নারী ও শিশু পাচারে পশ্চিমবঙ্গের স্থান সারা ভারতে প্রথম। এই হিসাব জাতীয় অপরাধ তথ্য-পরিসংখ্যান দপ্তরের, যা পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের সরকার ও এনজিওগুলো ভুল বলে দাবি করছে। কেন্দ্রীয় সরকারের নারী ও শিশুকল্যাণ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী কৃষ্ণা রাজ সংসদে জানিয়েছেন, বাল্য বিবাহ এবং নারী ও শিশু পাচারে পশ্চিমবঙ্গ সারা দেশের সমস্ত রাজ্যের মধ্যে প্রথম স্থানে রয়েছে। প্রতি বছরই নারী পাচারের সংখ্যাটা বাড়ছে। রাজ্যসভায় এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে কৃষ্ণা রাজ জানান, ২০১৫-১৬ সালে পশ্চিমবঙ্গ নারী ও শিশু পাচারে পয়লা নম্বরে ছিল। ২০১৫ সালে ২০৬৪ জন নারী পাচার হয়েছে। পরের বছর সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫৫৯ জন। শিশু পাচার ২০১৫ সালে ছিল ১৭৯২ জন, ২০১৬ সালে সেটা প্রায় দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩১১৩ জনে। নারী ও শিশু কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী এই হিসাব দাখিল করেছেন ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরোর তথ্য উদ্ধৃত করে। রাজ্য সচিবালয়ের দাবি, আগের সরকারের আমলে নারী ও শিশু পাচারের ঘটনা ঘটলেও তা পুলিসের খাতায় নথিভুক্ত হত না। রাজ্যের নারী ও শিশু কল্যাণ মন্ত্রী শশী পাঁজা নিজে অবশ্য এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে দলীয় সাংসদ কাকলী ঘোষ দস্তিদার দাবি করেছেন, কেন্দ্র সরকারের দেওয়া এই রিপোর্ট ভুল। রাজ্যে শিশু পাচারের দায়ে অভিযুক্ত খোদ বিজেপি নেতা-নেত্রীরা। তাই এখন ভুল পরিসংখ্যান দিয়ে অন্য দিকে নজর ঘোরানোর চেষ্টা চলছে।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর এই তথ্য-পরিসংখ্যানকে ভুল না-বললেও অন্য একটি অসংগতির দিকে নির্দেশ করেছেন দুর্বার মহিলা সমন্বয় কমিটির দায়িত্বে থাকা ডাঃ স্মরজিৎ জানা। সোনাগাছির গণিকাপল্লিতে বহু বছর ধরেই যৌনকর্মীদের অধিকার নিয়ে লড়ছে দুর্বার, যার মধ্যে এক বড়ো কাজ অনিচ্ছুক যৌনকর্মীদের উদ্ধার করা। অর্থাৎ জোর করে, ইচ্ছের বিরুদ্ধে, কিংবা ভুলিয়ে-ভালিয়ে যৌনপেশায় আনা হয়েছে যে মেয়েদের, যাঁরা পাচার হয়ে এসেছে, দুর্বার তাঁদের চিহ্নিত করে হয় বাড়িতে ফেরত পাঠায়, অথবা বিকল্প কর্মসংস্থান করে। ডঃ জানার বক্তব্য, যারা যৌনপেশায় আসছে প্রতি বছর, তাঁদের সবাইকেই পাচার হওয়া মেয়ে হিসাবে দেখানো হয় ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্যে। কিন্তু অনেক মেয়েই স্বেচ্ছায়, জীবিকার তাগিদে যৌনপেশায় আসে।
দুর্বারের নিজের কাছে এ সংক্রান্ত যা তথ্য আছে, তাতে দেখা যায় অর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা মেয়েরা সাধারণত তিন ধরনের কাজে মূলত শহরে আসে। গৃহ পরিচারিকার কাজ, নির্মাণ শ্রমিকের কাজ এবং যৌনপেশা। প্রথম দুটি কাজ যেহেতু পরিশ্রম-সাপেক্ষ এবং সেই তুলনায় মজুরি যথেষ্ট নয়, তাই সবাই ওই পরিশ্রমের কাজ করতে চায় না। এমতাবস্থায় নিজেরাই অপেক্ষাকৃত কম শারীরিক পরিশ্রমের, কিন্তু বেশি উপার্জনের পেশা যৌনপেশা বেছে নেন। ডাঃ স্মরজিৎ জানার বক্তব্য, এটা একটা বাস্তব প্রবণতা, যাকে উপেক্ষা করা যায় না। বরং অগ্রাহ্য করা যায় কেন্দ্রীয় মন্ত্রকের সংসদে দেওয়া ওই তথ্যকে, যা সমস্যার পুরোটা দেখছে না।
একদা যেটা সম্রাট বা রাজা বা জমিদাররা নিজস্ব লেঠেল বাহিনীদের কাজে লাগিয়ে মেয়েদের তুলে আনত বাইজি বা গণিকা বা রক্ষিতা বানানোর জন্য। আজও মেয়েদের ফুসলিয়ে আনা হয় নানারকম প্রলোভন দেখিয়ে। ভারতে ব্রিটিশ আমলে খ্রিস্টান শাসকদের এবং সেনাদের মনোরঞ্জনের জন্য নতুন নতুন গণিকাপল্লি গড়ে ওঠে। সেই গণিকাপল্লি ফলেফুলে ভরিয়ে তুলতে খ্রিস্টান শাসকদের (ব্রিটিশ) পা-চাটা কতিপয় নারী ও পুরুষ উভয়েই প্রত্যন্ত গ্রামে ঢুকে পড়ত মেয়ে সংগ্রহ করতে। মেয়ে তুলে আনার বিনিময়ে প্রাপ্তি হত প্রচুর অর্থ ও উপঢৌকন। এমনকি অতি লোভে মন্দির থেকে দেবদাসীদের পর্যন্ত গণিকালয়ে তুলে আনা হত।
গণিকালয়গুলিতে ‘আড়কাঠি’ শব্দটি খুব শোনা যায়। আড়কাঠি হাল আমলের কোনো নতুন ব্যবস্থা নয়। প্রাচীন যুগেও আড়কাঠি ছিল, যাঁরা ‘বিট’ নামে পরিচিত ছিল। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে রাজা শূদ্রক রচিত সংস্কৃত নাটক ‘মৃচ্ছকটিকম’ নাটকে বিট চরিত্রের উল্লেখ আছে। তবে আজকের আড়কাঠিদের সঙ্গে প্রাচীনযুগের বিটদের মূলগত পার্থক্য আছে। নাট্যশাস্ত্রে বিটের লক্ষণে বলা হয়েছে–বিট হবেন গণিকাগণের সঙ্গে ব্যবহারে বিশেষজ্ঞ, মধুরভাষী, পক্ষপাতহীন, কবিভাবাপন্ন, শাস্ত্রাৰ্থ ও গণিকা সম্বন্ধে জ্ঞানসম্পন্ন, ইতি ও নেতিবাচক যুক্তিসম্পন্ন বাগী ও চতুর। বিট ব্রাহ্মণ, শিক্ষিত, সংস্কৃতভাষী ও প্রাকৃতভাষী দুই-ই হতে পারে। মৃচ্ছকটিক প্রকরণে দুজন বিট চরিত্র পাওয়া যায়। একজন বসন্তসেনার, অপরজন শকারের। ইন্টারন্যাশনাল জাস্টিস মিশন (IJM) বহু বছর ধরে পাচারকৃত যৌনকর্মীদের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনার কাজ করে চলেছে। আমাদের দেশে প্রতি বছর প্রায় ২০,০০০ হাজার মেয়ে কিডন্যাপিং হয়, যার বেশিরভাগরেই জায়গা হয় যৌনপল্লিতে।
(২) যুদ্ধ, সাম্প্রদায়িকতা ও দেশভাগের ফলে গণিকা : আদিমকাল থেকে যুদ্ধের ময়দানে পুরুষের বর্বরতার শিকার হয় নারী। এটা সর্বত্র সত্য, সব দেশেই। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে চার লক্ষ নারী ধর্ষিত হয়েছিল। ধর্ষক পাকিস্তানি সেনা ও পাকপন্থী রাজাকার। বিশ্বের ইতিহাসে যুগ যুগ ধরে দেখা যায় যে-কোনো জাতিকে দমন করার জন্য, নির্মূল করা জন্য দুটি অস্ত্র এক সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে। তার একটি গণহত্যা, অপরটি ধর্ষণ। মহান মুক্তিযুদ্ধে হানাদার বাহিনীর একটি বড়ো ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ ছিল নারী ধর্ষণ। এই যুদ্ধকালীন সময়ে নারী ধর্ষণ ছিল পাকবাহিনীর একটি অস্ত্র। একাত্তরে বাংলাদেশের নারীদের উপর যৌন নির্যাতনের ব্যাপকতা, নৃশংসতা এ যাবৎকালে বিশ্বে সংগঠিত সকল যৌন-নির্যাতনের শীর্ষে এবং তা মানব ইতিহাসে বিরল। এটি ছিল পাকিস্থানের দীর্ঘ পরিকল্পনার অংশ, অত্যন্ত সুকৌশলে এ দেশের পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে নিজেদের উত্তরসূরি’ রেখে যাওয়া, যাতে এরা ভবিষ্যতে মাথা উঁচু করে না দাঁড়াতে পারে। ১৯৭১ সালে পাকবাহিনী ও তাঁদের সহযোগী রাজাকার, আলবদর, আলশামসদের সাহায্যে এ-কাজটি করে। তাঁদের আক্রোশ থেকে দেশের কোনো অঞ্চলই বাদ পড়েনি, তাঁরা সারা দেশে যত্রতত্র এই অত্যাচার চালায়। জোর করে তুলে নিয়ে যাওয়া হত ক্যাম্পে। যাতে পালাতে না পারে, তাই বিবস্ত্র করে রাখা হত মেয়েদের। মাথায় চুল পেঁচিয়ে যাতে আত্মহত্যা করতে না-পারে, তাই তাঁদের মাথার চুল কেটে ফেলা হত। তাঁদের ধর্ষণ করা হত দিনের পর দিন। এর ফলশ্রুতিতে এই বিশাল সংখ্যক ধর্ষিতা নারীদের একটি বড় অংশ গর্ভবতী হয়ে পড়ে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী ধর্ষণের ফলে অন্তঃসত্ত্বার সংখ্যা ছিল প্রায় ৮০০০। সাক্ষাৎকারের বিভিন্ন অংশে ডঃ ডেভিস বলেন—“সবচেয়ে সুন্দরী ও বিত্তশালী পরিবারের মেয়েদেরকে অফিসারদের জন্য রেখে বাকিদের সৈন্যদের মাঝে ভাগ করে দেওয়া হত।”
