গণিকাদের স্বাস্থ্যপরীক্ষা যেন অকথ্য অত্যাচারের সামিল ছিল। কেমন ছিল সেই স্বাস্থ্যপরীক্ষা, সেটা বর্ণনা করেছে ‘সংবাদ প্রভাকর’। ১৮৬৯ সালের ১৫ এপ্রিলের একটি সংখ্যায় লিখেছে–“বেশ্যাদিগের রেজিস্ট্রারি ও ব্যাধি পরীক্ষা সম্বন্ধে রাজধানী মধ্যে যে কতপ্রকার ভয়ংকর ভয়ংকর কথা শোনা যাইতেছে, তাহা প্রকাশ করিতে হইলে বিদ্রোহীর মধ্যে গণনীয় হওয়া অসম্ভাবিত হয় না। অধিকন্তু অশ্লীলতা ও জনপ্রিয়তার হস্ত হইতে পরিত্রাণ পাওয়া দুর্ঘট হয়। কেহ বলিতেছে পুলিশের লোকেরা স্ত্রীলোকের প্রতি নির্দয় হইয়া রেজিস্ট্রারির জন্য গ্রেফতার করিতেছে। তাহাদের ক্রদনে ও আর্তনাদে পুলিশের আহ্লাদ বর্ধিত হইতেছে। কোনো-কোনো ডাক্তার অসম্ভব বল প্রকাশ করিয়া এ কাজ করিতেছেন। যাহাদের ব্যাধি নেই তাহারাও পরীক্ষার পর গৃহে আসিয়া উদর বেদনায় ৩/৪ দিন শয্যাগত থাকিতেছে। সেই ভয়ে শত শত বেশ্যা কলিকাতা পরিত্যাগ করিয়া পলায়ন করাতে বেশ্যাপল্লী সকল অন্ধকারময় হইয়াছে। যাহারা কলিকাতায় বেশ্যাবৃত্তি করিতে না চাহিয়া স্থানান্তরে যাইতে চাহে, পুলিশের লোকেরা তাহাদিগকে পথিমধ্যে এমনকী নৌকা হইতেও ধরিয়া আনিতেছে।” ভয়ংকর দুর্বিসহ সেইসব পরীক্ষা-পদ্ধতি এবং অসহায় ব্যবহারের ফলে গণিকাদের নানা সংকট দেখা দিচ্ছিল সে সময়। একথা বলাই যায়, গণিকাবৃত্তি এবং সংক্রামক যৌনব্যাধি এত বাড়াবাড়ি স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল যে ‘চোদ্দো আইন’ খুবই জরুরি ছিল। এখন যেমন এইডসের মতো মারণ রোগের সংস্পর্শ থেকে দূরে রাখতে কন্ডোমের ব্যবহার করা হয়েছে, তখন তো কন্ডোমের ব্যবহার ছিল না। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা ছাড়া বিকল্প কোথায়! গণিকাদের নিয়মিত স্বাস্থ্যপরীক্ষা এখনও হয়, তবে সেটা সেদিনকার মতো বিভীষিকাময় নয়। ১৮৭২ সালে ‘সোমপ্রকাশ’-এ লেখা হল–“এই আইনটি যখন হয় আমরা প্রাণপণে ইহার প্রতিবাদ করিয়াছিলাম। তখন আমাদিগের কথা রাজপুরুষদিগের ভালো লাগে নাই। কিন্তু এই আইনটি স্ত্রী সম্প্রদায়ের প্রতি অত্যাচারের কারণ হইয়া উঠিয়াছে।”
কেমন ছিল সেই স্বাস্থ্যপরীক্ষার নামে অত্যাচার? ‘সম্বাদ ভাস্কর’ লিখছে–“উক্ত আইনের কার্ব নিৰ্বাহ জন্য লালবাজারে যেসকল ডাক্তার নিযুক্ত হইয়াছেন তাঁহারা পরীক্ষার ছলে নারীদিগের বিশেষ কষ্ট দিতেছেন, দূষ্যাদিগের অপেক্ষা নির্দোষা বেশ্যাদিগের অধিক যন্ত্রণা হইতেছে। দূষ্যাদের মধ্যে অধিকাংশই পরীক্ষার পূর্বে রোগ স্বীকার করে, সুতরাং তাহাদের আর দেহপরীক্ষার প্রয়োজন হয় না। চিকিৎসার অধীনে থাকে, যাহাদের রোগ নাই, তাহারা ব্যাধির অনস্তিত্ত্ব ব্যক্ত করে, চিকিৎসক শোনামাত্রই কেন তাহা বিশ্বাস করিবেন, কার্যতই পরীক্ষার হয়–তাহা সামান্যাকারে দর্শনাদিরূপ পরীক্ষাতেই সমাধা হইতে পারে, কিন্তু আমাদের চিকিৎসকেরা সেরূপে সন্তুষ্ট হন না–তাঁহারা ওই পরীক্ষিত বেশ্যাগণকে প্রথমত টবে বসাইয়া দেন, তাহাতে জলের সহিত জ্বালাকর পদার্থ থাকে, ওই পরীক্ষার পর গর্ভ দর্শনীয় বিশাল যন্ত্রদ্বারা দর্শন হয়, পরে উগ্রতর পিচকারি দেওয়া হইয়া থাকে। জনরবকারিরা বলেন, এই পিচকারিতে অনেকের উদর ফুলিয়া জীবন সংশয় হইয়াছে। অতএব উহা যে স্ত্রীদেহের উপযোগী স্বাভাবিক পিচকারি নহে, ইহা অবাধেই অনিষ্ট সাব্যস্ত হইতেছে। এই পিচকারি দান বিষয়ে পাত্রপাত্র বিচার নাই। ডাক্তারেরা রজস্বলাক্ষেত্রেও উহার প্রয়োগ করিতেছেন। তাহাতে আবার অধিকতর অনিষ্ট হইতেছে, অপরিমিত রুধিরক্ষরণে দুই এক তরুণীর জীবনও গিয়াছে।”
এই বর্ণনায় স্পষ্ট হয় যে, অত্যাচার কতটা অবর্ণনীয় ছিল। এতটাই অবর্ণনীয় ছিল যে, তামাম গণিকারা দলে দলে কলকাতা ত্যাগ করে অন্যত্র পালিয়ে যেতে থাকল। কেউ কেউ কলকাতা ত্যাগ করার সঙ্গে সঙ্গে গণিকাবৃত্তিও ত্যাগ করতে থাকল। অনেকে আবার ফরাসি উপনিবেশ ফরাসডাঙায় গিয়ে দিন গুজরান করতে থাকল। ব্রিটিশ পুলিশদের আতঙ্কে এমন অবস্থা হল যে, লাল পাগড়ি পরা কোনো লোক দেখলেই পুলিশ আত্মগোপন করে ফেলত। আবার কেউ কেউ আত্মহত্যা করতে বাধ্য হত। রূপচাঁদ পক্ষী লিখলেন–
“কারে বলিব বনমালী! এ দুখের কথা।
হলো চৌদ্দ আইন বড়োই কঠিন বল যাই কোথা।
ভেবে ভেবে গুমড়ে মরি এ কি আইন হলো জারী,
দিগম্বরী করবে যত বারবণিতা।”
এহেন পরিস্থিতে সমাজের একটা বড়ো অংশ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছিল। ব্রিটিশ সরকার এই প্রতিবাদ গোড়ার দিকে তেমন পাত্তা না দিলেও পরে বিষয়টা নিয়ে ভাবতে বাধ্য হল। বাধ্য হল কারণ, ফরাসি উপনিবেশ ফরাসডাঙায় গণিকারা দলে দলে কলকাতা ছেড়ে যাওয়াতে ইংরেজদের মুখ পুড়েছিল। সেই মুখ রক্ষা করতে এবং এ দেশীয় ভদ্রলোকদের তীব্র সমালোচনা মুখ বন্ধ করতে সচেষ্ট হল। ইংরেজরা বুঝতে পারল এই আইনটি সম্পূর্ণভাবেই আনপপুলার। যে উদ্দেশ্যে এই আইন প্রণয়ন করা সেই সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ। সেনারা যথারীতি যৌনরোগে আক্রান্ত হচ্ছিল। তা ছাড়া এই আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে জলের মতো রাজস্ব খরচ হয়ে যাচ্ছিল। পাক্কা কুড়ি বছর এই আইন সক্রিয় ছিল। অবশেষে ১৮৮৮ সালে এই আইনটি বিলুপ্ত করে দেওয়া হল।
ফিরে আসি গণিকাদের রেজিস্ট্রেশনের প্রসঙ্গে। কোনো প্রকার যৌনরোগ না-থাকলে তবেই একজন গণিকাপেশায় জন্য রেজিস্ট্রিভুক্ত হতে পারত এবং পেশায় যোগদান করতে পারত। যাঁরা রোগাক্রান্ত হত তাঁদের ‘লক হাসপাতাল’-এ পাঠানো হত। কী এই ‘লক হাসপাতাল’? ইংল্যান্ডে এ ধরনের হাসপাতাল ছিল, যেটা তৈরি করা হয়েছিল হিংস্র নেকড়েদের আটকে রাখার জন্য। এই হাসপাতাল লন্ডনে তৈরি করা হয়েছিল ১৭৪৬ সালে। এই লক হাসপাতাল যৌনরোগাক্রান্ত গণিকাদের রাখা হত। সরকারি নির্দেশে কলকাতার বিভিন্ন গণিকাপল্লিতে গিয়ে ব্রিটিশ পুলিশ তল্লাসি চালিয়ে মেয়েদের ডাক্তারি পরীক্ষা করতে যেত। সেইসব মেয়েদের প্রতি নৃশংসতা ক্রমশই মাত্রা ছাড়াচ্ছিল। এর ফলে কলকাতা থেকে অন্য কোনো শহরে বা অন্য কোনো গ্রামে গণিকারা পালিয়ে যেতে থাকল দলে দলে। যৌনরোগের কারণে যেসব হতভাগীদের চিকিৎসার জন্য লক হাসপাতালে যেতে হয়েছিল, তাঁদের ফিরে এসে আর পুরোনো ফিরে যেতে সাহস পেত না। রোগের ভয়ে খরিদ্দারদের আনাগোনাও ক্রমশ কমতে থাকল। সেই ভীতি আজও বহমান। তাহলে কি এটাই বুঝতে হয় ব্রিটিশ-ভারত সরকার প্রত্যক্ষভাবে নাহলেও পরোক্ষভাবে গণিকাবৃত্তিকে তুলে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল? বাঙালি ভদ্রলোক সমাজের চাপে কখনো-কখনো প্রশাসন শহরের মধ্যবিত্ত এলাকা গণিকালয় উচ্ছেদ করত। গণিকা ও গণিকাবৃত্তির বিরোধিতার কেন্দ্রে ছিলেন সেসময়ের বিশিষ্ট তরুণ বাঙালি বুদ্ধিজীবী, সমাজ-সংস্কারক পর্যন্ত। মহাভারতকার কালীপ্রসন্ন সিংহ পর্যন্ত গণিকাবৃত্তির বিরুদ্ধে জনমত সংগঠিত করেছিলেন। ব্রিটিশ-ভারত সরকারকে এ ব্যাপারে ধারাবাহিকভাবে বোঝানো চেষ্টা করে গেছেন। নগরায়নের ফলে যে নতুন অর্থনীতির উদ্ভব ঘটেছিল, শিল্পকেন্দ্রিক সেই অর্থনীতি ও সামাজিক অবস্থায় গ্রাম্যসমাজ ও পরিবারচ্যুত মানুষ যে। বিনোদনের আশায় গণিকাদের কাছে যাবে, এটাই আধুনিকতার অবধারিত পরিণতি। সেটা বুঝতে পারেনি উনিশ শতকের বিদ্যোৎসমাজ। খেতে না-পাওয়া মেয়েদের এই বৃত্তিটা এবং গণিকালয়গুলি হয়ে গিয়েছিল নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম যেখানে প্রাণ খুলে যেমন খুশি খিস্তি দিতে পারে, তেমনি নিজের গতর-খাটানো রোজগার করা অর্থ নিজের মতো করে খরচ করতে পারে।
