কীভাবে পাচার হয় নারী ও শিশু? (১) মূল হোতা : যে ব্যক্তি পাচারের মূল ব্যাবসা পরিকল্পনা, পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করে থাকে, তাকে পাচারকারী চক্রের মূল হোতা হিসাবে আখ্যায়িত করা যায়। পাচার সংক্রান্ত অর্থের লেনদেন এবং পাচার প্রক্রিয়ার প্রশাসনিক কার্যাবলি এই ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকে। মূল হোতা যে দেশের নাগরিক সে দেশে তাঁর কর্মক্ষেত্র বা দপ্তর থাকতে পারে। আবার তাঁর কর্মস্থল আন্তর্জাতিক ক্ষেত্র পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ক্ষেত্রবিশেষে অন্য দেশের পাচারকারী চক্রের সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে সে পাচারকার্য সম্পন্ন করে থাকে। (২) দালাল : দালাল হল সেই মধ্যস্বত্বভোগী, যাঁর দেশের ভিতরে বিভিন্ন এলাকায় নেটওয়ার্ক আছে। এই নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নারী ও শিশু সংগ্রহ করে এবং পাচারকারী চক্রের প্রতিনিধি অথবা পাচারকৃতদের ব্যবহারকারী সংগঠনের হাতে তুলে দেয়। (৩) সংগ্রহকারী : দালালের নেটওয়ার্কের অভ্যন্তরে যেসব ব্যক্তি স্থানীয়ভাবে লোক সংগ্রহ করে দেয়, তাঁদেরকে বলা যেতে পারে সংগ্রহকারী। আরও ব্যাখ্যা করলে সংগ্রহকারী বলতে বোঝায় পাচারের কাজে নিয়োজিত সেইসব লোক, যাঁরা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নারী ও শিশু সংগ্রহের কাজকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করেছে। সংগ্রহকারী সাধারণত নিজ গ্রাম থেকে নারী ও শিশু সংগ্রহ করে না, অন্যান্য গ্রাম থেকে তাঁদের সংগ্রহ করে থাকে। অপেক্ষাকৃত ছোটো দালাল আবার নিজেই সংগ্রহকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে সংগ্রহকারী একেবারে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সক্রিয় থাকতে পারে। (৪) সহযোগী : পাচার একটি সংগঠিত চক্রের কাজ। কিন্তু সমাজের বিভিন্ন অংশ যেমন পরিবার, স্থানীয় নেতা, ব্যবসায়ী, পরিবহন শিল্পে কর্মরত লোক, স্থানীয় মস্তান—এরা বুঝে অথবা না বুঝে কিছু অর্থনৈতিক লাভের জন্য পাচারের কাজে সহায়তা করে। এই শ্রেণিকে নারী ও শিশু পাচারের সহযোগী বলা যায়। পাচারের উদ্দেশ্যে সংগ্রহ করা নারী ও শিশুর পরিবার থেকে শুরু করে সীমান্তরক্ষী বাহিনী পর্যন্ত এ ধরনের সহযোগী ব্যক্তিদের পাওয়া যায়। (৫) পরিবার : একজন দালাল যখন সংগ্রহের কাজ করে তখন পরিবারের সদস্যরা অনেক ক্ষেত্রে জেনেশুনেও নারী বা শিশুকে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেয়। জামাইবাবু শালীকে অথবা মামা ভাগ্নিকে পাচারকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার মত ঘটনাও ঘটে থাকে। (৬) পরিবহন চালক এবং মালিক : পাচারের উদ্দেশ্যে সংগৃহীত নারী ও শিশুদেরকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নেওয়ার জন্য বিভিন্ন রকমের পরিবহন ব্যবহার করা হয়। যেমন—রিক্সা, ভ্যান, বাস, নৌকা, ট্রাক ইত্যাদি। এ সকল যানবাহনের চালকরা জেনে বা না-জেনে স্থানান্তরের কাজটি করে থাকেন। এরাও পাচারের সহযোগী। (৭) ঘাট মালিক : নারী ও শিশুদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে সংগ্রহ করার পর সীমান্তবর্তী এলাকায় এনে জড়ো করা হয়। এই এলাকাগুলো ঘাট নামে পরিচিত। ঘাট একটি মাঠ হতে পারে, নদীর তীর হতে পারে, এমনকি একটি বাড়িও হতে পারে। স্থানীয় প্রভাবশালী লোকজন অবৈধ উপায়ে মানুষ পারাপারের লক্ষ্যে সহায়তা করার জন্য এই ঘাটগুলো ইজারা নেয়। নারী ও শিশু পাচারের জন্য এই ঘাটগুলো ব্যবহৃত হয়। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ঘাট মালিকরা পাচারের সহযোগী হিসাবে কাজ করে। (৮) সীমান্তরক্ষী বাহিনী : মানুষ পাচারের ক্ষেত্রে সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সম্পৃক্ততার কথা সর্বজনবিদিত। তাঁদের সহযোগিতা ছাড়া পাচারকারীদের পক্ষে নিয়মিত এক দেশ থেকে অন্য দেশের সীমান্ত পারাপার করা সম্ভব নয়। অনেক ক্ষেত্রেই পাচারের কাজে সরাসরি যুক্ত না হলেও অর্থের বিনিময়ে তাঁরা সীমান্ত পারাপারে পাচারকারীদের সহযোগিতা করে থাকে।
বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ নারী পাচার হয়ে বিদেশে যাচ্ছে, তার সিংহভাগ অংশকে জোরপূর্বক গণিকাবৃত্তিতে নিয়োগ করা হয়। গণিকাবৃত্তিতে পাচারকৃত মেয়েদের নিয়োগ নির্ভর করে তাঁদের বয়স ও দৈহিক সৌন্দর্যের উপর। এক পরিসংখ্যানে পাওয়া যায় কলকাতার বিভিন্ন পতিতালয়ে বাংলাদেশী প্রায় ২০ হাজার মেয়ে আছে। বিপুল অংকের টাকার বিনিময়ে পাচারকারীরা একেকজন নারীকে গণিকালয়ে বিক্রি করে দেয়। এদের মধ্যে অনেক কিশোরীও থাকে। গণিকালয়ে প্রথম থেকেই নারীরা মানসিক ও দৈহিক উভয় প্রকার নির্যাতনের শিকার হতে থাকে। গণিকাবৃত্তিতে অস্বীকৃতি জানালে সর্দারনি বা গণিকালয়ের মালিকদের হাতে তাঁদের নির্যাতিত হতে হয়। তাঁদেরকে বদ্ধ ঘরে আটকে রাখা হয়। এমনকি অ্যাসিড দিয়ে শরীরের অংশ বিশেষ পুড়িয়ে দেওরার মতো ঘটনাও ঘটে। স্বাস্থ্যগত ও মানসিক দিক বিবেচনায় গণিকালয়ে বিক্রি হয়ে যাওয়া নারী অত্যন্ত বিপজ্জনক অবস্থায় থাকে। সঠিকভাবে নিরাপদ ব্যবস্থা গ্রহণ না-করার বিভিন্ন যৌনরোগে তাঁরা আক্রান্ত হয়। অনেক ক্ষেত্রে এইডসের মতো ভয়াবহ ব্যাধিরও সংক্রমণ ঘটে থাকে, যার অবধারিত ফল মৃত্যু। অনেকে অনাকাঙ্খিতভাবে গর্ভধারণ করে। আর এই অবস্থায় জোরপূর্বক তাঁদের গর্ভপাত ঘটানো হয়, যা তাঁদের স্বাস্থ্যহানি থেকে শুরু করে মৃত্যুরও কারণ হয়। গণিকালয়ে বিক্রি করা ছাড়াও অন্য ধরনের যৌন-ব্যাবসায়ও পাচারকৃত নারী ও মেয়ে শিশুদের কাজে লাগানো হয়। যৌন-পর্যটনের জন্য পাচারকৃত নারীকে হোটেল কর্তৃপক্ষের কাছে বিক্রয় করা হয়। পর্যটকদের মনোরঞ্জনের জন্য এ সব নারী ব্যবহৃত হয়ে থাকে। অনেক সময় ধনী ব্যক্তিরা রক্ষিতা বা সেবাদাসী হিসাবে ব্যবহারের জন্যেও পাচার হয়ে যাওয়া নারীদের কিনে নেয়। সেখানে তাঁদের মুক্তভাবে চলাচল, মত প্রকাশ বা নিজের ব্যপারে কথা বলারও কোনো অধিকার থাকে না। পকিস্তানে পাচার হয়ে যাওয়া বেশিরভাগ নারীই শিকার হয় বাধ্যতামূলক শ্রমের। বিশেষ করে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের লোকেরা তাঁদের কিনে নিয়ে যায় এবং বিয়ে করে। এইসব নারী তৃতীয়, চতুর্থ বা পঞ্চম স্ত্রী হিসাবে শস্য উৎপাদন ও অন্যান্য কাজে শ্রম দিতে বাধ্য হয়। মানুষের বসবাসের অনুপযোগী মরুভূমি অঞ্চলে প্রখর রোদে ভেড়া চড়ানো, জল টানা ইত্যাদি কষ্টদায়ক কাজ করতে বাধ্য হয়। ক্রয় করে স্ত্রী হিসাবে গ্রহণ করা হয় বলে সামাজিকভাবেও এঁরা নিগৃহীত হয়। প্রয়োজনবোধে স্বামী আবারও তাঁকে বিক্রি করে দিতে পারে। বাংলাদেশ থেকে নারী প্রতারিত হয়ে সৌদি আরবে যৌনদাসীতে পরিণত হয়ে থাকে। রাজি না-হলে তাঁদের উপর অকথ্য অত্যাচার করা হয়।
