর্মীরাও সংকটের মধ্যে পড়ে গেল। ঠিক এমন সময়ে এক শ্রেণির শর্টফ্লিম নির্মাতারা আসরে নেমে পড়ল। শর্টফ্লিমের নামে যৌনমিলনের মুভি তৈরি করতে থাকল। এইসব মুভিতে সুযোগ পেতে থাকল যৌনকর্মীরা। নতুন মেয়েরাও এই মুভিতে কাজ করতে শুরু করে দিল যাঁরা অনেকেই লক ডাউনে কাজ হারিয়েছে। এইসব মুভি বিশেষ কিছু অ্যাপ ইনস্টল করে দেখতে হয়। নির্ধারিত সাবস্ক্রিপশন দিয়ে। তেমনই কিছু অ্যাপের নাম Hothit, 11Up Movies, Unseen, Uncutmasala, Eightshots, Fliz Movies ইত্যাদি। শর্ট ফ্লিমের এই নব সংস্করণের বাজারি নাম ওয়েব সিরিজ। এই মুভিগুলি আসলে সেলুলয়েডে বন্দি অবাধ যৌনকর্ম। রমরমা বাজার। সেন্সর বোর্ডের নজরদারি নেই। এইসব মুভিতে বহু পরিচিত অংশগ্রহণকারী মুখগুলি হল–টিনা নন্দী, জোয়া রাঠোর, কাজল গুপ্তা, সোনিয়া মাহেশ্বরী, কবিতা রাধেশ্যাম, আলিশা, জারা, সীমা, সুচরিতা, দোলন, রিংকি চোপড়া, এলিজা প্রমুখ। এঁদের অভিনেত্রী বললে অভিনেত্রীদের অপমান করা হবে। এঁরা গণিকাই, যাঁরা অর্থের বিনিময়ে বিভিন্ন পুরুষের সঙ্গে যৌনকর্ম করে। পুরুষ যৌনকর্মীরাও এই ট্রেন্ডে কাজ করছে। বিশ্বকে দেখানোর যৌনকর্ম এবং মোটা অঙ্কের রোজগার।
