রোমান আমলেই পৃথিবীতে প্রথম গণিকাবৃত্তির লাইসেন্স দেওয়া হয় ও কর ধার্য করা হয়। রোমানরা গণিকালয়কে ‘নুপানরিয়া’ (Lupanaria) বলত। তাঁরা ক্রীতদাসীদের সবসময় গণিকা হিসাবে কাজ করাত। যখন এঁদের সংখ্যা বাড়তে থাকল, তখন এইসব গণিকাদের আলাদা করে রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করল। অনেক সময় গণিকাদের রূপে মুগ্ধ হয়ে রোমান যুবকরা বিয়ে করতে শুরু করল। সেসময় রক্তের পবিত্রতা ও বংশের ঐতিহ্য রক্ষার জন্য গণিকালয় তুলে দেওয়ার জন্য বিপ্লব দানা বেঁধে ওঠে। দানা বাঁধলেই হল! সেখানকার সম্রাট গণিকালয় থেকে প্রচুর খাজনা পেত। অতএব আর্থিক দিক দিয়ে চিন্তা করে গণিকালয় ও গণিকাবৃত্তি নিষিদ্ধ করা সম্ভব হল না।
চিনে তাও রাজবংশ একটি নির্দিষ্ট এলাকায় গণিকাবৃত্তি চালু করে। পরবর্তী সাঙ রাজবংশ (৯৬০ থেকে ১১২৬ সাল) ক্যাফেতে ও অন্যান্য প্রমোদস্থানে যেসব মহিলারা গণিকাবৃত্তি করত, তাঁদের হাংচৌ শহরে সীমাবদ্ধ করে দেয়। ওয়েবস্টার অভিধান মতে, সুমেরিয়ানদের মধ্যেই প্রথম ‘পবিত্র’ গণিকার দেখা মেলে।
সূর্যোদয়ের দেশ প্রাচ্যের সুপ্রাচীন সভ্যতার দেশ নিপ্পন তথা জাপানে ঠিক কবে কোন্ অঞ্চল থেকে গণিকাবৃত্তির উদ্ভব হয়েছিল, তা অবশ্যই গবেষণার বিষয় হতে পারে। তবে জাপানের গণিকাবৃত্তির ঐতিহ্য খুবই গভীরে প্রোথিত অনুমান করা যায়। প্রাচীন জাপানে জিশুখ্রিস্টের জন্মের আগের সময়ে জাপানের গণিকাবত্তি সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। তবে কমপক্ষে হেইয়ান যুগ (৭৯৪-১১৮৫ খ্রিস্টাব্দ) থেকে কামাকুরা যুগ (১১৮৫-১৩৩৩ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত শরীর ভাড়া ও শরীর বিক্রির তথা যৌনতা বিক্রি পেশা হিসাবে গ্রহণ করার কথা জানা যায়। সে সময়ে ‘ইউজো’ বা ‘আসোবি মে’ নামে গণিকারা কেবল পেশাগতভাবে শরীরসর্বস্বই ছিল না, তাঁরা নাচ-গান-অভিনয় করেও অর্থ রোজগার করত। নারা যুগ (৭১০-৭৯৪ খ্রিস্টাব্দ) থেকে হেইয়ান যুগ পর্যন্ত ‘মিকো’ বা ‘ফুজো’ নামে মেয়েরা শিন্টোও ধর্মীয় ‘জিনজা’-তে সেবাদাসী হিসাবে কাজ করত। এঁরাই পরবর্তীকালে সেবাদাসীর কাজ ছেড়ে অনেকেই বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত সরাইখানা, মন্দির সংলগ্ন হাট-বাজার, নদী-বন্দর বেছে নিল যৌনকর্মে অংশ নিতে। কামাকুরা যুগ থেকে মুররামাচি যুগ (১৩৯২-১৫৭৩ খ্রিস্টাব্দ) পর্যন্ত জাপানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ‘কোওশোকুকা’ (অশোভন), ‘কেইসেইইয়া’ (রাজকীয়) প্রভৃতি গণিকালয়গুলি ব্যক্তিগতভাবে গড়ে উঠছিল। সেইসময়ে ‘ৎসুজিকো’ নামে এক প্রভাবশালী গণিকা একটি বিশাল গণিকালয় প্রতিষ্ঠা করেছিল।
আদিম সমাজে গণিকাবৃত্তি আয়ের উৎস হিসাবে যথেষ্ট আদৃত ছিল। ধর্মের দিক থেকে, সমাজের দিক থেকে, পিতা-মাতা ও স্বামীর পক্ষ থেকেও কক্ষনো ঘৃণা করা হত না। তা ছাড়া মেয়ের উপর পিতা বা স্বামীর একচ্ছত্র অধিকার ছিল বলে দুর্দিনে তাঁরা আর্থিক উন্নতির জন্য তাঁদের কর্তৃত্বাধীন মেয়েদের যৌনপেশায় উৎসাহ দিত। ঈশ্বরের পরেই স্বামীর স্থান, তাই স্বামীকে সাহায্য করা মানেই ধর্মীয় কাজ হিসাবে বিবেচিত হত। প্রাচীন যুগে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে গণিকাবৃত্তির প্রচলন ছিল। পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’-এও গণিকাদের কথা জানা যায়।
১৩. যাত্রা-থিয়েটার-চলচ্চিত্রে গণিকা
যাত্রা-থিয়েটার-চলচ্চিত্রের একেবারে গোড়ার দিকে ছিল নারী-বর্জিত। সে সময়ে নারীরা এসব ক্ষেত্রে আসত না। ফলে বহু বছর পুরুষ অভিনেতারা নারীসজ্জায় সজ্জিত হয়ে নারীচরিত্রে অভিনয় করত। সে সময়ে নারীর অভিনয় করাটাকে মানুষ সুনজরে দেখত না। ১৯২৭-২৮ সালের দিকে ঢাকার নবাব পরিবারের কয়েকজন তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তাঁরা ‘সুকুমারী’ নামে চার রিলের একটি নির্বাক ছবি বানান। ছবিটি পরিচালনা করেন বিশিষ্ট নাট্যকর্মী ও জগন্নাথ কলেজের শরীরশিক্ষার প্রশিক্ষক অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্ত। এই চলচ্চিত্রে নারী চরিত্র থাকলেও কোনো নারী অভিনয় করেনি। পুরুষরাই নারী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন সৈয়দ আবদুস সোবহান। ঢাকাই চলচ্চিত্রে নবাব পরিবারের অবদান থেমে থাকেনি। নবাব পরিবারের উদ্যোগে ঢাকার ইস্টবেঙ্গল সিনেমাটোগ্রাফ কোম্পানি গঠিত হয়। এর প্রযোজনায় অম্বুজ প্রসন্ন গুপ্ত নির্মাণ করে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের নির্বাক চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্রটির নাম ‘দ্য লাস্ট কিস’। তবে এই চলচ্চিত্রে নারীচরিত্রে নারীরাই অভিনয় করেছিল। নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন লোলিটা বা বুড়ি নামের জনৈকা বাইজি। চারুবালা, দেববালা বা দেবী নামের আরও দুজন বাইজিও এই চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিল। এঁদের তিনজনকেই আনা হয়েছিল গণিকালয় থেকে। চলচ্চিত্রই বলুন, কিংবা যাত্রা-থিয়েটার, সর্বত্রই নারী চরিত্রে প্রথম অভিনয় করতে আসেন বাইজি বা গণিকা মেয়েরা। এঁদের এসব ক্ষেত্রে অংশগ্রহণের কারণে মানুষের মনমন্দিরে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল চলচ্চিত্র-যাত্রা-থিয়েটারে যেসব মেয়েরা অভিনয় করে তাঁরা ‘বেশ্যা’। আজও আমাদের সমাজে অভিনেত্রীদের সুনজরে দেখা হয় না।
গবেষক-অধ্যাপক বিজিতকুমার দত্ত সরকারি দস্তাবেজ উদ্ধার করে লিখেছেন—“সরকারি মহাফেজখানা থেকে যে রিপোর্ট পেয়েছি তা কৌতূহলোদ্দীপক। দেখা যায় দশ বছরের নিচে বেশ্যাদের বাড়িতে বেশ কিছু মেয়ে রয়েছে। সরকার এদের কথা মাঝে মাঝে ভেবেছে। কিন্তু তাদের সংখ্যা এত ব্যাপক যে সরকারের পক্ষে কিছু করে ওঠা কঠিন।” সেই পর্যবেক্ষণ অনুসারে গণিকাপল্লিতে গণিকা-গর্ভজাত কন্যাসন্তানের সংখ্যা ছিল ৪০৮ জন। এইসব গণিকা-কন্যাদের পুনর্বাসন বা সমাজের মূলস্রোতে নিয়ে আসার ব্যাপারে তখনকার সরকার যেমন কিছু করার চেষ্টামাত্র করেনি। তেমনই সমাজ-সংস্কারকদেরও উদাসীনতা ছিল। গণিকাদের মুক্তির পথ দেখাল থিয়েটার। সেই গণিকা-কন্যাদের মুক্তির জন্য থিয়েটারে অংশগ্রহণের পথ খুলে দিয়েছিলেন মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত। সৌভাগ্যবশত উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণি থিয়েটার সম্পর্কে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। ভালোভাবে থিয়েটার পরিচালনার জন্য বেঙ্গল থিয়েটার একটি উপদেষ্টা সমিতি গঠন করেছিল। উপদেষ্টামণ্ডলীতে যেমন ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, তেমনি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, উমেশচন্দ্র দত্তের মতো ব্যক্তিত্বরা। থিয়েটারে অভিনেত্রী নিয়োগ সংক্রান্ত জরুরি সভায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর বিরোধিতা করলেন। বিদ্যাসাগরের মতো ব্যক্তিত্বের বিরোধিতাকে অগ্রাহ্য করে উমেশচন্দ্র দত্ত ও মধুসূদন দত্তের সমর্থনে বেঙ্গল থিয়েটার কর্তৃপক্ষ গণিকালয় থেকে চারজন মেয়েকে অভিনেত্রীকে হিসাবে আনলেন। মধুসূদনের ‘শর্মিষ্ঠা নাটক দিয়ে বেঙ্গল থিয়েটার যাত্রা শুরু করে। মেয়েদের জন্য থিয়েটারের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যাওয়ায় অন্ধকার জগতের মেয়েরা মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার একটা অবলম্বন পেলেন। এই পথ ধরেই। থিয়েটারে এসেছিলেন গোলাপসুন্দরী, বিনোদিনী, তারাসুন্দরী, এলোকেশী, জগত্তারিণী, শ্যামা, কুসুমকুমারী, নীহারবালা, কৃষ্ণভামিনী, প্রভাদেবীর মতো গণিকারাও। পরবর্তী সত্তর-আশি বছর বাংলা থিয়েটারকে আলোকিত করেছেন এঁরা, সমৃদ্ধ করেছেন অন্ধকার জগৎ থেকে আসা এই মহিলারাই, যাঁদের পোশাকি পরিচয় গণিকা।
