প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। ফ্রান্স ভরে গেছে ব্রিটিশ-সেনায়। সেই সেনার অন্যতম কর্তা প্রিন্স অফ ওয়ালেস অষ্টম প্রিন্স এডওয়ার্ড। যৌনসুখের তাগিদে তাঁর এক বন্ধুর সাহায্য নিয়ে একজন রক্ষিতা তথা গণিকাকে ভাড়া করল।কিন্তু সেই মহিলার যথার্থ যৌনজ্ঞান না-থাকায় এডওয়ার্ডকে তৃপ্ত করতে সক্ষম হয়নি। অতএব নতুন খাবারের সন্ধান দিল সেই বন্ধুই। বন্ধুই ম্যাগির সঙ্গে এডওয়ার্ডের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেয়।শরীরী সঙ্গ দিতে দিতে ম্যাগির সঙ্গে এডওয়ার্ডের প্রেম হয়ে যায়। কিন্তু সেই প্রেম টেকে মাত্র এক বছর।
ম্যাগি এতদিনে বিলক্ষণ বুঝে গেছে উপঢৌকন আর প্রচুর অর্থের আগমন তাঁর শরীরকে কেন্দ্র করেই। আর এই ভাবনা থেকেই ম্যাগির অর্থ-লালসা ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। আরও অর্থ চাই, আরও, আরও অর্থ। এবার ম্যাগির জীবনে বসন্ত নিয়ে আসে চার্লস লরেন্ট নামের এক যুবক। বিয়ে করল এবং ছয় মাসের সংসারও হল। ডিভোর্স হয়ে গেল। আর ডিভোর্সের সেটেলমেন্টে লরেন্টের কাছ পেয়ে গেল প্রচুর অর্থ, বাড়ি, গাড়ি, ঘড়াশাল, চাকর-বাকর ইত্যাদি। গণিকা ম্যাগির আবার বিবাহযোগ। এবার একেবারে প্রাচ্যের এক রাজপরিবারের সঙ্গে সংসার পাতার সৌভাগ্যের দরজা খুলে গেল। স্বামী মিশরের রাজপুত্র আলি কামেল ফাহমি বে। এ বিয়ের মূল উদ্দেশ্য রাজপুত্রের অর্থ-প্রতিপত্তি। নাঃ, এ বিয়েও টিকল না। ফাহমির সঙ্গে ডিভোর্স হয়ে গেল। ম্যাগি রীতিমতো ছক কষে লন্ডনের এক হোটেলে খুন করল ফাহমিকে। স্বামীকে খুন করে ম্যাগি গ্রেফতার হয়। কিন্তু আদালতে প্রমাণ হল তাঁর উপর স্বামীর উপর্যুপরি অত্যাচারের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার তাগিদেই ম্যাগি খুন করতে বাধ্য হয়েছিল। আদালত ম্যাগিকে মুক্তি দেয়। মুক্তি পেয়ে ম্যাগি প্যারিসে ফিরে আসে। ফিরে এসে ম্যাগি প্যারিস চলচ্চিত্রে অভিনয় করতে শুরু করেন। বেশ কয়েক বছর সে অভিনয় করেছিল। তবে অভিনেত্রী হওয়ার পরও সে গণিকাবৃত্তি চালিয়ে গেছে মোটা অঙ্কের অর্থলোভে। তবে সে আর বিয়ে করেনি। যৌবন-শেষে বার্ধক্য কাটিয়েছে অন্তরালেই। শেষপর্যন্ত কেউ তাঁর কোনো খোঁজ পায়নি।
গণিকাবৃত্তি করতে করতে অভিনয় পেশা আসা মেয়েদের সংখ্যা নেহাৎ কম নয়। সেকাল থেকে একাল সর্বত্র ছড়িয়ে আছে এঁরা। সম্প্রতি ভারতীয় চলচ্চিত্রে অংশগ্রহণ করেছে পর্ন-গণিকা ভারত বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান সানি লিওনি। টিনা নন্দী, জোয়া রাঠোর, কাজল গুপ্তা, সোনিয়া মহেশ্বরী, আলিশা, কবিতা রাধেশ্যামের মতো গণিকারা তো এখন ওয়েব সিরিজের নামে ক্যামেরার সামনেই গণিকাবৃত্তি করছেন। বাজারও রমরমা। এ তো গেল গণিকা থেকে অভিনেত্রী হওয়ার কথা। অভিনেত্রী থেকে গণিকাবৃত্তিতে আসার ঘটনাও কিছু কম নয়।
কাবুকি, জাপানের একটি বিশেষ নাট্যধারা। সাধারণের রঙ্গালয় হিসাবে এই নাট্যধারার সময়কাল সপ্তদশ শতাব্দী। এই নাট্যধারার স্রষ্টা একজন মহিলা হলেও মহিলা ও তরুণদের জন্য অভিনয় নিষিদ্ধ করেছিলেন। ১৬০৩ সালে ইজুমো নো ওকুমি শুখনো নদীখাতে বিশেষ এক জাতীয় নৃত্যনাট্যের সূচনা করেন। শুরু হল মহিলা কাবুকির যুগ। এই মহিলা কাবুকিদের বলা হত ‘অন্না-কাবুকি’। এই কাবুকি নাট্যধারা যতই জনপ্রিয়তার শিখরে উঠতে থাকল, ততই বিনোদনের পথে পা বাড়িয়ে দিল অধিক অর্থলোভে। কম পরিশ্রমে অধিক রোজগারের হাতছানিতে যৌনপেশায় যুক্ত হতে থাকল অভিনেত্রীরা। কাবুকি নাট্যধারা ক্রমশ গণিকাদের নৃত্যসংগীত হিসাবে পরিচিতি হয়ে গেল। জাপানের সামাজিক সংস্কৃতির সঙ্গে এই পরিবর্তিত কাবুকি সংস্কৃতি মিশে গিয়ে সামাজিক অবক্ষয়ের সূচনা হতেই জাপানের তৎকালীন শোগুন শাসন ‘অন্না-কাবুকি নিষিদ্ধ করে দেয়। সালটা ছিল ১৬২৯। তবে ‘অন্না-কাবুকি’-কে অনুসরণ করে একদল উৎসাহী তরুণ ‘ওয়াকাসু-কাবুকি’ নাট্যধারা শুরু করে। কিন্তু এর অভিনেত্রীরাও যৌনকর্মে যুক্ত হলে শোগুন শাসক ‘ওয়াকাসু-কাবুকি’ও নিষিদ্ধ করে দেয়।
সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে কাবুকি নাট্যধারা প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের হাতে গিয়ে পড়ে। পুরুষ-পরিচালিত এই কাবুকির ডাকনাম ‘ইয়াররা-কাবুকি’। ইয়ারো-কাবুকিদের মধ্যে যাঁরা মহিলা চরিত্রে যেসব পুরুষ অভিনয় করত, তাঁদের বলা হত ‘অন্নাগাতা’। নারী-বর্জিত এই নাট্যধারা বেশ কিছুদিন বেশ চলছিল। সমস্যাও শুরু হয়ে গেল কিছু সময় পর। “অন্নাগাতা’ অভিনেতারা (অভিনেত্রীই বলা উচিত) দীর্ঘদিন ধরে নারীচরিত্রে অভিনয় করতে করতে নিজেদের মধ্যে নারীসুলভ আচরণ লালন করত। এই নারীসুলভ পুরুষরাও যৌনপেশায় যুক্ত হয়ে পড়ে। এঁদের ক্লায়েন্ট নারী-পুরুষ উভয়ই। যথারীতি ইয়ারো-কাবুকি’-ও নিষিদ্ধ হল। পরে অবশ্য (১৬৫২ সালে) এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
জাপান ছেড়ে চলে আসুন ভারতে। ভারতেরও বেশকিছু অভিনেত্রী চলচ্চিত্র ও ধারাবাহিকে অভিনয় করার পাশাপাশি অধিক অর্থ-লালসায় যৌনপেশাও চালিয়ে যায়। গ্ল্যামার দুনিয়ার কত স্বনামধন্য মেয়েরা এসকর্ট গার্ল হিসাবে কাজ করে তার হিসাবে রাখা হয় না বোধহয়। কী টলিউড, কী বলিউড, কী কলিউড, কী হলিউড, কী মলিউড, কী ঢলিউড–সর্বত্র একই চিত্র। ধরা পড়ে গেলে জানতে পারি, না ধরা পড়লে বিন্দাস চলে যৌনকর্ম। প্রবচন হয়েছে–‘ধরা পড়লে ধনঞ্জয়, না পড়লে এনজয়’। কিছুদিন আগেই তো টলিউডের এক প্রথম সারির বিবাহিতা অভিনেত্রীর বিরুদ্ধে এক চিটফান্ড কোম্পানির কর্ণধারের কয়েক কোটি টাকার বিনিময়ে নিয়মিত শয্যাসঙ্গিনী হতেন। সেই সংবাদ ফলাও করে সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছে। নিশ্চয় সেই সংবাদ সবাই পড়েছে। এরা কেউ গরিব নন, আর্থিক অনটনে দিন গুজরান করে না। রাতারাতি আরও ধনী হওয়ার লোভ ও যথেচ্ছ যৌনতার হাতছানিতে অত্যন্ত গোপনে এঁরা গণিকাবৃত্তি অব্যাহত রাখে। মুম্বাইয়ের নামজাদা এক চলচ্চিত্র অভিনেত্রীর লিজ দেওয়া ফ্ল্যাটে যৌনকর্ম চলত। সংশ্লিষ্ট অভিনেত্রীই যৌনকর্ম পরিচালনা করত কি না, সেটা অবশ্য ধামাচাপা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বছর কয়েক আগে হায়দরাবাদের বানজারা হিলসের একটি বিলাসবহুল হোটেলে গণিকাবৃত্তি করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে গেল বলিউডের অভিনেত্রী শ্বেতা প্রসাদ বসু। যে রাতে সে ধরা পড়েছিল সেই রাতের তাঁর রেট ছিল পাঁচ লাখ টাকা। অগ্রিম হিসাবে এক লাখ টাকাও নিয়েছিল। সেলিব্রেটি হওয়ার সুবাদেই তাঁদের শরীর-মূল্যও অনেক চড়া হয়। ধনকুবেররাও শয্যাসঙ্গিনী হিসাবে সেলিব্রটিদেরই চায়। তাই সেলিব্রেটি অভিনেত্রীদের বাজার ও বাজার-দর আকাশছোঁয়া। গণিকাবৃত্তির সঙ্গে ঐশ আনসারি, ভুবনেশ্বরী, শ্রাবণী, যমুনা, দিব্যাশ্রী প্রমুখ অভিনেত্রীদের নামও উঠে এসেছে সংবাদ শিরোনামে। ২০০৯ সালে গণিকাবৃত্তির অপরাধে অভিনেত্রী ভুবনেশ্বরী গ্রেফতার হয়েছিল। ভুবনেশ্বরী নিজে গণিকাবৃত্তি করতেন, তা নয়। তিনি গ্ল্যামার জগতের তারকাদের নিজের ফ্ল্যাটে এনে যৌনকর্ম করাতেন বলে অভিযোগ ছিল। শোনা যায়, তিনি নীল ছবির অভিনেত্রীও ছিলেন। ২০১৩ সালে যোধপুরের এক হোটেলে যৌনকর্ম করতে গিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর অবস্থায় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে অভিনেত্রী ঐশী আনসারি। এ বছরেই আর এক তামিল অভিনেত্রী সায়রাবানু গ্রেফতার হন গণিকাবৃত্তির অভিযোগে। দক্ষিণী ছবির আরও দুজন অভিনেত্রী শ্রাবণী ও যমুনাকে মধুচক্র চালানোর অভিযোগে গ্রেফতার হয়। শ্রাবণীর ক্লায়েন্টদের মধ্যে বেশিরভাগই অন্ধ্রপ্রদেশের মন্ত্রী। সম্প্রতি মধুচক্রের খবর পেয়ে মুম্বাই পুলিশ হানা দেয় আন্ধেরি এক থ্রি-স্টার হোটেলে হানা দেয়। সেই মধুচক্রের ডেরা থেকে পুলিশের হাতে ধরা পড়ল বলিউডের অভিনেত্রী প্রিয়া শর্মা। পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ২৯ বর্ষীয়া এই অভিনেত্রীই ছিল এই মধুচক্রের মূল কাণ্ডারী। প্রিয়া শর্মা দূরদর্শনের জনপ্রিয় একটি ক্রাইম শোতে ইতোমধ্যেই অভিনয় করেছে। প্রিয়া শর্মা ছাড়াও মারাঠি সিরিয়াল ও চলচ্চিত্রের অভিনয় করা আর-এক অভিনেত্রী পুলিশের কাছে ধরা পড়ে। আর-এক নাবালিকা অভিনেত্রীকেও পাওয়া গিয়েছিল এখান থেকে। সে একটি ওয়েবসিরিজে অভিনয় করেছে।
