গোটা উনিশ শতক জুড়ে ভদ্রবাড়ির মেয়েরা চাকরি করতে বাইরে বেরচ্ছেন এমন চিত্র অতি বিরল ছিল। বলা যায়, অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার হয়তো প্রথম চিত্র এই গণিকাদের রোজগারের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল। তা ছাড়া এ এমন এক পেশা, যে পেশায় যোগদান করলেই রোজগার নিশ্চিত। রোজগারও সীমাহীন হতে পরে। কাঁচা পয়সা যাকে বলে। এ পেশায় অনাচার, অত্যাচার, লাঞ্ছনা নিশ্চয় ছিল। সে তো গার্হস্থ্যজীবনেও কম ছিল না। সামাজিক শোষণ তো কম ছিল না মেয়েদের। সেই সামাজিক শোষণের সঙ্গে সম্পৃত্ত থাকে সমাজ, প্রশাসন ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। গণিকাজীবনেও ছিল, আছে, থাকবে। সে সময় সর্বদাই গণিকাদের বিরুদ্ধে গৃহস্থরা মুখর ছিল। তাঁরা সর্বদা আদালতে চলে যেত গণিকাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে। আদালতও গণিকাদের বিরুদ্ধে। আদালত যারপরনাই গণিকাদের অপমানজনক কথা বলত, ভর্ৎসনা করত। এতে গণিকাদের কোনো হাত নেই। হাত আছে মূলত পুরুষতান্ত্রিক ভদ্রলোক সমাজের আধিপত্যবাদ। গণিকালয় সেই পুরুষতান্ত্রিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে গিয়ে নিজের পরিসর গড়ে তুলেছে। যাই হোক, তথাকথিত ভদ্রলোকদের উপর্যুপরি দাবিকে গুরুত্ব দিয়ে ১৮৬৮ সালে চোদ্দো আইন প্রণয়ন করে ব্রিটিশ সরকার এদেশীয় ভদ্রলোকদের রক্ষা করল। পাশাপাশি গণিকাদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা করিয়ে রেজিস্ট্রির মাধ্যমে পেশা চালানোর সুযোগ করে দিয়েছিল। বলা যায়, গণিকাদের সরকারি স্বীকৃতি দিয়েছিল।
সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এসময়ে প্রবল হয়ে উঠছিল। গণিকা ও গণিকাবৃত্তির সমর্থন ও আপত্তিই যেন একমাত্র সত্য হয়ে উঠেছিল। সেসময়ে সাহিত্য-নাটক-যাত্রা-প্রহসনে গণিকা চরিত্র আবশ্যক অনুপ্রবেশ ঘটছিল। কেউ কেউ আবার গণিকাদের পরিত্রাণের উপায়ও বাতলে দিচ্ছিলেন। জনৈকা মিশ লেসলি লিখলেন, গণিকাদের পরিত্রাণ মিলবে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে জিশুকে স্মরণ করে। সংখ্যায় অতি অল্প হলেও কিছু গণিকা পাপস্খলনের জন্য খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেছিলেন।
শুধু ব্রিটিশ উপনিবেশেই নয়, ফরাসি পোর্তুগিজদের উপনিবেশের ফলেও ভারত উপমহাদেশে এক অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষিত হল। বিদেশিরা ভারতের বাসিন্দাদের দাসানুদাস কীটাণুকীট মনে করত। পুরুষদের সহজলভ্য শ্রমিক আর মেয়েদের সহজলোভ্য ভোগ্যা মনে করত। এর ফলে অবাধ, অসংযম এবং অবাঞ্ছিত যৌনজীবনে জড়িয়ে পড়ল তাঁদের এক অংশ। গণিকাবৃত্তির রমরমা হতে শুরু করল এই সময় থেকেই। গণিকাগৃহে যাওয়া যেন এক স্ট্যাটাস সিম্বল হয়ে দাঁড়াল। সংক্রমিত হতে থাকল কালান্তক যৌনব্যাধী। তাঁদের বেপরোয়া যৌন সম্ভোগ সিফিলিস এবং গনোরিয়ার মতো যৌনব্যাধী আতঙ্কের সৃষ্টি করল। যৌনব্যাধীর আতঙ্কে বাজারও খানিকটা স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল কিছুকালের জন্য। কন্ডোম বাধ্যতামূলক হওয়ার আগে পর্যন্ত এই ভীতি কাজ করত রসিকদের মনে। শোনা যায়, ফরাসিদের কাছ থেকেই সিফিলিস যৌনরোগটি আমদানি হয়েছিল। সিফিলিস রোগটি মূলত কুকুরদের অসুখ, কুকুরদের হত। কুকুরদের কাছ থেকে এই সিফিলিস রোগটি মানুষের শরীরে কীভাবে সংক্রমিত হল, সেটা অবশ্যই গবেষণার বিষয় হতে পারে। আতঙ্ক নিয়ে বেশ কয়েক যুগ কেটে গেল গণিকা ও গণিকাপ্রেমীদের। এরপর রসিক-রসকিনীদের চোখেমুখে ভরসার আলো দেখা গেল। সিফিলিস ও গনোরিয়া নিরাময়ের জন্য হাতে চলে এলো অব্যর্থ প্রতিষেধক মেচনিকফ মলম, পেনিসিলিন, সালফাথিয়াজোল ইত্যাদি। এইসব ওষুধের ব্যবহার বাড়তেই গণিকাদের যৌনজীবনে এক বিপ্লব ঘটে গেল। কিন্তু পূর্ব-সতর্কতা নেওয়া যায় না-বলে রোগটা থেকেই গেল। সেই অভাবটা পূরণ করে দিল কন্ডোম। এখন অবশ্য সিফিলিস, গনোরিয়ার কথা খুব একটা শোনা যায় না। বরং এখন নতুন আতঙ্ক এইডস। সেটাও প্রায় স্তিমিত। সচেতনতা ও বাধ্যতামূলক কন্ডোম ব্যবহারে যৌনরোগ এখন আর তেমন আতঙ্ক ছড়াতে পারছে না। কন্ডোম নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব আলাদা একটি অধ্যায়ে।
১২. অন্য দেশ : প্রাচীন সভ্যতায় গণিকাবৃত্তি
ইহুদি ধর্ম গোত্রের ভিতরে সদস্য-সদস্যাদের কাউকেই গণিকাবৃত্তিতে উৎসাহিত করত না। বরং সেটা তাঁদের নৈতিক আইন অনুসারে জঘন্য অপরাধ বলে বিবেচিত হত। তবুও ইতিহাসে খুব অল্প সময়ের জন্যই তাঁরা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছিল। তাই তাঁদের নিজস্ব গোত্রের মধ্যে গণিকাবৃত্তি দমন করতে পারলেও নগর থেকে গণিকাবৃত্তি নিষিদ্ধ করতে পারেনি। যত বড়ো নগর তত বেশি গণিকা, তত বেশি ব্যাভিচার। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ‘লিডিয়ান’ ও ‘সাইপ্রিয়ান’ জাতির মেয়েরা দূরবর্তী অঞ্চলে গিয়ে গণিকাবৃত্তি করে অর্থসংগ্রহ করে এনে বিয়ে করত। ভারতেও কয়েকটি প্রদেশে রাজাদের অধীনে ‘নাইক’ নামে একটি সম্প্রদায় ছিল। নাইক মেয়েরাও সংসারের ব্যয় নির্বাহের জন্য গণিকাবৃত্তিতে অংশ নিত। পুরোহিতেরাও কখনো-কখনো ধর্মের দোহাই দিয়ে মেয়েদেরকে গণিকাবৃত্তিতে নিযুক্ত করত। যেমন ব্যাবিলোনিয়ায় মেয়েদেরকে ইশতার মন্দিরে যেতে হত। মন্দিরের যে পুরুষ প্রথমে জিভ দিয়ে ওই মেয়েকে রুপোর মুদ্রা নিক্ষেপ করবে, সেই পুরুষ ওই শরীর ভোগের অধিকার পাবে। এ নিয়ম মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম আফ্রিকাতেও প্রচলন ছিল।
প্রাচীন গ্রিস, রোমে এ ধরনের গণিকাবৃত্তির প্রথম উৎপত্তি। গ্রিক সভ্যতাও একটা পর্যায়ে শুধুমাত্র গণিকাবৃত্তির জন্যই বিখ্যাত ছিল। তাঁদের নগরে যদিও গণিকাদের নাগরিক অধিকার ছিল সামান্য। তবে নগরের অধিকাংশ সম্পদের মালিক ছিল গণিকারা। তাঁরাই নগরের সম্ভ্রান্ত নাগরিকদের বিলাস ও ব্যাভিচারের অর্থ প্রদান করত। উচ্চাভিলাষী যে-কোনো নারী সে সময়ে স্ব-ইচ্ছায় গণিকাবৃত্তিতে অংশগ্রহণ করত এবং তাঁরা অর্থে-বিত্তে-সম্মানে কারোর থেকে কোনো অংশে পিছিয়ে ছিল না। বরং সামনের কাতারেই অবস্থান করত। প্রাচীন গ্রন্থাদি সূত্রে, যেমন ইতিহাসের জনক হিসাবে খ্যাত হেরোডেটাস (খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০/২০)-এর লেখায় এই পবিত্র’ গণিকাবৃত্তির বহু নমুনা পাওয়া যায়, যেটি প্রথম শুরু হয়েছিল ব্যাবিলনে। সেখানে প্রত্যেক নারীকে বছরে অন্তত একবার করে যৌনতা, উর্বরতা ও সৌন্দর্যের দেবী আফ্রোদিতির মন্দিরে যেতে হত এবং সেবাশুশ্রষার নমুনা হিসাবে একজন বিদেশির সঙ্গে নামমাত্র মূল্যে যৌনসঙ্গম করতে হত। একই ধরনের গণিকাবৃত্তির চর্চা হত সাইপ্রাস এবং করিন্থে। এটার বিস্তৃতি পেয়েছিল সার্দিনিয়া এবং কিছু ফিনিশীয় সংস্কৃতিতে, বিশেষ করে ইস্টার দেবতার সম্মানে। ফিনিশীয়দের মাধ্যমে ক্রমশ এটি ভূমধ্যসাগরের অন্যান্য বন্দর শহরগুলিতে ছড়িয়ে পড়ে, যেমন–সিসিলি, ক্ৰটন, রোসানো ভাগলিও সিক্কা ভেনেরিয়া এবং অন্যান্য শহরে। এক্ষেত্রে অনুমান করা যায়, এশিয়া মাইনর, লাইদিয়া, সিরিয়া ও এট্রাকসনের নামও। ইসরায়েলে এটি একটি সাধারণ ব্যাপার ছিল। আগেই বলেছি, প্রাচীন গ্রিকের এথেইনাইয়ের কবি সোলোন (খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫৯০), যিনি তৎকালীন গ্রিকের সাতজন জ্ঞানী লোকের একজন হিসাবে গণ্য হতেন। খ্রিস্টপূর্ব ছয় শতকে এথেন্সে প্রথম গণিকালয় স্থাপন করেন। এই গণিকালয়ের উপার্জন দিয়ে আফ্রোদিতিকে নিবেদন করে একটি মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। ইউস্তিয়ানের স্ত্রী রোমক সম্রাজ্ঞী থেওডেরো প্রথম জীবনে গণিকা ছিল। বোসপোরুসে তিনি ৫০০ গণিকার জন্য একটি নির্দিষ্ট গণিকালয় গড়ে তুলেছিলেন। প্রাচীন হেল্লাস বা গ্রিস দেশের আথেনাই বা এথেন্সে গণিকালয় ছিল। প্রাচীন গ্রিসের লোকেরা স্ত্রী ছাড়াও অন্য মহিলাদের সঙ্গে অবাধে মেলামেশা করতে পারত এবং করত। প্রাচীন গ্রিক ইতিহাসবিদ, পরিব্রাজক ও কূটনীতিক মেগাস্থিনিস এক ধরনের পরিদর্শকের কথা বলেছেন, যাঁরা রাজ্যের সকল কার্যক্রমের উপর গণিকাদের সহায়তায় নজর রাখত এবং রাজার কাছে গোপনে রিপোর্ট করত।
