থিয়েটারের দরজা উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ক্লেদাক্ত অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার সংগ্রাম শুরু করলেন পিতৃপরিচয়হীনা গণিকা-কন্যারা। সেকালের সংবাদপত্র ও সমাজপতিদের লাগাতার বিরোধিতা ও নিন্দাবাদ সত্ত্বেও সমাজ তাঁদের সঙ্গে ছিল না, একথা বলা যায় না। সেইসব সমাজপতিদের উদ্দেশ্যে নাট্যকার গিরিশচন্দ্রের প্রশ্ন ছিল—“এইসব মেয়েদের তো আমি অন্তত রাস্তায় দাঁড়িয়ে খরিদ্দার পাকড়াবার চেষ্টা থেকে সরিয়ে, মঞ্চে তুলে দিয়ে রোজগারের একটা পথ দেখিয়েছি, কিন্তু তোমরা এদের জন্য কী করেছ?” একথা অনস্বীকার্য যে, গণিকা-কন্যাদের অনেকেই আমাদের বিনোদন শিল্প তো বটেই, সাহিত্যে ও এবং সামাজিক ইতিহাসেও অপরিমেয় কীর্তি রেখে গেছেন। তাঁদেরকে বাদ দিয়ে চলচ্চিত্র-যাত্রা-থিয়েটারের ইতিহাস লেখা কখনো সম্পূর্ণ হবে না। আমাদের সমাজ এই সব নারীদের প্রাপ্য মর্যাদা দেয়নি, দিতে চায়নি।
এরকমই এক গণিকা-কন্যা বিনোদিনী দাসী। ঘটনাচক্রে বিনোদিনী রঙ্গালয়ে এসে পড়েন। তিনি চৈতন্যলীলায় নিমাইয়ের ভূমিকায় অভিনয় করে সাড়া জাগিয়েছিলেন। পরে শ্রীরামকৃষ্ণের স্পর্শে তাঁর ‘চৈতন্য’ হয় বলে জনশ্রুতি আছে। বর্তমানের ‘স্টার’ থিয়েটারের নামের সঙ্গে বিনোদিনীর নামও বিজড়িত হয়ে আছে। যদিও থিয়েটারের নাম বিনোদিনী দাসীর নামে ‘বিনোদিনী’ হওয়ার প্রস্তাব উঠেছিল, কিন্তু একটা গণিকার নামে থিয়েটারের নাম হবে! বিনোদিনীই এই থিয়েটারের নামকরণ করল ‘স্টার’। বিনোদিনী বোঝাতে সক্ষম হল–“আপনার ভাববেন স্টার মানে আমি, আর দর্শকরা ভাববে স্টার মানে আমরা সবাই।” বিনোদিনী তাঁর আত্মজীবনী ‘আমার কথা’ গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা আত্মজীবনী লেখিকার মর্যাদা বিনোদিনী কিন্তু পায়নি। গণিকা বলে থিয়েটারের নাম ‘বিনোদিনী’ রাখা যেমন সম্ভব হয়নি, তেমনি তাকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা আত্মজীবনী লেখিকার মর্যাদাও দেওয়া যায়নি। বিনোদিনীর এক শিশুকন্যার জন্ম হয়। এক সম্ভ্রান্ত পুরুষ সেই শিশুকন্যা সহ বিনোদিনীকে স্ত্রীর মর্যাদা দিয়েছিল। কিন্তু গণিকা কন্যা বলে বিনোদিনী তাঁর কন্যা শকুন্তলাকে কোনো বিদ্যালয়ে ভর্তি করতে পারেননি। মাত্র ১৩ বছর বয়সে শকুন্তলা মারা যায়। সমাজের লাঞ্ছনা-গঞ্জনা নিয়ে তাঁকে আর বেঁচে থাকতে হয়নি।
রঙ্গালয়ের আর-এক গণিকা অভিনেত্রী হলেন গোলাপসুন্দরী। বেঙ্গল থিয়েটারের নাট্যপরিচালক উপেন্দ্রনাথ দাসের ‘শরৎ-সরোজিনী’ নাটকে গোলাপসুন্দরী সুকুমারী চরিত্রে এমন প্রাণবন্ত অভিনয় করেছিলেন যে, তিনি গোলাপসুন্দরী থেকে সুকুমারী’ নামেই পরিচিত হয়ে গেলেন। ডিরেক্টর উপেন্দ্রনাথ দাস গোলাপের বিয়ে দিয়েছিলেন থিয়েটারেরই এক সুদর্শন অভিনেতা গোষ্ঠবিহারী দত্তের সঙ্গে। তাঁরা এক ভদ্রপল্লিতে বসবাস করতেন। তবে এক কন্যার জন্মের পর গোলাপসুন্দরী স্বামী পরিত্যক্তা হন।
চলচ্চিত্র-যাত্রা-থিয়েটারে গণিকাদের প্রথম পদচারণা শুধু ভারতেই নয়, সারা পৃথিবীতেই ছিল। এক্ষেত্রে একটা কথা বলা দরকার—গণিকারা যেমন অভিনেত্রী হয়েছেন, তেমনি অভিনেত্রী থেকে গণিকা হয়েছেন এমন উদাহরণও কম নয়। নাম মার্গারেট আলিবার্ত। প্যারিসের মার্গারেট আলিবার্তকে লোকে যাঁকে চেনে ম্যাগি মেলার’ হিসাবে। কিশোরী অবস্থায় সে সন্তানসম্ভবা। সেই সন্তানের পিতা কে সেই প্রশ্নের উত্তরও সে জানে না। এক দুর্ঘটনায় পুত্র-সন্তানের মৃত্যুর দায়ে তাঁর বাবা-মা ম্যাগিকে ত্যাগ করে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে বিতারণের পর কিছু সন্ন্যাসিনীর আশ্রয়েই জীবন কাটছিল ম্যাগির। কুমারী ম্যাগী এক কন্যা-সন্তান প্রসব করল। এবার সন্ন্যাসিনীরাও তাঁকে ত্যাগ করল। মেয়েকে অন্যত্র রেখে মাত্র ষোলোবর্ষীয় সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত ম্যাগি প্যারিসের পথে পথে ঘুরতে থাকল। অবশেষে জীবিকার জন্য সে নিজের শরীরকেই পণ্য হিসাবেই উপস্থাপন করে নেয়। কিন্তু এত রূপ নিয়ে কি পথগণিকা হিসাবে মানায়? শিয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খাবে যে! সে নজরে পড়ে গেল ম্যাদাম ডেনার্টের।এই ডেনার্টের কাছেই সে সেরার সেরা গণিকা হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। পেতে শুরু করে সেরার সেরা শাঁসালো ক্লায়েন্ট। এই কায়েন্টরা শুধু প্যারসেই নয়, সুদূর আমেরিকা, ফ্রান্স, ইংল্যান্ড পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল।
শরীর যখন পণ্য, তখন শরীরটাকে ক্লায়েন্টদের পছন্দমতো করে গড়ে তুলতে হবে, এ আর নতুন কথা কী! তাই শরীরচর্চারও প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ম্যাগিকে একটা সুন্দর শরীরের মালকিন করে তুলল ম্যাদাম ডেনার্ট। ডেনার্টের দেহব্যাবসা ক্রমশ ম্যাগি তুরুপের তাস হয়ে উঠল। ইউরোপের শরীর-বাজারে ম্যাগি এতটাই জনপ্রিয় উঠেছিল যে, সেই মহাদেশের আনাচে-কানাচে কান পাতলেই ম্যাগির নাম শোনা যায়। ম্যাগির শরীরী-সান্নিধ্য এতটাই সুখকর ও তৃপ্তিদায়ক ছিল যে, তাঁর রূপ-লাবণ্য ছড়িয়ে পড়া রাত অতি তাড়াতাড়ি ভোর হয়ে যেত।
চল্লিশবর্ষীয় অ্যান্ড্রু নামে এক বিবাহিত যুবক সপ্তদশী ম্যাগিকে বিয়ে করে। ম্যাগিও মন দিয়ে ঘর-সংসার করতে থাকল। কিন্তু সুখ সবার সয় না! কয়েক বছরেই মধুচন্দ্রিমার সমাপ্তি ঘটে গেল। ম্যাগিকে ফেলে অ্যান্ড্রু পুনরায় নিজের পুরোনো সংসারে ফিরে গেল। ম্যাগিও আবার আগের জীবনে ফিরে গেল। পুনরায় যৌবনকে ব্যবহার করে উদ্দাম যৌনতার পসার সজিয়ে বসল। আবারও ম্যাগির কাছ থেকে যৌনসুখ কিনতে তৎকালীন ইউরোপের তাবড় তাবড় ব্যক্তিরা ভিড় জমাতে লাগল।
