স্ব-ইচ্ছায় যাঁরা যৌনপেশায় আসে, তাঁদের কথায় পরে আসছি। অনিচ্ছাকৃতভাবে যাঁরা যৌনপেশায় আসতে বাধ্য হয়, তাঁদের কথা দিয়েই শুরু করি।
(১) প্রতারক কর্তৃক পাচারকৃত গণিকা : প্রায় গোটা পৃথিবী জুড়েই নারী পাচারের চক্র সক্রিয় আছে। তবে তৃতীয় বিশ্বের গরিব দেশগুলি থেকেই বেশি নারী পাচার হয়ে থাকে। ২০১৬ সালের এক পরিসংখ্যান জানা যাচ্ছে ভারতে ৩ কোটি ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ পাচার হয়ে যায়। এর মধ্যে ১০ লক্ষ ৮ হাজার জন নারী পাচার হয়ে যেতে হয়েছে বিভিন্ন গণিকাপল্লিতে। তবে পশ্চিমবঙ্গের তিনটি আন্তর্জাতিক সীমানা থাকায় পাচারকারীদের জন্য অনুকূল। প্রায় সব ক্ষেত্রে প্রতারকদের দ্বারাই পাচার সম্পন্ন হয়। প্রতারক যে কেউ হতে পারে। সৎ বাবা, সৎ মা হতে পারে, স্বামী হতে পারে, প্রেমিক হতে পারে, প্রতিবেশী হতে পারে, বান্ধবীও হতে পারে। এরা মানুষের দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে ছেলেদের সর্বস্বান্ত করে দেয়, তেমনি মেয়েদের যৌবনও বেচে খায়। কখনো কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়ে, কখনো বিয়ে করে গণিকালয়ে বিক্রি করে দিয়ে আসে। অত্যন্ত সংঘবদ্ধ এই নারীদেহ পাচারের ব্যাবসা। গুণ্ডা, দালাল থেকে শুরু করে বাড়িওয়ালা-বাড়িওয়ালি পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের মানুষ মিলে এই জাল বিস্তার করেছে।
পণ্যসর্বস্ব আগ্রাসী দুনিয়ায় সবচেয়ে লোভনীয় হল মানুষ, আর লোভনীয় মানুষের চেয়ে সবচেয়ে লোভনীয় হল মেয়েমানুষ। মেয়েমানুষের ব্যাবসা বিশ্বের সবচেয়ে লাভজনক ব্যাবসা। প্রায় বিনিয়োগবিহীন ব্যাবসা। তাই এই দেহব্যাবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে দরিদ্র থেকে ধনী, নেতা-মন্ত্রী পর্যন্ত। গণিকাপল্লির সমৃদ্ধ হবে কীভাবে? ক্লায়েন্ট যে নতুন নতুন চিড়িয়া’ চায়। সিল’ না-কাটা মেয়েদের যে কদর বেশি, রেটও বেশি। অতএব নারীপাচার জারি আছে এবং থাকবে। এই পাচারযজ্ঞ আজ এমন জায়গায় পৌঁছেছে যে, এখন মাতৃগর্ভে থাকা কন্যাভ্রণটিও পাচার হয়ে যেতে পারে।
বিগত কয়েক দশকে সমগ্র বিশ্বজুড়ে নারী ও শিশু পাচারের মাত্রা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ নারী ও শিশু পাচারের একটি উৎস এবং ট্রানজিট রাষ্ট্র হিসাবে পরিচিত। প্রতিদিন এদেশ থেকে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী ও শিশু বাংলাদেশ-ভারত সীমান্ত দিয়ে অথবা বিমান যোগে পাচার হয়ে যাচ্ছে। পাচারকৃত নারী ও শিশুদের নিয়োগ করা হচ্ছে পতিতালয়ে বা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ পেশায়।
নারী ও শিশু পাচারের বিষয়টা আসলে কেমন? বিশ্বায়নের যুগে পুঁজি, পণ্য ও প্রযুক্তির মতো পৃথিবী জুড়ে শ্রমের চলাচলও সহজ হওয়ার কথা। কিন্তু জটিল ইমিগ্রেশন নীতির কারণে গত শতাব্দীগুলোর তুলনায় বর্তমান সময়ে বৈধ পথে শ্রম অভিবাসন অনেক কম ঘটেছে। তবে পৃথিবী জুড়ে মানুষের চলাচল থেমে থাকেনি। নানা অবৈধ উপায়ে মানুষ এক দেশ থেকে অন্য দেশে আসা-যাওয়া চলছে। নানা ধরনের চলাচলের মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হল নারী ও শিশু পাচার। আন্তর্জাতিকভাবে নারী ও শিশু পাচারকে আধুনিক যুগের দাসপ্রথা হিসাবে চিহ্নিত করা যায়। পাচার কাকে বলে? এ বিষয়ে বড়ো ধরনের বিভ্রান্তি আছে। অবশ্য পাচারের উদ্দেশ্য, প্রকৃতি, পদ্ধতি সবই আগের তুলনায় অনেক জটিল হয়ে গেছে। সাধারণত যে-কোনো ধরনের শোষণের উদ্দেশ্যে জোড় খাঁটিয়ে, ছল চাতুরি, ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে এবং চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে অথবা যাকে পাচার করতে চায় তার উপর কর্তৃত্ব আছে এমন ব্যক্তিকে আইন বহির্ভূত উপায়ে টাকা লেনদেন করার মাধ্যমে লোক সংগ্রহ, স্থানান্তর, আশ্রয়দান ও অর্থ-বিনিময়ে গ্রহণ ইত্যাদি যে-কোনো কর্মকাণ্ডই হল পাচার।
আইওএম, অর্থাৎ ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের ব্যাখ্য অনুযায়ী মানুষ পাচার তখনই ঘটে, যখন একজন অভিবাসী জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করে অবৈধভাবে (যেমন—চাকুরি প্রাপ্তির নিমিত্তে, অপহৃত হয়ে, বিক্রিত হয়ে) কোনো কাজে নিযুক্ত হন। পাচারকারী এই কর্মকাণ্ডের যে-কোনো পর্যায়ে উক্ত অভিবাসীকে প্রতারণা, পীড়ন বা অন্য যে-কোনো শোষণের মাধ্যমে তাঁর মানবাধিকার লঙ্ঘন করে অথনৈতিক বা অন্য যে-কোনো প্রকার মুনাফা অর্জন করে।
যে সমস্ত পরিবারের অধিকাংশ দুঃস্থ, নিঃস্ব ও অসহায়, সেই পরিস্থিতির পূর্ণ সদ্ব্যবহার করে আন্তর্জাতিকভাবে সংঘবদ্ধ এক শ্রেণির প্রতারক। তাঁরা প্রলোভন দেখিয়ে অসহায় পিতামাতার মেয়েদের শহরে চাকরি বা যৌতুকবিহীন বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে পাচার করে দিচ্ছে অন্ধকার জগতে। পাচারকারীদের প্রলোভনের শিকার হচ্ছে দেশের ছিন্নমূল, ভবঘুরে নারী ও তাঁদের অভিভাবকরা এবং দারিদ্র্যের নিষ্পেষনে জর্জরিত অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত, বিচ্ছেদপ্রাপ্ত ও বিধবা নারীরা। অসহায় নারীরা সুন্দরভাবে বাঁচার আশায় নতুন জীবনের স্বপ্নে বিভোর হয়ে পাচারকারীদের পাতা জালে জড়িয়ে পড়ছে। পিতামাতারা অর্থ উপার্জনের আশায় বেশি বেতনের চাকরির প্রলোভনে পড়ে বা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের আশায় না-জেনে শিশু-সন্তানদের তুলে দিচ্ছে। পাচারকারীদের হাতে। এভাবে শিশুরাও প্রতারণার শিকার হয়ে পাচার হয়ে যাচ্ছে।
