ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় এই পাচারের পিছনে প্রায় সবক্ষেত্রেই অন্যতম কারণ হিসেবে নিহিত রয়েছে দারিদ্র্য, বেকারত্ব, নারীর নিম্নমানের পেশা, চাকরির সুযোগের অভাব, মাথাপিছু নিম্ন আয়, সম্পদে নারীর অধিকার, চাকরির ক্ষেত্রে সমান সুযোগের অভাব ইত্যাদি। দারিদ্র্য ও বেকারত্বের চরম পরিস্থিতিতে দরিদ্র নারী এবং তাঁদের পরিবার বিয়ে ও চাকরির প্রস্তাবে প্রলুব্ধ হয়। এই পরিস্থিতিতে নগদ অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় এমন কারও কাছ থেকে পরিবারের নারী ও শিশুদের জন্য বিবাহ বা চাকরির প্রস্তাব পেলে এসব এলাকার পিতামাতারা তা গ্রহণ করতে দেরি করে না। অন্যদিকে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং ভোগ্যপণ্য পাওয়ার লোভে পাচারকারীরা নিজেদের নিপুণভাবে পরিচালনা করে থাকে।
ভারত ও বাংলাদেশের সীমান্ত এলাকায় ১৯৪৭ সালে এবং পুনরায় ১৯৭১ সালে রাজনৈতিক বিভাজন এই এলাকায় পরিবারগুলোকে বিভক্ত করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রভাব ফেলে। দেশবিভাগের কারণে এই বিভক্ত পরিবারগুলোর সদস্যরা একে অন্যকে সীমান্তের একপার হতে অন্য পারে আনা-নেওয়ার কাজে নিয়োজিত। সীমান্ত অতিক্রম করে এক পরিবারের সদস্যরা অন্য পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার বাসনা অনেক সময় নারী ও শিশু পাচারকে ত্বরান্বিত করে। এছাড়া নারী ও শিশু পাচারের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক কারণ হলে পরিবারে নারীর অধস্তন অবস্থান, যা সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন মূল্যবোধ, আচার-আচরণ ও সামাজিক রীতি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত। আমাদের সমাজে নারীর সামাজিক অবস্থান তাঁর বৈবাহিক অবস্থা দ্বারা নির্ধারিত। বিশেষ করে দরিদ্র পরিবারের পিতামাতারা মেয়েদের জন্য আইন দ্বারা নির্ধারিত বিয়ের উপযুক্ত বয়স ১৮ বছরের কম হওয়া সত্ত্বেও মেয়েদের বিয়ে দেওয়া দায়িত্ব বলে মনে করে, যার দুটি খারাপ পরিণতি আছে। যেসব ছেলে বিয়েতে যৌতুক চায় না কন্যাদায়গ্রস্ত দরিদ্র পিতামাতারা তাঁদের সঙ্গে খোঁজখবর ছাড়াই কম বয়সি মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার কথা চিন্তা করে। অনেক পাচারকারী এই দুর্বলতার সুযোগ নেয়। তাঁরা অপ্রাপ্তবয়স্ক মেয়েদের বিয়ে করে নিয়ে গিয়ে বিদেশে পাচার করে দেয়। দ্বিতীয় পরিণতি হচ্ছে, অনেক ক্ষেত্রে সহায়সম্বলহীন পিতামাতা বিয়ের সময় যৌতুকের দাবি মেনে নিয়ে বিয়ের ব্যবস্থা করে। কিন্তু পরবর্তীকালে আর শোধ করতে পারে না। তখন মেয়েটি তাঁর স্বামী ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্মম নির্যাতনের শিকারে পরিণত হয়। একদিকে মেয়েটি বাবার বাড়িতেও ফিরে যেতে পারে না, অন্যদিকে নির্যাতনের নির্মমতা সহ্যের মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। এরকম অসহায় অবস্থার সুযোগ নেয় পাচারকারী চক্র। বিয়ের পর স্ত্রী রেখে পালিয়ে যাওয়া এবং বৈবাহিক সন্ত্রাস পাচারের কারণ হিসাবে কাজ করে। যুবতী, অবিবাহিত অথবা স্বামী পরিত্যক্তা এবং বিধবা নারী সমাজ ও পরিবারের কাছে বোঝাস্বরূপ। এই শ্রেণির নারীর কাছে বিকল্প কর্ম অথবা বিবাহের প্রস্তাব আকর্ষণীয় বলে মনে হয়। তাঁরা পাচারকারী চক্রের সদস্যদের বিবাহ বা লোভনীয় চাকুরির প্রস্তাবে সহজেই সাড়া দেয় আর শেষপর্যন্ত পাচারকারীদের ফাঁদা জালে আটকা পড়ে।
পাচারের উদ্দেশ্য কী আর একটু স্পষ্ট করে বলা যাক—(১) পতিতাবৃত্তিতে নিয়োজিত করা। (২) পর্নোগ্রাফি সিনেমায় ব্যবহার করা। (৩) মধ্যপ্রাচ্যে উটের জকি হিসাবে ব্যবহার করা। (৪) ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত করা। (৫) শরীরের রক্ত বিক্রি করা। (৬) অঙ্গ-প্রতঙ্গ কেটে ব্যাবসা। (৭) মাথার খুলি, কঙ্কাল রপ্তানি করা ইত্যাদি।
এশিয়ার মধ্যে নারী পাচারের প্রথম বৃহৎ দেশ হল নেপাল এবং দ্বিতীয় বৃহৎ দেশ হল বাংলাদেশ। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ৪,২২২ কিলোমিটার এবং মায়ানমারের সাথে ২৮৮ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকা আছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এবং উত্তরবঙ্গ সীমানা দিয়েই পাচার বেশি হয়। বাংলাদেশের পাচারকারীরা ভারতের বিভিন্ন সীমান্ত ব্যবহার করে পাকিস্তান, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে নারীদের পাচার করে। দেশের উত্তরাঞ্চলের দিনাজপুর, পঞ্চগড়, কুড়িগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী ও চাঁপাই নবাবগঞ্জ জেলার সীমান্ত পথ দিয়ে পণ্য সামগ্রী পাচারের পাশাপাশি নারী ও শিশু পাচার হয়ে থাকে। এসব অঞ্চলের ১১টি রুট পাচারের উদ্দ্যেশে ব্যবহৃত হয়। এছাড়া ভারতের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশ থেকে ভারতে যাওয়ার জন্য যশোরের বেনাপোল একটি অত্যন্ত সহজ ও সুপরিচিত রুট। এখান থেকে বাস ও ট্রেনের যোগাযোগ খুব ভালো হওয়ায় পাচারকারীরা খুব সহজেই কলকাতা পৌঁছে যেতে পারে। পশ্চিমবঙ্গের বনগাঁ শহরটি বেনাপোল থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দূরে, যেখানে গোটা বাংলাদেশ থেকে সংগ্রহ করা নারী ও শিশুদেরকে নিয়ে যাওয়া হয়। বৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের মাধ্যমেই হোক আর অবৈধ অনুপ্রবেশের মাধ্যমেই হোক পাচারের উদ্দেশ্যে বড়ো ধরনের কোনো কেন্দ্রে পাঠানোর জন্য তাঁদেরকে বনগাঁয় নিয়ে আসা হয়। বেনাপোল ছাড়া যশোর থেকে পাচারকারীরা সাধারণত ভোমরা, কলারোয়া, দর্শনা, জীবননগর ও ঝাউডাঙ্গা সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে নারী ও শিশু পাচার করে থাকে। এছাড়াও কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরার বিভিন্ন বর্ডার এলাকা দিয়েও পাচার করা হয়। যশোর থেকে নাভারন চৌরাস্তা দিয়ে ভারতে যাওয়া খুবই সহজ। বৈধভাবে ভারতে যাওয়া বেশ ঝামেলাপূর্ণ হওয়ায় পাচারকারী চক্র বিডিআর প্রশাসনের উদাসীনতার সুযোগে এই পথে অবৈধভাবে ভারতে যায়। ভারতীয় পাচারকারী, হস্তান্তরিত নারী ও শিশুকে কলকাতা, দিল্লি ও মুম্বাইয়ের গণিকালয়ে বিক্রি করে কিংবা সেখান থেকে মধ্যপ্রাচ্যে পাচার করে। দীর্ঘকাল ধরে দেহব্যাবসা এবং নারী ও শিশু বিক্রয়ের জন্য কলকাতা নিরাপদ স্থান হিসাবে পরিচিত। আর মুম্বাই নগরীকে পাচারের ট্রানজিট পয়েন্ট হিসাবে ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন গবেষণা থেকে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, যশোরের অধিকাংশ ট্রানজিট পয়েন্টের সঙ্গে ভারতের বিশেষ করে চব্বিশ পরগনার পয়েন্টগুলোর সূক্ষ্ম যোগাযোগ আছে।
