এই অধ্যায় শেষ করব একটি অন্য ধরনের ঘটনার বিবরণ দিয়ে। তাঁর কথা, যে অভিনেত্রী হয়ে গণিকা নয় বা গণিকা থেকে অভিনেত্রী হওয়ার ঘটনা নয়। সে অভিনেত্রী হতে এসে গণিকা হয়ে গেছে। আসলে অভিনেত্রী হওয়া তাঁর হয়ে ওঠেনি। তাঁর নাম গাঙ্গুবাই কাঠিয়াবাই। মুম্বাইয়ের কামাথিপুরার একজন গণিকা। ভারতের গণিকা নারীদের অধিকার রক্ষা আন্দোলনের নেত্রী, যিনি গণিকালয় রক্ষা করতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নেহরুর সঙ্গেও দেখা করেছেন। গাঙ্গুবাই কাঠিয়াবাই মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগতের অভিনেত্রী স্বপ্ন দেখতেন। তখন তাঁর নাম ছিল হরজীবনদাস কাঠিয়াবাদি। গুজরাটের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ে ছিলেন তিনি। সেই চল্লিশের দশকেও সমাজের কাছে একটা নিদর্শন হয়েছিল তাঁর পরিবার। সেই সময়েও সেই পরিবারের মেয়েরা সিনেমা দেখতেন। হিন্দি সিনেমা দেখেই শুরু হয় গঙ্গার স্বপ্নের জাল বোনা। মুম্বাই আসতে চায়। মুম্বাই তাঁর স্বপ্নের শহর। চোখে শুধু অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন। এমন সময়ে তাঁদের ফার্মে অ্যাকাউন্ট্যান্ট রামলাল নায়েক নামে এক যুবক নিযুক্ত হন। গঙ্গা জানতে পারল এই যুবক কিছুদিন মুম্বাইতে কাজ করেছে। শুরু হল তাঁর কাছে সেই স্বপ্নের শহরের গল্প শোনা। গল্প শুনতে শুনতে তাঁর প্রেমে পড়ে যাওয়া। অতঃপর দুজনে বিয়ে-থা করে মুম্বাই চলে আসে। কিন্তু মুম্বাই এসে গঙ্গার স্বপ্ন ভেঙে ছত্রখান হয়ে গেল। মুম্বাই এসে স্বামী রামলাল মাত্র ৫০০ টাকার বিনিময়ে কামাথিপুরার গণিকালয়ে গঙ্গাকে বিক্রি করে দেয়। গঙ্গাকে ৫০০ টাকায় কিনে নিল গণিকালয়ের সর্দারনি শীলা মাসি। গঙ্গা বহুবার সেখান থেকে পালানোর চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু সফল হয়নি। গঙ্গার নাম বদলে গেল, হল গাঙ্গুবাই। ক্রমে ক্রমে শিক্ষিত ও ব্যক্তিত্বপূর্ণ গঙ্গা ‘গাবাই’ গণিকালয়ের সর্বেসর্বা হয়ে উঠল।
ইতোমধ্যে কামাথিপুরা গণিকালয় পাঠান-মাফিয়াদের আস্তানা হয়ে ওঠে। গাঙ্গুবাই মাফিয়া সর্দারের হাতে রাখি পরিয়ে ভাই পাতিয়ে নেয়। এর ফলে গাঙ্গুবাইয়ের ক্ষমতা বৃদ্ধি হয়। কামাথিপুরার গণিকালয়ে গাঙ্গুবাইরাজ প্রতিষ্ঠা হল। বদলাতে থাকল কামাথিপুরা গণিকালয়ের অন্দরমহলের নিয়মকানুন। যেমন–(১) কোনো মেয়েকেই আর জোর করে গণিকালয়ে নিয়ে আসা যেত না। (২) কেউ যদি গোপনে কোনো মেয়েকে গণিকালয়ে বিক্রি করে দিয়ে যায়, যদি সেই মেয়েটি গণিকাবৃত্তি গ্রহণ করতে না চাইত, তাহলে সেই মেয়েকে গাঙ্গুবাই নিজ দায়িত্বে বাড়ি পৌঁছে দিত।
ভারত ব্রিটিশ মুক্ত হওয়ার পর ব্রিটিশদের মদতে পুষ্ট হয়ে যেসব গণিকালয় গড়ে উঠেছিল, সেগুলি বন্ধ করে দেওয়ার দাবি উঠল। সে সময় গাঙ্গুবাই কামাথিপুরা গণিকালয়ের প্রেসিডেন্ট। গাজুবাই হাজার হাজার গণিকাদের সঙ্গে নিয়ে রাজপথে নামল। গণিকালয় বাঁচাতে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহর নেহরুর সঙ্গে দেখা করে প্রসিডেন্ট গাঙ্গুবাই। গাঙ্গুবাইয়ের দাবি মেনে নিলেন নেহরু।
কামাথিপুরার গণিকালয়েই গাঙ্গুরামের মৃত্যু হয়। গাঙ্গুবাঈকে আর কেউ মনে রাখেনি। গাঙ্গবাইয়ের সংগ্রামী ইতিহাস চাপা পড়ে যায়। না, কেউ মনে রাখেনি একথা বললে নির্জলা মিথ্যা বলা হবে। গাঙ্গু সিনেমার অভিনেত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও, অভিনেত্রী হতে না-পারলেও তাঁর জীবন যে সিনেমার মতই বর্ণময় ঘটনাবহুল! তাই হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস জেগে উঠল। গাঙ্গুর জীবন নিয়ে মুম্বাইতে তৈরি হল ‘গাঙ্গুবাই কাঠিয়াবাদি’ নামে সিনেমা। শুধু গাঙ্গুবাই নয়, গ্ল্যামারের টানে অভিনেত্রীর স্বপ্ন দেখতে এসে অসংখ্য মেয়েকে শেষপর্যন্ত গণিকা হয়ে যেতে হয়েছে। অভিনেত্রীর হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে, এই টোপ খেয়ে ইন্ডাস্ট্রির বিভিন্ন মানুষদের সঙ্গে বিছানা শেয়ার করতে করতেই একসময় অনেক মেয়েকেই গণিকাবৃত্তির পথ বেছে নিতে হয়। নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে গণিকা হতে হয় তাঁদেরই, যাঁদের অভিনয় দক্ষতা নেই। তাঁদের ইতিহাস হয়তো কোনোদিনও লেখা হবে না, তাঁদের জীবন-যন্ত্রণা সেলুলয়েড বন্দিও হবে না।
সিরিয়াল, সিনেমার অভিনেত্রী মানেই কি সে চরিত্রহীনা, গণিকা, পতিতা, বেশ্যা? এদেশের অভিনয় শিল্পে নায়িকাদের সম্পর্কে এক শ্রেণির মানুষ এমন চিন্তাভাবনাই পোষণ করে। অনেকে প্রকাশ্যেই সেই মনোভাব ব্যক্ত করে। সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, ইন্ডাস্ট্রির ভিতরের মানুষরাও এমন ধারণা ব্যক্ত করে।এই তো বছর কয়েক আগে টলিউডের প্রথম সারির অভিনেত্রী কোয়েল মল্লিক দড়াম্ করে এক বোমা ফাটিয়ে দিলেন। তিনি বললেন–“অভিনয়ের জন্য নগ্নতাকে সামনে আনতে কোনো অসুবিধা নেই। প্রতিদিনই আমাদের নগ্ন হতে হয়।” ইঙ্গিতপূর্ণ এহেন বিবৃতিতে টলিউড তোলপাড় হয়ে ওঠে। ভারতীয় অভিনেত্রী ঊষা যাদব বিবিসি কে এক সাক্ষাৎকারে বিস্ফোরক বিবৃতি দিলেন, বললেন–“সে ব্যক্তি যেখানেই চেয়েছে আমার শরীরে সেখানেই হাত দিয়েছে। সে যেখানেই চেয়েছে আমার শরীরের সেখানেই চুমু খেয়েছে। সে আমার জামার ভিতর হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিল। আমি হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলাম। আমি তাকে থামিয়ে দিয়েছিলাম। তখন সে বলল, তোমার মনোভাব যদি এরকম হয়, তাহলে তুমি এখানকার জন্য উপযুক্ত নও।” এহেন বিবৃতি অভিনেত্রীদের সামগ্রিক অবস্থা বিচার করতে খুব বেশি চিন্তা করার প্রয়োজন পড়ে না। উল্টোদিক থেকে যেসব অভিনেত্রী ‘এরকম’ না করে এখানকার মতো করে টিকে গেছে বা টিকে আছে, তাঁরা কি অভিনয়ের বিনিময়ে শরীর বিক্রি করে ফেলেছে? প্রশ্ন উঠছে। ঊষা যাদব এও বলেছেন, সিনেমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি তাকে সরাসরি যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব দিয়েছিল। বলেছিল–“তুমি যদি এই রোল বা ভূমিকা পেতে চাও, তাহলে আমার সঙ্গে শুতে হবে। তাহলে কি এটা দাঁড়াল না যে, অভিনেত্রীদের সিনেমায় রোল পেতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যৌনক্রিয়া করতে হয়? অর্থাৎ যতগুলো সিনেমায় রোল পেতে চাইবে ততগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যৌনক্রিয়া করতে হবে? এই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি’-রা কারা? সে কখনো নামজাদা নায়ক হতে পারে, আবার পরিচালক বা প্রযোজকও হতে পারে। নিট রেজাল্ট, অভিনেত্রী হওয়ার আগে তাঁকে গণিকা হতেই হবে। একথা সব অভিনেত্রীই স্বীকার করার সাহস পায় না। কারণ, ঊষা যাদবের ভাষায়–“অনেকেই ভয় পায়। কারণ এখানে কিছু ব্যক্তি এত ক্ষমতাধর যে তাঁদের সৃষ্টিকর্তার মতো মনে করা হয়।” এঁদের বিরুদ্ধে কেউই মুখ খোলেন না, তা ঠিক নয়। তবে কতিপয় যে কজন মুখ খুলেছে, তাঁদের প্রত্যেরই সিনেমা কেরিয়ার এক লহমায় খতম হয়ে গেছে।
