“ওরা আমার বাবা-মাকে মেরে ফেলে, দুজনকেই বন্দুকের বাট দিয়ে পেটাতে পেটাতে মেরেছে। এরপর মেঝেতে আমাকে চিৎ করে শুইয়ে তিনজন মিলে ধর্ষণ করেছে।” এমনটা বলেছে বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত পেট্রাপোলের উদ্বাস্তু শিবিরের এক ষোড়শী। একই প্রতিবেদনের ভাষ্য, “ভিটেমাটি ছেড়ে প্রাণভয়ে পালাতে থাকা পরিবারগুলোর মেয়েদেরও হামলা চালিয়ে ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে এবং এরপর বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে পাকবাহিনীর কাছে। অবশ্য পরিবারগুলো মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছুটিয়ে নিয়েছে অনেককে। যাঁরা পারেনি, তাঁদের ঠাঁই হয়েছে রাজাকারদের খোলা বেশ্যালয়ে। (টাইমস—২১ জুন ১৯৭১)
সরকারি তথ্য অনুযায়ী পাকিস্তানে ধরে নিয়ে যাওয়া কমফোর্ট’ নারীদের মধ্যে ২৫,০০০ নারী ফোর্সড প্রেগনেন্সির শিকার হয়। তবে ‘ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটির সভাপতি ডা. এম এ হাসান বলেন—সংখ্যাটা ৮৮,২০০ জন। ২০০৯ সালে ‘ওয়ার ক্রাইম ফ্যাক্টস ফাইন্ডিংস কমিটি’ একটি জরিপে উল্লেখ করে–১৯৭১ সালে ২৫ মার্চের কালো রাতে ‘অপারেশন সার্চ লাইট’-এর মাধ্যমে নিরপরাধ বাঙালি নারীদের উপর নির্যাতন শুরু হয়। ১৯৭১ সালের মার্চে ১৮,৫২৭ জন, এপ্রিলে ৩৫,০০০ জন, মে মাসে ৩২,০০০ জন, জুন মাসে ২৫,০০০ জন, জুলাই মাসে ২১,০০০ জন, আগস্ট মাসে ১২,০০০ জন, সেপ্টেম্বর মাসে ১৫,০০০ জন, অক্টোবর মাসে ১৯,০০০ জন, নভেম্বর মাসে ১৪,০০০ জন, ডিসেম্বর মাসে ১১,০০০ নারী ধর্ষণের শিকার হয়। ১৯৭১ সালের ২২ ডিসেম্বর শেখ মুজিবর রহমান এইসব ধর্ষিতা নারীদের ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দেন। কিন্তু ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিটি সামাজিকভাবে নেতিবাচক হয়ে গেছে। এইসব নারীরা সম্মানের বদলে পেয়েছে কটুক্তি, বঞ্চনা ও গঞ্জনা। এ উপাধি যেন লজ্জার। বাংলাদেশের ইতিহাসে ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সিনেমাগুলিতে ‘বীরাঙ্গনা বিষয়টিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যে, বীরাঙ্গনার অর্থ দাঁড়িয়ে গেল ধর্ষিতা। ধর্ষিতা? অর্থাৎ বেশ্যা, কুলটা।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এইসব নারীদের নিয়ে বিপাকে পড়ে তাঁদের পরিবারগুলি। তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে সবচেয়ে বড়ো বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় সমাজব্যবস্থা এবং বিবাহিত নারীদের মধ্যে অনেককেই তাঁদের এমন কি অনেক মুক্তিযোদ্ধা স্বামীরাও গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। ঐ পরিস্থিতিতে অনেককেই বেছে নিতে বাধ্য করে আত্মহত্যার পথ। আবার অনেকেরই জায়গা হয় গণিকালয়ে।
যে দেশের স্বপ্ন চোখে নিয়ে নারীর সম্ভ্রম হারাল, যে মানুষদের জন্য যেসব নারীরা আত্মত্যাগ করল, সেইসব নারীদেরই পরিবার সমাজ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করল। সেইসব বীরাঙ্গনাদের ঠাঁই হল গণিকাপল্লিতে। দেশ স্বাধীন হয়, মর্যাদা পায় না ধর্ষিতা নারীরা। তাঁদের মনে রাখতে চায় না কেউ। সমাজ ‘বেশ্যা’ বলে ঘৃণা করে। অবশ্য পরবর্তী সময়ে বীরাঙ্গনা নারীদের মুক্তিযোদ্ধা এবং তাঁদের সন্তানদের মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হল। বর্তমানে এইসব ধর্ষিত বীরাঙ্গনাদের উদ্দেশ্যে ‘বেশ্যা’ বললে তা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হয়।
১৯৪৬ থেকে ১৯৪৭ সালে দেশভাগের কারণে এক ভয়ংকর সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয় ভারত-পাকিস্তান উভয় দেশেই। লাখো লাখ মানুষ যেমন হত্যা হয়েছিল, তেমনি লাখো লাখো নারীকে ধর্ষিতা হতে হয়েছিল। একসময় শান্ত হল দুই যুযুধান সম্প্রদায়। কিন্তু সেই ধর্ষিতা নারীদের কেউ মনে রাখেনি। সমাজ প্রত্যাখ্যান করেছিল। অবশেষে ঠাঁই হল গণিকালয়ে। এটাই শেষ আশ্রয়। গণিকালয় ভরে উঠল। যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, দেশভাগের পরিণতিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় মেয়েরা। প্রতিপক্ষ ছিঁড়েখুঁড়ে খায় নারীশরীর। মেয়েদের দিকেই নেমে আসে আক্রমণের প্রথম বুলডোজারটা। মেয়েরা পতিত হয়।
(৩) উপনিবেশের ফলে গণিকা : শুধু ভারতবর্ষেই নয়, গোটা বিশ্বে এমন কোনো দেশ খুঁজে পাওয়া যাবে না যেখানে বিদেশি রাষ্ট্রের উপনিবেশ ঘটেনি। ভারতের কথাই যদি ধরি, তাহলে বলাই যায়, বিদেশি উপনিবেশ ব্যাপকভাবে হয়েছে। কারা উপনিবেশ করেনি–ফরাসি, পোর্তুগিজ, ডাচ, ব্রিটিশ ইত্যাদি। এঁরা নেটিভদের ঘৃণা করত। মেয়েদেরকে কেবলমাত্র ভোগের বস্তু মনে করত। ব্রিটিশ কর্তৃক ভারতীয় মেয়েরা কম ধর্ষিতা হয়নি। লুষ্ঠিত হয়েছে নারী। ব্রিটিশ উপনিবেশকালে ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় হাজারে হাজার গণিকা আর গণিকালয় সৃষ্টি হয়েছে। সৃষ্টি করেছিল নিজেদের ও তাঁদের উপোসী সেনাদের কাম চরিতার্থ করার জন্য। এইভাবে বিদেশিদের দ্বারা স্বদেশি নারীরা বারবার লালসার শিকার হয়েছে। লালসা মেটার পর গণিকালয়ের আস্তাকুড়ে ঠেলে দিয়েছে।
(৪) পর্নোগ্রাফির গণিকা : পর্নো-গণিকাবৃত্তি ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছিল? চলমান ছবি আবিষ্কারের পরে পরেই যৌন উত্তেজক চলচ্চিত্রের উৎপাদন শুরু হয়। প্রথমদিকের দুই ফরাসি ইউজেন পিরো (Eugene Pirou) এবং আলবার্ট কারচনার (Albert Kirchner) ছিলেন যৌন উত্তেজক চলচ্চিত্রের অগ্রণী। আলবার্ট কারচেনার বন্ধু পিরোর জন্য প্রথম লাইভ যৌন উত্তেজক ফিল্ম পরিচালিত। তিনি ১৮৯৬ সালে ৭ মিনিটের Le Coucher de la Mariee’ শিরোনামে লুইস উইলি একটি বাথরুম স্ট্রিপটিজ চলচ্চিত্র সম্পাদন ও পরিচালনা করেছিলেন। অভিনয় করেছিলেন লুইস উইলি (Louise willy)। এছাড়াও ১৮৯৬ সালে ফাতিমার ‘Coochie Coochie Dance’ নামক এই ধরনের একটি বেলি ডান্সারের চলচ্চিত্র হিসাবে মুক্তি পায়। ১৯১০ সালে জার্মান ফিল্ম ‘আম অ্যাবেড’ (Am Abend) দশ মিনিট ফিল্ম, যা একজন মহিলা তাঁর শোবার ঘরে একা হস্তমৈথুন করা শুরু করে এবং Straight Sex ও পায়ুমৈথুনরত (Penetration) একজন ব্যক্তিকে সেই দৃশ্যে দেখা যায়। পর্নোগ্রাফিক সিনেমা ১৯২০ সালে নির্বাক চলচ্চিত্র যুগেও বিস্তৃত ছিল এবং প্রায়শই গণিকালয়গুলিতে প্রদর্শিত হত।
